ফোর-জি নিলামে ৬৪% তরঙ্গ অবিক্রীত

শুরুতেই হতাশা

নিজস্ব প্রতিবেদক : ১৯ ফেব্রুয়ারি দেশে চালু করা হচ্ছে চতুর্থ প্রজন্মের (ফোরজি) টেলিযোগাযোগ সেবা। এজন্য গত বছর থেকেই চলছে প্রস্তুতি। গতকাল এ সেবার জন্য তরঙ্গ নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। তবে এতে অংশ নিয়েছে মাত্র দুটি সেলফোন অপারেটর কোম্পানি। আবার তরঙ্গ অবিক্রীত রয়েছে প্রায় ৬৪ শতাংশ। এতে ফোর-জি নিয়ে শুরুতেই হতাশ হয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযাগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাপক ঢাকঢোল পেটানো হলেও অনেকটা হতাশা দিয়েই যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে ফোর-জি সেবা। এতে একদিকে পূরণ হয়নি সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা, অন্যদিকে সেবার মান নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।

গতকাল রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে ফোর-জি ইন্টারনেট সেবার নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। নিলামে অংশ নিয়ে চতুর্থ প্রজšে§র সেবার জন্য গ্রামীণফোন ও বাংলালিংক ১৫.৬ মেগাহার্টজ তরঙ্গ কিনেছে, যদিও এ সেবার জন্য মোট ৪৩ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নিলামে তোলা হয়। অর্থাৎ মোট তরঙ্গের ৩৬ দশমিক ২৭ শতাংশ তরঙ্গ নিলামে বিক্রি হয়, বাকি ৬৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ অবিক্রীত থেকে যায়।

নিলামে অংশ নিয়ে এক হাজার ৮০০ মেগাহার্টজ ব্র্যান্ডে গ্রামীণফোন পাঁচ মেগাহার্টজ তরঙ্গ কিনেছে। এজন্য ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে কোম্পানিটি। আর বাংলালিংক কিনেছে দুই হাজার ১০০ মেগাহার্টজ ব্র্যান্ডে পাঁচ মেগাহার্টজ ও এক হাজার ৮০০ মেগাহার্টজ ব্র্যান্ডে কিনেছে পাঁচ দশমিক ছয় মেগাহার্টজ তরঙ্গ। অর্থাৎ বাংলালিংক ১০ দশমিক ছয় মেগাহার্টজ তরঙ্গ কিনেছে। এতে কোম্পানিটিকে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে ৩০ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

সূত্রমতে, এক হাজার ৮০০ মেগাহার্টজ ব্র্যান্ডে প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গের দাম ধরা হয়েছে তিন কোটি ডলার। এ ব্র্যান্ডে নিলামে তোলা হয় ১৮ মেগাহার্টজ তরঙ্গ। অর্থাৎ এ খাত থেকে বিটিআরসির আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৪ কোটি ডলার। এছাড়া দুই হাজার ১০০ মেগাহার্টজ ব্র্যান্ডে নিলামে তোলা হয় ২৫ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম। এক্ষেত্রে প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গের দাম নির্ধারণ করা হয় দুই কোটি ৭০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এ খাত থেকে ৬৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল।

সব মিলিয়ে ফোর-জি নিলামে বিটিআরসির আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২১ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা ১০ হাজার ৫৫ কোটি টাকা। তবে দুই কোম্পানির কাছে নিলামে তরঙ্গ বিক্রি বাবদ বিটিআরসির আয় হয়েছে মাত্র তিন হাজার ৭৪৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর বাইরে টু-জি ও থ্রি-জি সেবার জন্য বরাদ্দ করা তরঙ্গে প্রযুক্তি নিরপেক্ষতা দিয়ে (যাতে ওই তরঙ্গ যে কোনো প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা যায়) গ্রামীণফোন ও বাংলালিংকের কাছ থেকে সরকার পেয়েছে ৮৫০ কোটি ৪০ লাখ টাকা ও ভ্যাট বাবদ ৯৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

এদিকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অপারেটর রবি তাদের হাতে থাকা তরঙ্গ প্রযুক্তি নিরপেক্ষতায় রূপান্তর করে ফোর জি সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এজন্য তারা নিলামে অংশ না নিলেও ৫৯৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা দিচ্ছে। সব মিলিয়ে সরকারের আয় হয়েছে পাঁচ হাজার ২৬৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

এদিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া অপারেটর সিটিসেল নিলামে অংশ না নেওয়ায় তাদের আবার চালু হওয়ার সম্ভাবনা আর থাকল না। এছাড়া তরঙ্গের প্রযুক্তি নিরপেক্ষতার সুবিধা পেতে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটর টেলিটক ফোর জি সেবায় আসতে চাইলে ওই সময়ের মধ্যে তাদের প্রযুক্তি নিরপেক্ষতার সুবিধা নিতে হবে।

নিলাম অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিটিআরসির চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ। এছাড়া বিটিআরসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও মোবাইল ফোন অপারেটরের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। পর্যাপ্ত তরঙ্গ থাকায় নিলাম অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি মোবাইল অপারেটর টেলিটক ও রবি।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘আমরা টেক নিউট্রালিটি দিয়েছি, তরঙ্গ দিয়েছি। এখন বলতে পারবেন না এগুলো নেই। আপনারা গ্রাহক বাড়াচ্ছেন, কিন্তু তরঙ্গ বাড়াচ্ছিলেন না। এই নেই নেই অবস্থা এখন আর নেই। আপনারা যদি বিষয়টি উপলব্ধি করেন তাহলে ভালো হয়। গ্রাহকদের মোবাইল সেবার ব্যাপারে ত্রুটি থাকবে, এটা মেনে নেওয়া যাবে না। আমার কাছে গুণগত মানই প্রথম অগ্রাধিকার।’

মন্ত্রী নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘মোবাইল ফোন সেবায় অনেক সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে কলড্রপ একটি বড় সমস্যা। এমনও দেখা গেছে, একটি কলে আটবার পর্যন্ত কলড্রপ হয়েছে। এটা চলতে দেওয়া যাবে না। এসব সমস্যা দূর করতে হবে।

নিলাম শেষে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান শাজাহান মাহমুদ প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বলেন, নিলামে অংশ নিয়ে দেশের দুই অপারেটর বাংলালিংক ও গ্রামীণফোন মোট তিন হাজার ৮৪৪ কোটি টাকায় ফোরজি তরঙ্গ বরাদ্দ নিয়েছে। এছাড়া টু জি ও থ্রি জি সেবার জন্য বরাদ্দ করা তরঙ্গে প্রযুক্তি নিরপেক্ষতা দিয়ে গ্রামীণফোন, বাংলালিংক ও রবির কাছ থেকে সরকার পেয়েছে এক হাজার ৪৪৫ দশমিক শূন্য আট কোটি টাকা।

ফোর-জি সেবা প্রদানে অপারেটরগুলো যে পরিমাণ তরঙ্গ কিনেছে, তা থেকে গ্রাহকরা কতটুকু সেবা পাবেÑএমন প্রশ্নের জবাবে শাহজাহান মাহমুদ বলেন, অপারেটরগুলো যে পরিমাণ স্পেকট্রাম কিনেছে তা থেকে কোয়ালিটি অব সার্ভিস প্রদান করা যাবে না। কোয়ালিটি মেইনটেইনের জন্য অপারেটরদের আরও স্পেকট্রাম কেনা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, আগামী ১৯ ফেব্রয়ারি ফোর-জি ইন্টারনেট সেবা অনুমোদন দেওয়া হবে। সেদিনই লাইসেন্স প্রদানের মাধ্যমে ফোর-জি সেবার উদ্বোধন করা হবে।

নিলাম-পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে গ্রামীণফোনের সিইও মাইকেল ফোলি বলেন, ‘আমাদের প্রযুক্তি নিরপেক্ষ তরঙ্গের সঙ্গে নতুন এই তরঙ্গ যোগ হওয়ায় গ্রামীণফোন দেশের সবচেয়ে আধুনিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সেরা ফোরজি সেবা প্রদানে একটি দৃঢ় অবস্থানে পৌঁছে গেল।’

এদিকে এক সংবাদ বিবৃতিতে বাংলালিংকের সিইও এরিক অস বলেন, ‘গ্রাহকদের উন্নতমানের ডিজিটাল সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে তরঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নতুনভাবে সংযোজিত তরঙ্গের ফলে আমরা গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন ডিজিটাল সংযোগ ও আরও উন্নত কাভারেজ দিতে সক্ষম হবো, যা গ্রাহকদের আরও ভালো সেবা দিতে সাহায্য করবে।’

উল্লেখ্য, ফোর-জি নীতিমালা অনুসারে ১৮ মাসের মধ্যে সব জেলা শহরে নতুন এ সেবা চালু করতে হবে। আর ৩৬ মাসের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে এ সেবা নিয়ে যেতে হবে। তবে শুরুর দিকে শুধু বড় শহরেই এ সেবা পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা, কেননা এখনও সারা দেশে থ্রিজি নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করতে পারেনি টেলিকম অপারেটরগুলো।