ফোরজি’র অভিজ্ঞতা যেন সুখকর হয়

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা আট কোটির বেশি; যার মধ্যে কমপক্ষে সাড়ে সাত কোটিই ইন্টারনেট ব্যবহার করেন মোবাইল ফোনে। বলার অপেক্ষা রাখে না, মোবাইল ইন্টারনেটের এমন চাহিদা বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছে স্থানীয় বাজারে স্মার্টফোনের ব্যবসাকে। এর প্রসার ঘটেছে দ্রুততার সঙ্গে। খেয়াল করার বিষয়, স্মার্টফোন ও ডেটা সেবার এ সম্পর্কটি দ্বিমুখী ও পরস্পর নির্ভরশীল। স্মার্টফোন বিক্রি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেও তাই এখানে বেড়ে ওঠে অধিক গতিসম্পন্ন মোবাইল ইন্টারনেটের চাহিদা। এ ধারাবাহিকতায় দেশে থ্রিজি (থার্ড জেনারেশন বা তৃতীয় প্রজন্ম) ইন্টারনেট সেবার চাহিদা গড়ে ওঠে আগেই। রাষ্ট্র মালিকানাধীন সেলফোন অপারেটর টেলিটক দেশে থ্রিজি ইন্টারনেট সেবা প্রদান শুরু করে ২০১২ সালে। আর বেসরকারি অপারেটরগুলো সেবাটি দেওয়া শুরু করে পরের বছরের অক্টোবর থেকে। এখন কথা হলো, সাম্প্র্রতিক সময়ে বহির্বিশ্বে ইন্টারনেট সেবার এত উন্নয়ন ঘটেছে যে, গড়ে তিন দশমিক ৭৫ এমবিপিএস (মেগাবিটস পার সেকেন্ড) গতির ওই থ্রিজি সেবাও আর সন্তুষ্ট করতে পারছে না গ্রাহককে। তারা পেতে চাইছেন ১৬ দশমিক ছয় এমবিপিএস গড় গতির ফোরজি (চতুর্থ প্রজন্ম) সেবা। বাণিজ্যিকভাবে ২০০৯ সালে সেবাটি প্রথম চালু হয় নরওয়ে ও সুইডেনে। বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ প্রায় সব উন্নয়নশীল দেশেই চালু আছে ফোরজি। সে হিসেবে আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে স্থানীয় সেলফোন অপারেটরগুলো বাংলাদেশে ফোরজি সেবা চালু করতে যাচ্ছে বলে যে খবর রয়েছে গতকালের পত্রপত্রিকায়, তা একটি বিলম্বিত সুখবরই বটে। তারপরও আমরা এটিকে স্বাগত জানাই। কথায় বলে, কখনও না হওয়ার চেয়ে দেরিতে হওয়াও ভালো।
দেশে ফোরজি সেবা চালুর সঙ্গে সঙ্গে কিছু প্রশ্ন মনে না এসেও পারে নাÑবিটিআরসি’র সংশ্লিষ্ট নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও। তার কারণ বোধকরি এই যে, থ্রিজি নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা তেমন সুখকর নয়। ফোরজি নীতিমালায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, কত দিনে কোন কোন অঞ্চলে প্রতিশ্রুত ডেটা সেবা জোগাতে হবে ‘বাধ্যতামূলকভাবে’। থ্রিজির বেলায়ও সেসবের উল্লেখ ছিল বৈকি। নিজ সক্ষমতা প্রচারে অনেকে বিজ্ঞাপনও দিয়েছিলেন সব ধরনের মিডিয়ায়। আক্ষেপের সঙ্গে অনেকে লক্ষ করেছেন, ওই বিজ্ঞাপনের পেছনে অতি-বাণিজ্যিকীকরণের বুদ্ধি যতটা ছিল, ততটা ছিল না ব্যবসাকে প্রকৃত চাহিদা পূরণের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার চেতনা। অথচ একটি জরুরি নাগরিক সেবা হিসেবে দেশজুড়ে মানসম্পন্ন থ্রিজি সেবা নিশ্চিতকরণ ছিল সময়ের দাবি। যদিও দেশে দেশে নিরবচ্ছিন্ন সেবাও মানসম্পন্ন সেবার অন্তর্ভুক্ত, তবু স্থানীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নতুন করে অভিযোগ না হয় না-ই তুললাম; কিন্তু থ্রিজি ডেটার দাম নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। অনেকেই কিন্তু মনে করেন, মনোপলির সুযোগে এ ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচার চালিয়েছে একশ্রেণির সেলফোন অপারেটর। বিশেষ সুবিধা ছিল ব্রডব্যান্ড বাজারে তাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকা। এ বিষয়ে বিটিআরসি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, সে কথা বললে অবশ্য ভুল হবে। মাঝে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল বটে; কিন্তু সেগুলো কার্যকর প্রমাণ হয়নি হয় সুপরিকল্পনার অভাব অথবা সেলফোন অপারেটরগুলোর শক্তিশালী ‘কার্টেল’ থাকার কারণে। ফোরজি’র বেলায়ও আশ্বস্ত করা হচ্ছে এই বলে যে, ডেটার দাম বাড়বে না। কিন্তু তাতে গ্রাহক নিশ্চিন্ত হতে পারছেন কি না সন্দেহ। সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখে না, ফোরজি’র আগমন ঘিরে একটা মিশ্র মনোভাব বিরাজ করছে গ্রাহকের মনে। তাদের মনোভাবটি যেন শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক হয়ে ওঠে, সে লক্ষ্যে সেলফোন অপারেটরগুলোর দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। উপরন্তু তারা যেন বিষয়টিতে যত্নশীল থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে বিটিআরসিকে। এটা তার দায়িত্বই শুধু নয় গ্রাহকেরও প্রত্যাশা।