বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হোক

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ব্যবহারে এর পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএসসিএল) সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) সই করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এর মধ্য দিয়ে কোনো সংস্থা প্রথমবারের মতো দেশের নিজস্ব স্যাটেলাইটটির সেবা নিতে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিটির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলো। এটা সুখবর। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে তারা পুরোদমে সেবা জোগানো শুরু করতে পারবেন এবং পর্যায়ক্রমে আরও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তির পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। আমরা বিসিএসসিএলের পরিকল্পনার সফলতা কামনা করি। এ স্যাটেলাইটের বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়লে পরিচালনার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটি শুধু মুনাফাই করবে না; এ ধরনের সেবা প্রাপ্তির জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ও কমানো যাবে। যেসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনায় স্যাটেলাইট সেবা প্রয়োজন, তারাও বিসিএসসিএলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হবে বলেই আশা। তাহলে যে লক্ষ্যে বিপুল ব্যয়ে নির্মিত দেশের প্রথম স্যাটেলাইটটি মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে, তা কিছুটা হলেও সফল হবে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তির সুবাদে বাংলাদেশের জলসীমায় সাগর ও নদীতে অবস্থানরত দেশি-বিদেশি জাহাজ এবং নৌযানকে উপগ্রহ সেবা দেবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। এটি ব্যবহার করে সাগর ও নদীতে অবস্থানরত নৌযানগুলো পাবে আবহাওয়ার সঠিক তথ্যসহ কিছু জরুরি সেবা। এতে বিশেষত আবহাওয়া খারাপ থাকাকালে বড় নৌ দুর্ঘটনা এড়ানো যাবে বলেই মনে হয়। জাহাজে অবস্থানরত নাবিক ও যাত্রীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা গেলে তারা কোনো কারণে বিপদে পড়লেও এ উপগ্রহের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে উদ্ধার কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে। মনে রাখা দরকার, প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ তার জলসীমার নিরাপত্তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় প্রতিবেশী দেশ দুটির জেলেদের মৎস্য আহরণ ও অন্যান্য নৌযান প্রবেশের খবর প্রকাশ হয় মাঝেমধ্যেই; যদিও দেশ দুটি এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। আমরা আশা করব, দেশের জলসীমার নিরাপত্তা ও সমুদ্র সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিতেও এ উপগ্রহকে কাজে লাগানো হবে।
অভ্যন্তরীণ নৌ ও সমুদ্রপথে চলমান নৌযানে টেলিযোগাযোগ, টেলিভিশন ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা জোগানো এখন সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণেও নৌপথে যাতায়াতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন অনেকে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এ উপগ্রহকে কাজে লাগিয়ে উল্লিখিত সেবাগুলো জোগানো সম্ভব হবে। আমাদের ধারণা, তাহলে জলপথে যাতায়াতে আগ্রহ আরও বাড়বে। নৌপথের বড় সুবিধা হলো, সড়কের মতো এতে যানজট নেই; খরচও অপেক্ষাকৃত কম। কিন্তু আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে বেশ কিছু রুটে নৌপথ সচল থাকা সত্ত্বেও যাত্রীদের উল্লেখযোগ্য অংশ সেটি ব্যবহার করতে চায় না। এ অবস্থায় নৌযান পরিচালনাকারীদের উচিত হবে নতুনভাবে সংযোজিত এসব সুবিধার বিষয়টি যাত্রীদের মধ্যে প্রচারের ব্যবস্থা করা। নৌযান পরিচালনা-সংশ্লিষ্টদের মনে রাখা দরকার, এসব সুবিধার মানসম্পন্ন জোগান নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যবসার বিস্তার ঘটানো সম্ভব। আমরা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ব্যবহারের মাধ্যমে নৌপথে যাত্রীসংখ্যার প্রবৃদ্ধিও দেখতে চাইব।
নৌপরিবহন মন্ত্রী অনুষ্ঠানে বলেছেন, এ চুক্তির মাধ্যমে স্যাটেলাইটি নির্মাণে যে বিনিয়োগ করা হয়েছে, তা ফেরত আসার প্রক্রিয়া শুরু হলো। আমরা চাইব, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, টেলিযোগাযোগ, চিকিৎসা, বিনোদনসহ প্রাত্যহিক জীবনের যেসব ক্ষেত্রে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সেগুলোসহ দেশের সার্বিক অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। এও প্রত্যাশা, বাণিজ্যিক ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে এটি নির্মাণে নেওয়া বিদেশি ঋণ নির্ধারিত সময়ে পরিশোধেরও পদক্ষেপ নেবে বিসিএসসিএল।