ফোকাস থাকুক মূল্যস্ফীতিতে

২০১৭-১৮ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষিত হওয়ার কথা চলতি মাসের শেষদিকে। এ উপলক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশ ব্যস্ত এখন। প্রশ্ন হলো, নতুন মুদ্রানীতি ঘিরে আমাদের প্রত্যাশা কেমন? তার উত্তরে গতকালের শেয়ার বিজের ‘মূল্যস্ফীতি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার সুপারিশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রণিধানযোগ্য। নতুন মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি সীমিত পর্যায়ে রাখার ব্যাপারেই জনগণের প্রত্যাশা বেশি। প্রথাগতভাবে এটি মুদ্রানীতির একটি লক্ষ্যও বটে। চলতি বছর জাতীয় নির্বাচনের বছর। নির্বাচনি বছরগুলোয় মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার অধিক বেড়ে উঠতে দেখা গেছে অতীতে। এ অবস্থায় নির্বাচন সামনে রেখে বিশেষজ্ঞরা যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর বেশি করে জোর দেবেন, তা স্বাভাবিক বৈকি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেনÑবেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা, খেলাপি ঋণের উচ্চ মাত্রা কমানো, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ ব্যাংকের দিকনির্দেশনাও থাকা উচিত মুদ্রানীতিতে। এসব বিষয়ে বলিষ্ঠ নজরদারি প্রতিষ্ঠা যে জরুরি, সে বিষয়ে আমাদেরও কোনো সন্দেহ নেই। জিজ্ঞাস্য হলো, ইস্যুগুলো মুদ্রানীতির অংশ হওয়া উচিত কি না কিংবা আলোচ্য জানুয়ারি-জুন মুদ্রানীতিতে এগুলো অন্তর্ভুক্ত হবে কি না। সে ক্ষেত্রে প্রথমেই বলা দরকার, আর্থিক খাতের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় দায়িত্ব হলেও মুদ্রানীতির মুখ্য উদ্দেশ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। অগ্রসর অর্থনীতিগুলোর সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল মূল্যস্ফীতি বজায় থাকার পরই কেবল মুদ্রানীতি ফোকাস করে মূল্যস্ফীতির বাইরে। আর তার ফল অবিমিশ্র শুভ নয়। বরং মূল্যস্ফীতির বাইরে ফোকাস রাখায় মুদ্রানীতি তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংকও অনেক ক্ষেত্রে উদ্দিষ্ট লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়ায় অতিরিক্ত বহিস্থ ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে অনেকের মত। সেজন্য এখন তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দিচ্ছেন, যেন মুদ্রানীতির ফোকাস কোনোক্রমেই মূল্যস্ফীতি থেকে উঠিয়ে অন্যত্র সরানো না হয়। আমরা মনে করি, এ ধরনের ঝুঁকির বেলায় বাংলাদেশ ব্যতিক্রম নয়। ফলে সবাই চাইবেন, আসন্ন মুদ্রানীতির ফোকাস মূল্যস্ফীতির ওপর থাকুক। আর অন্যান্য বিষয় ভিন্নভাবে অ্যাড্রেস করুক বাংলাদেশ ব্যাংক।
বিগত বছরগুলোয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছুটা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নিয়েছিল; যাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হচ্ছিল ‘সংস্থানমূলক মুদ্রানীতি’। অর্থাৎ তার দ্বারা ঋণপ্রবাহ প্রসারিত না হয়ে যেন নিয়ন্ত্রিত থাকে। অনেকের পরামর্শ ছিল, প্রবৃদ্ধির অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে ঋণপ্রবাহ বরং কিছুটা বাড়ানো দরকার। আমরা মনে করি, ওই নিয়ন্ত্রিত ঋণপ্রবাহ থেকেও অধিক সুফল মিলতÑযদি সময়মতো খেলাপি ও মন্দ ঋণের রাশ টেনে ধরা যেত। জটিলতা হলো, মুদ্রানীতি দিয়ে খেলাপি ঋণের লাগাম টানা কঠিন। এ ক্ষেত্রে বরং অন্যান্য হাতিয়ার প্রয়োগ করতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে। আরেকটি বিষয়, সদ্যসমাপ্ত ২০১৭ সালে জনজীবনের স্বাভাবিকতা অনেকটাই ব্যাহত হয় বিশেষত খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিতে। সেজন্য জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়ে উঠেছিল বলে খবর প্রকাশ হয়েছিল পত্রপত্রিকায়। এর সূত্র ধরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কর্তৃক মূল্যস্ফীতির হিসাব নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন অনেক বিশেষজ্ঞ। বিষয়গুলো সচেতন পাঠকের দৃষ্টিও এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়।
যাহোক, গত বছরের আলোচিত এ মূল্যস্ফীতির কারণ ছিল কিছুটা প্রাকৃতিক। সেখানে বাজারনীতিরও কিছু দুর্বলতা ছিল বলে প্রতীয়মান। রাজনীতির সাধারণ জ্ঞান বলে, নির্বাচনের বছর বিধায় চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি এমনিতেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইবে সরকার। মুদ্রানীতি প্রণয়নকারী হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকও সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার কথা। সেজন্য আসন্ন মুদ্রানীতি থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। যেহেতু মুদ্রানীতির সঙ্গে কর্মসংস্থানেরও একটা প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে, তাই মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি এতে কর্মসংস্থানের ওপরও সারবত্তাসম্পন্ন আলোকপাত থাকুক, তেমনটাই প্রত্যাশা করব আমরা।