প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ফের সিভিল এভিয়েশনের ভ্যাট ফাঁকি ১৩৮০ কোটি টাকা

রহমত রহমান: দেশের এভিয়েশন খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন অথরিটি (বেবিচক)। দেশের আকাশ পথে বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো পরিচালিত হয় এ সংস্থার তত্ত্বাবধানে। সংস্থাটি এয়ারলাইনসগুলোর বিভিন্ন চার্জ ও দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরগুলো থেকে আয় করে থাকে। প্রায় ১৮টি খাত থেকে সংস্থাটি নিয়মিত আয় করে। কিন্তু এর ওপর ভ্যাট প্রদান করে না। একই সঙ্গে সংস্থাটি প্রায় ৩০টি খাতে ব্যয় করলেও এর ওপর ভ্যাট প্রদান করে না।
আয় ও ব্যয় খাতে সংস্থাটি পাঁচ বছরে প্রায় এক হাজার ৩৮০ কোটি টাকা ফাঁকি দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এর আগে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রায় ১৬৫ কোটি টাকার মামলা করা হয়েছে। সে টাকা আদায়ে চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করা হয়েছে। বকেয়া পরিশোধে এনবিআর চেয়ারম্যান সিভিল এভিয়েশন চেয়ারম্যানকে ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) দিয়েছে।
এ বিষয়ে বেবিচকের পরিচালক (অর্থ) মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এক হাজার ৩০০ কোটি টাকার মধ্যে অনেক টাকা আমরা আদায় করে সরকারকে দিয়েছি। যে টাকা আদায় করিনি তা আমরা কীভাবে দেব? সিভিল এভিয়েশন আরেকজনের দায় নেবে কেন?’ তিনি বলেন, ‘ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ২০০৯ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত এয়ারলাইনস যত আয় করেছে প্রত্যেক এয়ারলাইনসকে ইনভয়েস অনুসারে বলেছি যে, এত টাকা পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু তারা পরিশোধ করছে না।’
সূত্র আরও জানায়, বেবিচক এনবিআরের আওতাধীন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর) কমিশনারেটের ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান। বেবিচক তাদের বিভিন্ন আয় ও ব্যয়ের ওপর সঠিকভাবে ভ্যাট পরিশোধ করছে না বলে অভিযোগ ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন ও দলিলাদি পর্যালোচনা করে ফাঁকি উদ্ঘাটন করে প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি ২০১২-১৩ অর্থবছর বিজ্ঞাপনী সংস্থা, নিলামে পণ্য বিক্রয়, বডিং ব্রিজ, এম্বারকেশন ফি (স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক), ল্যান্ডিং কার পার্কিং, সিকিউরিটি পাস, কার্গো সিকিউরিটি স্ক্যানিং চার্জ, সম্পদ ইজারা, পাবলিক টয়লেটসহ কয়েকটি ইজারাদার, পণ্যাগার, মূলধনি যন্ত্রপাতি ভাড়াসহ ১৮টি খাতে প্রায় ৬০২ কোটি টাকা আয় করেছে। যাতে প্রযোজ্য ভ্যাট প্রায় ৯০ কোটি টাকা। দুই শতাংশ হারে সুদ প্রায় ১১৪ কোটি টাকাসহ বকেয়া ভ্যাট প্রায় ২০৪ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটি এ ভ্যাট পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। একইভাবে ২০১৩-১৪ অর্থবছর ১৮টি খাতে সুদসহ প্রায় ২৯২ কোটি টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছর ১৮টি খাতে সুদসহ প্রায় ৩৬২টি কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছর ১৮টি খাতে সুদসহ প্রায় ২৮২ কোটি ৫২ লাখ টাকা ও ২০১৬-১৭ অর্থবছর ১৮টি খাতে সুদসহ প্রায় ২২৩ কোটি টাকার ভ্যাট পরিশোধ করেনি।
অন্যদিকে বেবিচক ২০১২-১৩ অর্থবছর বিজ্ঞাপনী সংস্থা, অডিট ফিস, রেস্টুরেন্ট, কনসালটেন্সি ফার্ম, ছাপাখানা, আইন পরামর্শক, আসবাবপত্র, ফ্লাইট অপারেশন ও পরিদর্শন, ট্রেনিং, সভা, খেলাধুলা, বিভিন্ন যানবাহন মেরামতসহ প্রায় ৩০টি খাতে প্রায় সাড়ে ৯৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। যাতে সুদসহ ভ্যাট প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ টাকা। একই সঙ্গে ২০১৩-১৪ অর্থবছর ৩০টি খাতে সুদসহ ভ্যাট প্রায় এক কোটি ৯৮ লাখ টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছর ৩০টি খাতে সুদসহ ভ্যাট প্রায় পাঁচ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছর সুদসহ প্রায় ৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ও ২০১৬-১৭ অর্থবছর সুদসহ ভ্যাট প্রায় সাড়ে ৪৭ লাখ টাকা ফাঁকি দিয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বেবিচক ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত ১৮টি খাতে আয়ের ওপর সুদসহ সর্বমোট প্রায় এক হাজার ৩৬৩ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। একই সঙ্গে একই অর্থবছর ৩০টি খাতে ব্যয় বা কেনাকাটার ওপর প্রায় ১৬ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। আয় ও ব্যয়ের ওপর প্রতিষ্ঠানটি সর্বমোট প্রায় এক হাজার ৩৮০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। এ ভ্যাট পরিশোধে সম্প্রতি বেবিচক চেয়ারম্যান বরাবর প্রাথমিক দাবিনামা সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করেছে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)। নোটিসে বেবিচকে ১৫ দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। অন্যথায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বেবিচক এয়ারলাইনসসহ বিভিন্ন সংস্থাকে দেওয়া সেবা ও সেবা কার্যক্রমের ওপর ২০০৯-১০ থেকে ২০১১-১২ অর্থবছর পর্যন্ত চার বছরে প্রায় ১৬৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা ফাঁকি দিয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, নভোএয়ার, রিজেন্ট ও ইউনাইটেড এয়ারওয়েজসহ বিভিন্ন সংস্থা সেবা প্রদান ও সেবা কার্যক্রমের ওপর এ ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। বকেয়া আদায়ে প্রাথমিক দাবিনামা জারির পরও প্রতিষ্ঠানটি মূসক পরিশোধ করেনি। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি কোনো সহযোগিতা করতে রাজি নয়। পরে চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করা হয়। এ বকেয়া পরিশোধে ডিও লেটার দিতে গত ৩০ এপ্রিল ভ্যাট উত্তর কমিশনার জাকিয়া সুলতানা এনবিআর চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছে।
বকেয়া ১৬৫ কোটি টাকার বিষয়ে পরিচালক মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘এনালটিক্যাল চার্জের ওপর ভ্যাট আগে ছিল না। মূসক আইন, ১৯৯১-তে বলা আছে শুধু হেলিকপ্টার সেবার ওপর ভ্যাট হবে। বাকিগুলো ভ্যাট আওতার বাইরে। পরে ২০১৩-১৪ থেকে ভ্যাট অফিস তদন্ত শুরু করল যে, সিভিল এভিয়েশন এসব খাতে ভ্যাট আদায় করছে না। ভ্যাট অফিস যখন বলল দিতে হবে, আমরা তখন এভিয়েশন কোম্পানিগুলোকে বললাম ভ্যাট দিতে। তারা বলল, আইনে বলা আছে আমরা ভ্যাটের আওতামুক্ত। তারা গিয়ে আদালতে মামলা করে দিল। মামলায় এভিয়েশন মালিকরা হেরে গেল। এখন তো টাকা দিতে হবে। এরপর ২০১৮ সালে আমরা চিঠি দিয়ে সব এয়ারপোর্ট ম্যানেজারকে বলে দিলাম ইনভয়েসে ভ্যাটযুক্ত করে দিতে। এখন ভ্যাট আদায় হচ্ছে।’

সর্বশেষ..