বই উৎসব ও সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন: প্রতিবছরের মতো এবারও খ্রিষ্টীয় নববর্ষের দিন অনুষ্ঠিত হলো বই উৎসব। বাঙালির ১২ মাসে ১৩ পার্বণের মধ্যে যোগ হলো আরেকটি পার্বণ। যে কোনো উৎসবে মাতোয়ারা বাঙালি জীবনে বই উৎসবটাও নতুনভাবে যোগ করল আরেকটি উপলক্ষ। বই উৎসবটি শুধু শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এই উৎসবের বিস্তৃতি ঘটেছে স্কুল কমিটি, অভিভাবক ও গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যেও। পাঠ্যবই বিতরণের জন্য ১ জানুয়ারি একটি প্রতীক্ষিত দিন হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের কাছে। এ দিনটিতে বিশেষ করে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মাঠটির দৃশ্যপট নতুন এক আমেজে মেতে ওঠে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, স্কুল কমিটির সদস্য, গ্রামের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, অভিভাবকসহ সাধারণ মানুষের সমাগম ঘটে স্কুলমাঠে। নতুন বই পাওয়ার আনন্দে মেতে ওঠে শিক্ষার্থীরা, আর সেই আনন্দের রেশ ছড়িয়ে পড়ে সারা গাঁয়ে। শুধু গ্রামে নয়, এ বই উৎসবটি সারা দেশের ছোট-বড় শহরসহ মহানগর ও রাজধানীতেও অনুষ্ঠিত হয়। তবে গ্রামের উৎসবটা চোখে পড়ার মতো। অনেকটা নবান্নের প্রাপ্তির মতো শিক্ষার্থীদের বই পাওয়ার বিষয়টা। বর্তমান সরকারের এই বিতরণ উৎসবটা সর্বজনীনতা পেতে শুরু করেছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও টেক্সট বুক বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত কারিকুলামে মুদ্রিত প্রাথমিক শিক্ষার জন্য তৈরি সব বই সরকারি-বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয়। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্ধারিত দিন ১ জানুয়ারি পাঠ্যপুস্তক শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করে।

নিয়মানুসারে প্রাথমিক শিক্ষায় সরকার-নির্ধারিত পাঠ্যবই সব প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য। প্রাথমিক শিক্ষার কারিকুলাম অনুসারে শিক্ষণ পদ্ধতি একই ধরনের, কিন্তু তারপরও বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠা প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটু ভিন্নতা দেখা যায়। মূলত এই ভিন্নতাটা কৌশলগত বাহ্যিক একটা আবরণ, যে আবরণের মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষাবাণিজ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে। শিক্ষানীতির নিয়মানুসারে যার শিক্ষার মান এক, কায়দা করে উন্নত মানের শিক্ষার নামে সেটিতেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উচ্চ হারে শিক্ষার মূল্য নেওয়া হয়। তাই প্রশ্ন জাগেÑএকই পাঠ্যপুস্তক, একই সিলেবাস ও কারিকুলাম থাকা অবস্থায় কেন বাণিজ্যিকীকরণ করে মুনাফা অর্জনের বিষয়টি সৃষ্টি হলো? সরকার দেশের প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বছরের শুরুতে বই প্রদান করতে পারলেও সব প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান নিবিড়ভাবে নজরদারি করতে পারে না, তাই প্রাথমিক শিক্ষাটা ব্যবসায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক। সরকার দেশের পাঁচ থেকে ১২ বছর বয়সী সব শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান করতে বাধ্য। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার মাঝে বাণিজ্যিকীকরণ করে মুনাফা অর্জনের পথগুলো সৃষ্টি হলো কেন? প্রাথমিক শিক্ষাটা সর্বজনীন ও একই ধরনের হওয়ার কথা। তা না হয়ে প্রাথমিক শিক্ষাটাও বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরিত হয়ে গেল? এর জন্য দায়ী কারা?

দেশে এখন বাণিজ্যিকভাবে মুনাফা অর্জনের জন্য কিছু প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জš§ হয়েছে। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলোর প্রধান কার্যালয় ঢাকা, চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল বা দেশের অন্য কোনো জায়গায়, আর এগুলোর শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের আনাচে-কানাচে। এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে অসংখ্য কিন্ডারগার্টেন, ইসলামি ক্যাডেট নামের কিছু প্রতিষ্ঠান। বাণিজ্য করার জন্য লাভজনকভাবে গড়ে ওঠা প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানকারী শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টিও নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। উল্লিখিত বাণিজ্যিকভাবে গড়া ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরতদের চেয়ে বেশি। কম-বেশি যা-ই হোক, সাধারণ মানুষের উদ্যোগে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুণগত মান ভালো। তা যদি না হয় তাহলে কেন মানুষ শিশুদের শিক্ষার গুণগত মান বেশি পাওয়ার আশায় ছুটছে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে? বাস্তবে দেখা যায়, সরকারি ও বাণিজ্যিকভাবে গড়া ওঠা প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মরত শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেক শিক্ষক রয়েছেন, যারা এখনও ছাত্রত্ব শেষ করেননি। তারা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়পড়–য়া, তাদের অনেকেরই মৌলিক প্রশিক্ষণ নেই। অন্যদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরতদের মধ্যে দেখা যায়, যারা গত ১০ বছরের মধ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাদের বেশিরভাগই স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। তাছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষকই সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন-সিইনএড ডিগ্রিপ্রাপ্ত। এই ডিগ্রিটা পেয়ে থাকেন শিক্ষকরা প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষণ প্রদানের পদ্ধতি ওপর দু’বছরমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে। বাণিজ্যিকভাবে গড়া ওঠা প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মৌলিক প্রশিক্ষণ কতটুকু আছে, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে না কোনো সময় এ কারণে যে, তাদের প্রদান করা শিক্ষার মান প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর চেয়ে ভালো। আর ভালো বলার পেছনে কারণ একটাইÑঅভিভাবকরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সন্তান পাঠিয়ে গুণগত শিক্ষা পাবেন না। তাই তারা অর্থ ব্যয় করে বাণিজ্যিকভাবে গড়া ওঠা প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে সন্তানকে ভর্তি করাচ্ছেন। দেশে অনেক কিন্ডারগার্টেন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশ শিক্ষকই খণ্ডকালীন (পার্ট-টাইম) শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। অন্যদিকে  পূর্ণকালীন চাকরি হিসেবে কাজ করছেন দেশের প্রাথমিক শিক্ষকরা। সরকার প্রাথমিক শিক্ষকদের পেশাগত উৎকর্ষ বৃদ্ধির জন্য প্রতিটি উপজেলায় ও মহানগরীতে থানা অনুসারে ক্লাস্টারভিত্তিক এলাকা ভাগ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। তারপরও সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকরা বেসরকারি বা বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাছে প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছেন, আর এই হেরে যাওয়ার কারণে প্রাথমিক শিক্ষাটা বিভাজিত হয়ে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়ে পড়ছে। প্রাথমিক শিক্ষার এই বিভাজনটা কি জাতির জন্য হিতকর? দেশের সাধারণ মানুষ কেন প্রাথমিক শিক্ষকরা যে গুণগত উচ্চ মানের শিক্ষা প্রদান করতে পারে সেই বিষয়ের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না? এই প্রশ্নের সদুত্তরটা কি সরকারি শিক্ষা বিভাগের কোনো কর্তৃপক্ষ দেবে? সরকারের শিক্ষাসংক্রান্ত বিভাগের কর্তাব্যক্তিরা কি বিষয়টি কোনোদিন ভেবে দেখেছেন? জনসাধারণের কাছ থেকে সংগ্রহ করা রাজস্বের কোটি কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ব্যয়িত হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষার পেছনে আর দেশের মানুষ প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে। তাছাড়া দিন দিন প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে সাধারণ মানুষের নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে। গুণগত মানের বিষয়ে প্রশ্ন থাকায় অভিভাবকরা মুনাফাখোরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্তানকে ভর্তি করাচ্ছেন। প্রতি বছর জানুয়ারি এলেই সন্তানকে কোথায় ভর্তি করাবেন, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন অভিভাবকরা। দেশের শিক্ষানীতিতে বর্ণিত প্রাথমিক শিক্ষাসম্পর্কীয় বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করলে বলা যায়, এমনটি হওয়ার কথা নয়। তারপরও একটি শিশুকে নানা ধরনের ভর্তিযুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়। দেশের সরকারি বিভাগে কর্মরত ব্যক্তিদের কত জনের সন্তান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের সন্তানরাও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে না। এ রকম ঘটনা থেকে একটি গল্প মনে পড়লÑএক খাবার দোকানের মালিক দুপুরবেলা কর্মচারীকে ডেকে বললেন, আমি খেতে যাচ্ছি, তুই ক্যাশবাক্সের দিকে খেয়াল রাখিস। এ কথার অর্থ হলো খাবার দোকানের মালিকও জানেন তার দোকানের খাবার ভালো নয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কর্মরত শিক্ষকরা যখন গুণগত মানের প্রশ্নে নিজ সন্তানকে তার বিদ্যালয়ে পড়ান না, তখন কী করে সাধারণ মানুষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানের ওপর আস্থা রাখবেন। দেশের প্রাথমিক শিক্ষার সর্বজনীন ও গুণগত মান ভালো করার লক্ষ্যে সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের সন্তানদের নিজ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে। তাছাড়া সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগকারী সব স্তরের সরকারি কর্মীদের সন্তানকেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি বাধ্যতামূলক করা দরকার। দেশের শিক্ষানীতির দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রাক প্রাথমিক শিক্ষার শিরোনামে বলা হয়েছে, অন্যান্য গ্রহণযোগ্য উপায়ের সাহায্যে ছবি, রং, মডেল, গল্প, ছড়া ও কবিতার মাধ্যমে শিক্ষাদান পদ্ধতি চালু করা। প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার মাধ্যমে ‘বাংলা’ শব্দটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও বলা হয়েছে, দেশজ আবহের মাধ্যমে শিক্ষণ পদ্ধতির কথা। মূল বিষয়টি হচ্ছে, এদেশের সাংস্কৃতির পরিমণ্ডলের প্রভাবে প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা পদ্ধতিটি পরিচালিত হবে। অর্থাৎ প্রাথমিক স্তরের ভাষা হবে বাংলা ও প্রযোজ্য বিশেষ অঞ্চলে বাংলাদেশি অদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা। এ শিক্ষানীতির সঙ্গে দেশে চলমান শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। শিক্ষানীতিতে বলা আছে, প্রাক-প্রাথমিক স্তরের পরবর্তী হবে প্রাথমিকের প্রথম শ্রেণি। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানাধীন গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রাক-প্রাথমিক স্তরে রয়েছে চারটি শ্রেণিÑ প্রি-প্লে, প্লে, কেজি ও নার্সারি। এই বাণিজ্যিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারিভাবে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের জন্য নির্ধারিত পাঠ্যকৃত বইয়ের বাইরে নিজেদের ইচ্ছামাফিক পাঠ্যপুস্তক এবং সিলেবাস তৈরি করে শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেয়। তাছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাক-প্রাথমিক স্তরে উর্দু ও আরবি ভাষা শেখানো হয়। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার উপকরণ এবং এ পদ্ধতি সর্বক্ষেত্রে অভিন্ন হওয়া প্রয়োজন।

দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন করতে হলো বহুধাবিভক্ত শিক্ষার পাঠ্যক্রমকে বাতিল করতে হবে। শুধু বই উৎসব সার্বজনীন হলে হবে না। সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার জন্য দেশের সব প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে অভিন্ন নিয়মনীতি চালু করা দরকার।

 

ফ্রিল্যান্স লেখক

[email protected]