আজকের পত্রিকা

বগুড়ায় দেড় হাজার হেক্টর জমির পাকা ধান ক্ষতিগ্রস্ত

পারভীন লুনা, বগুড়া: ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে দুদিন টানা বৃষ্টির ফলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমির ধান হেলে পড়েছে এবং জমিতে আটকে যাওয়া ধান পানিতে ভাসছে। বিশেষ করে নিন্মাঞ্চলে ক্ষতির পরিমাণ বেশি বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে আধাপাকা ধানও কাটছে। কিন্তু শ্রমিক সংকটে ধান কাটতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে কৃষককে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, জেলায় এবার এক লাখ ৮০ হাজার ৭৮১ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। কিন্তু চাষ হয়েছে এক লাখ ৮৮ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে, যার মধ্যে ফণীতে আক্রান্ত হয়ে এক হাজার ৩১০ হেক্টর জমির ফসল হেলে পড়েছে এবং জমিতে আটকে যাওয়া পানিতে ভাসছে। জেলার নন্দীগ্রামের অবস্থা বেশি খারাপ। এই অঞ্চলের চাষিরা আগাম জাতের ধান চাষ করায় প্রায় জমির ধান এখন পাকা। সপ্তাহ দুয়েক আগেই কৃষক ধান কাটা শুরু করেছে। এর মধ্যে বৃষ্টি ও বাতাস হওয়ায় এসব জমির ধান মাটিতে শুয়ে পড়েছে। এতে অনেক ধান গাছ থেকে ঝরে পড়েছে। ফলন কম হওয়ার আশঙ্কায় এই অঞ্চলের কৃষকরা অনেকটাই হতাশ হয়ে পড়েছে।
তবে ঘূর্ণিঝড় ফণীর আশঙ্কায় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর মাইকিং করে কৃষকদের পাকা ধান কেটে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল, যাতে প্রাকৃতিক এই দুর্যোগের আগেই কৃষকরা পেকে যাওয়া ধান ঘরে তুলতে পারেন। ‘ফণী’র আগের দিন পর্যন্ত জেলায় ২০ হাজার ৩৯০ হেক্টর (১১ শতাংশ) জমির ধান কাটা হয়েছিল। অর্থাৎ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা সাত লাখ ১৬ হাজার ৬৬৩ টনের মধ্যে ৭৪ হাজার ৩৯২ টন ধান ঘরে তোলা হয়েছিল।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার সারিয়াকান্দি সদর, হাটশেরপুর, নারচী, কুতুবপুর, কামালপুর, ভেলাবাড়ী ইউনিয়নসহ উপজেলার জমিগুলোতে পাকা ও আধাপাকা বোরো ধানগাছ হেলে পড়েছে এবং জমিতে জমে থাকা পানিতে ভাসছে।
এ উপজেলার কৃষক সাইদুর রহমান জানান, জমির ধান এখনও পাকেনি। বৃষ্টির পানি ও ঝড়ো হাওয়ায় ধানগাছ হেলে পড়ায় এবং জমিতে জলাবদ্ধতা হওয়ায় তারা ধান কেটে ঘরে তুলছেন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এমনিতেই এবার বাজারে ধানের দাম কম। সেইসঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এবার লোকসান গুনতে হবে তাদের।
কেননা বাজারে বর্তমানে ধানের দাম মণপ্রতি ৬৭০ টাকা। এক বিঘা জমিতে ধান রোপণ থেকে শুরু করে মাড়াই পর্যন্ত কৃষকের খরচ পড়ে প্রায় ১২ হাজার টাকা। এক বিঘা জমিতে কৃষক ধান পায় ২০ থেকে ২২ মণ। সে তুলনায় কৃষক এবার বিঘাপ্রতি পেয়েছে ১৩ হাজার ৪০০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। বৃষ্টির পর ধান কেনাবেচা বন্ধ আছে। বিভিন্ন এনজিও ও দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে জমিতে বিনিয়োগ করে এবং হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে এত স্বল্প পরিমাণ টাকা প্রাপ্তি জেলার কৃষকদের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তুলেছে।
সদর উপজেলার ফাঁপোড় ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায় একই চিত্র। এ দিকেও অনেক জমির ধান শুয়ে পড়ে পানিতে ভাসছে। সদর উপজেলার ময়াজ মিয়া জানান, তিনি এবার সাড়ে পাঁচ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। স্বপ্ন ছিল জমির ধান ঘরে তুলে কিছু ধান বিক্রি করবেন আর বাকিগুলো নিজেদের খাবারের জন্য রেখে দেবেন। কিন্তু ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির পানিতে তার সেই স্বপ্নে গুড়েবালি হয়েছে। জমিতে জলাবদ্ধতা থাকায়, ধান কাটার শ্রমিকদের মজুরি বেশি হওয়ায় এবং পর্যাপ্ত শ্রমিক না পাওয়ায় তিনি তার বোবা স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে জমির ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন।
ধান কাটা শ্রমিকরা জানান, এর আগে বিঘাপ্রতি ধান কাটার মজুরি সাড়ে তিন হাজার টাকা করে পেলেও এখন জমিতে পানি জমে যাওয়ায় তারা বিঘাপ্রতি আরও এক থেকে দেড় হাজার টাকা বেশি নিচ্ছেন। কারণ শুকনো জমিতে ধান কাটতে পরিশ্রম কম হয় এবং অল্প সময়ে কাটা যায়। জলাবদ্ধ জমিতে সময় বেশি লাগে। এছাড়া জোঁকসহ পোকামাকড়ের কারণে চর্মরোগ হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক নিখিল চন্দ্র বিশ্বাস জানান, ফণীর প্রভাবে যেসব জমির ধান পেকে গেছে বা আধাপাকা, সেগুলো কৃষকদের কেটে ঘরে তুলতে আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া জলাবদ্ধতা দূর করতে কৃষকদের জমি থেকে পানি বের করে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে দু-এক দিনের মধ্যে জমির পানি নেমে যাবে।

সর্বশেষ..