ফোরজিতে আগ্রহ নেই মোবাইল গ্রাহকদের

থ্রিজিতে হতাশা

হামিদুর রহমান: দেশে তারবিহীন তৃতীয় প্রজন্মের ইন্টারনেট সেবা থ্রিজি প্রযুক্তি চালু হয়েছিল ২০১২ সালে। তবে এর আশানুরূপ সার্ভিস এখনও পাওয়া যায়নি। তাই তারবিহীন চতুর্থ প্রজন্মের ইন্টারনেট সেবা ফোরজিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীরা। যদিও দেশে থ্রিজি সেবা চালু হওয়ার পরেই মানুষের মাঝে তুমুল আগ্রহ ছিল।

গ্রাহকরা জানান, ফোরজি চালু হলেও ইন্টারনেটের গতি এখনও আগের মতোই। কোনো উন্নতি হয়নি সেবার। বরং ঢাকা শহরের অনেক এলাকাতেই এ সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। সিম ফোরজিতে অ্যাকটিভ করলেও এখন ফোরজির সিগন্যালে থ্রিজি; কখনো বা টুজি শো করছে। এছাড়া অনেক গ্রাহক মাঝে মাঝে ইন্টারনেট সেবাই পাচ্ছেন না বলেও জানান।

এ বিষয়ে সাফারা আইটির প্রধান প্রকৌশলী এএমবি হাসান বলেন, ‘কোনো সেবা ঘোষণার আগে অপারেটরগুলোর টেকনোলজি আপডেট করা দরকার। বিশ্বে থ্রিজির গড় স্পিড ২০ এমবিপিএস হলেও বাংলাদেশে এই স্পিডের মাত্রা তিন দশমিক ৭৫ এমবিপিএস। সদ্য ঘোষিত ফোরজির স্পিড হবে ৭ এমবিপিএস, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের থ্রিজি স্পিডের চেতেও অনেক কম।’

ফোরজির অভিজ্ঞতা নিয়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট তমাল হোসাইন জানান, দেশে ফোরজি চালু হলেও এখনও মনে হচ্ছে থ্রিজিতে রয়েছি। ফোরজি চালু হলেও পুরোপুরি থ্রিজির সেবা পাচ্ছি না। ভেবেছিলাম ফোরজি চালু হলে ন্যূনতম পক্ষে থ্রিজির সার্ভিস হয়তো ভালো পাব, বস্তুতপক্ষে কোনো পরিবর্তন দেখছি না।

তিনি আরও বলেন, কিছু দিন আগে শ্রীলঙ্কা গিয়েছিলাম সেখানে থ্রিজির গতি আমাদের দেশের ফোরজির গতির তুলনায় ভালো।

একই ধরনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন থ্রিজি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী গ্রাহক ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আঞ্জুমান তোয়া। তিনি বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত ফোরজি’তে সিমটি আপগ্রেড করিনি, কিছু কিছু ফ্রেন্ড ফোরজি ব্যবহার করছে, তারা বলছে স্পিডের তুলনামূলক পরিবর্তন নেই। শুধুু শুধু ফোরজি অ্যাকটিভ করে খরচ বাড়াতে চাই না।’

তবে মোবাইল অপারেটরগুলো বলছে, থ্রিজির ইন্টারনেট প্যাকেজগুলোতে যে পরিমাণ টাকা নেওয়া হতো ফোরজিতেও একই পরিমাণ টাকা নেওয়া হবে।

সম্প্রতি একটি সংবাদ সম্মেলনে রবি’র ভাইস প্রেসিডেন্ট একরাম কবির এ বিষয়ে বলেন, এই সেবায় শুধু ইন্টারনেটের স্পিড বাড়ছে, আমরা খরচের পরিমাণ বাড়াব না। স্পিড বাড়ায় লোকজন এখন ভিডিও দেখা ছাড়া অন্য কাজগুলো দ্রুত করতে পারবেন। তবে যদি স্পিডের কারণে কোনো গ্রাহক বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন তবে খরচ বাড়বে।

যদিও বেশিরভাগ মানুষই এখনও সিম রিপ্লেস করে ফোরজি সেবা নেননি। বিটিআরসির তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি শেষে দেশে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৪৫ মিলিয়ন। এর মধ্যে ৭৫ মিলিয়ন গ্রাহক ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। তবে এর মাঝে ১০ শতাংশ গ্রাহকের সিম ফোরজি ব্যবহারোপযোগী।

এদিকে তৃতীয় প্রজন্মের তারবিহীন নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি (থ্রিজি) সেবা চালুর প্রায় ছয় বছর হয়ে গেলেও আশানুরূপ গ্রাহক সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেনি মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো। সারা দেশে থ্রিজি প্রযুক্তি চালুর পর থেকে এখনও পর্যন্ত অর্থাৎ বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশের মোট আয়তনের মাত্র ৬৮ দশমিক ৭১ শতাংশ এলাকা এ নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত রয়েছে। এছাড়া থ্রিজি গতির দিক দিয়েও বেশ পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। লন্ডনভিক্তিক টেলিযোগাযোগ গবেষণা  সংস্থা ওপেনসিগন্যালের সর্বশেষ তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বের ৯৫টি দেশের মধ্যে থ্রিজি সেবা চালু আছে, যার মধ্যে গতির দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম।

এদিকে ফোরজি সিম কিনে প্রতারিত হওয়ার ঘটনা ফেসবুকে তুলে ধরেন মনজুর মাসুদ নামক একজন গ্রাহক। তিনি মোবাইলে স্ক্রিন শট ফেসবুকে আপলোড করে লিখেছেন পুওর-জি (দরিদ্র-জি)। ফোরজি সিম সংগ্রহ করলেও তার স্ক্রিনে টুজি নেটওয়ার্ক দেখাচ্ছে উল্লেখ তিনি বলেন, গুলশান-বনানী ছাড়া কোথাও ফোরজির দেখা মেলে না।

তবে ফোরজি চালুর পর মোবাইল ফোনে স্বাভাবিক ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন রংপুরের বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে তিন মোবাইল ফোন অপারেটরের কোনোটির সিম ব্যবহার করেই ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায়নি। এটা যদি ফোরজি চালুর নমুনা হয় তাহলে দেশে এ সেবার কোনো দরকার নেই।

তবে এ অনাকাক্সিক্ষত অবস্থার জন্য সার্ভার জটিলতাকে দায়ী করছেন অপারেটরা। তারা জানান, ফোরজি চালুর পর কিছু এলাকায় সার্ভার ডাউন হয়ে যায়। এতে স্বাভাবিক সেবা প্রদান ব্যাহত হয়। তবে দ্রুত এটি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, অপারেটরদের থ্রিজি সেবা দেওয়ার অভিজ্ঞতা জানতে ২০১৪ সালে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরেজমিন থ্রিজি সেবা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শেষে একটি সমীক্ষা চালায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিটিআরসি) প্রতিনিধিদল।

তাদের সমীক্ষায় দেখা যায়, থ্রিজিতে দেশে ইন্টারনেটের গতি সবচেয়ে বেশি বাংলালিংকের, সবচেয়ে কম গ্রামীণফোনের। বিটিআরসির সে হিসাব অনুযায়ী, বাংলালিংকের থ্রিজি ইন্টারনেটের গতি গড়ে ২ এমবিপিএস পর্যন্ত। রবির গতি এক দশমিক ৯ এমবিপিএস এবং এয়ারটেলের থ্রিজি ডেটার গতি এক দশমিক ২ এমবিপিএস। চার অপারেটরের মধ্যে গ্রামীণফোনের গতি সবচেয়ে কম। বিভিন্ন প্যাকেজে শীর্ষ এ অপারেটরটি ৫১২ কেবিপিএস এবং ১ এমবিপিএস গতি দিচ্ছে। যদিও বিটিআরসি থেকে ফোরজির সেবা পর্যবেক্ষণে আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।