বছরের ব্যবধানে আমানতের সুদহার বাড়াল ৩২ ব্যাংক

নাজমুল ইসলাম ফারুক ও মেহেদী হাসান: রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন ইদ্রিস আলী (ছদ্মনাম)। তিনি সঞ্চয়ী হিসাব খুলতে গেলেন ইস্টার্ন ব্যাংকে। ব্যাংকের কর্মকর্তারা তাকে জানান, ‘এফডিআরে ভালো রেট আছে। সঞ্চয়ী হিসাবে অর্থ না রেখে এফডিআর করলে বেশি লাভবান হবেন।’ কিন্তু ওই গ্রাহক ব্যাংক কর্মকর্তার কথায় বিশ্বাস না করায় তাকে প্রিন্টেড চার্ট দেখালেন ব্যাংক কর্মকর্তা। এতে দেখা গেল, ব্যাংকটিতে আগে এক বছর মেয়াদি আমানতে চার শতাংশ সুদ দেওয়া হতো। এখন তা বাড়িয়ে সাত শতাংশ পর্যন্ত করা হয়েছে।

এদিকে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কল্যাণ ফান্ডের অর্থ একটি ব্যাংকে এফডিআর করা। শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠান প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি কল্যাণ ফান্ডের এফডিআরের অর্থ তাদের ব্যাংকে স্থানান্তরের প্রস্তাব দেন। এতে আগের চেয়ে বেশি মুনাফা পাওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

শুধু আলোচিত ব্যাংক দুটিই নয়, বেশ কয়েকটি ব্যাংক আমানত সংগ্রহের জন্য এখন গ্রাহকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। আমানতকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার গত বছর একটু একটু করে বাড়িয়েছে। এতে বছরের ব্যবধানে বেসরকারি ৩২ ব্যাংকের আমানতের সুদহার বেড়ে গেছে।

যেসব ব্যাংক আমানতের সুদহার বাড়িয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে এবি ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, আইএফআইসি, ইসলামী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল, ওয়ান ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচাল ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, দি সিটি ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংক।

আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, দিন দিন বিভিন্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এগুলো আদায়ের হারও কমছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও ঋণপ্রবাহ কিছুটা বেড়েছে। গত ডিসেম্বর ক্লোজিংয়ে এসে অধিকাংশ ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা হলেও তাদের প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। প্রভিশন সংরক্ষণের পর তাদের মুনাফা কী পরিমাণ দাঁড়ায়, তা নিয়ে অনেকে সংশয়ে রয়েছে। এছাড়া অতীতে কিছু ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিতে থাকতে দেখা গেছে।

তাদের মতে, নানা কারণে ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এতে নগদ অর্থের সংকটে পড়েছেÑআশঙ্কা রয়েছে ব্যাংকগুলোর। এ কারণে ব্যাংকগুলো তাদের স্থায়ী আমানতের সুদহার বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

এ বিষয়ে ব্যাংকারদের শীর্ষ সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) সাবেক প্রেসিডেন্ট ও মেঘনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. নুরুল আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৯ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদানের ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। গত প্রান্তিকের আগে প্রায় আড়াই বছর ধরে ব্যাংকগুলোতে বেশ তারল্য ছিল। বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য ব্যাংকগুলো আমানত ও ঋণের সুদহার কমিয়েছিল। তবে গত প্রান্তিক থেকে এটা বাড়তে শুরু করেছে। চলতি প্রান্তিকে এসে আমানত ও ঋণ উভয়েরই সুদহার বাড়বে। এদিকে আমদানিও মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এবার এটা ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে। এছাড়া সরকারের মেগা প্রজেক্টে খরচ আছে। এতে সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়বে। এসব কারণে ব্যাংকগুলো আমানত আকর্ষণে সুদ হার বাড়াচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এ বছর কিন্তু নির্বাচনি বছর। ধারণামতে নির্বাচনি বছর কিছু অর্থপাচার হয়। এছাড়া সার্বিক খরচও বেড়ে যায়। ঋণের সুদহারও চলতি প্রান্তিক অথবা এর পরের প্রান্তিকে বাড়বে। এ বছর যে তারল্য বাড়বে এমন সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে সরকারি ব্যাংকগুলোর কাছে অনেক টাকা। তবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কাছে তেমন টাকা নেই। এছাড়া আরেকটি বিষয় হচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমানত ঋণের অনুপাত (এডিআর রেশিও) কমাচ্ছে।

তথ্যমতে, সদ্য সমাপ্ত বছরের ডিসেম্বরে এবি ব্যাংকের এক বছর মেয়াদি স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) সুদের হার দাঁড়িয়েছে সাত দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত। তার আগের বছর ডিসেম্বরে তা ছিল ছয় শতাংশ। এক বছর মেয়াদি স্থায়ী আমানতে ইস্টার্ন ব্যাংকের সুদহার চার শতাংশ থেকে সাত শতাংশ, আগের বছর একই সময়ে ব্যাংকটির সুদহার ছিল চার শতাংশ। গত ডিসেম্বর থেকে ব্যাংক এশিয়ার এক বছর মেয়াদি স্থায়ী আমানতের সুদহার সাত শতাংশ, আগের বছর একই সময়ে সুদহার ছিল সাড়ে পাঁচ শতাংশ। এছাড়া গত ডিসেম্বর থেকে ব্র্যাক ব্যাংকের সুদহার করা হয়েছে পাচ শতাংশ থেকে আট শতাংশ, এক্সিম ব্যাংক সাড়ে ছয় থেকে  আট শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংক সাত দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে আট শতাংশ, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সুদহার আট থেকে সাড়ে আট শতাংশ।

এ বিষয়ে এবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, আমানত ঋণের অনুপাত (এডিআর রেশিও) কমাতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব চিন্তা-ভাবনা করেই আমরা আমানতের সুদহার বাড়িয়েছি। তিনি জানান, নীতিমালা অনুযায়ী দেশে মোট আমানতের মাত্র ২৫ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকগুলো পাচ্ছে। অন্যদিকে ৭৫ শতাংশ আমানত পাচ্ছে সরকারি খাতের ব্যাংকগুলো। শুধু সোনালী ব্যাংকেই এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা আমানত রয়েছে। যেখানে তাদের ঋণ মাত্র ৪৬ থেকে ৪৭ হাজার কোটি টাকা।

এদিকে গত দুই বছরে আমানতের সুদহার কমার কারণে ব্যাংকগুলোতে আমানতের পরিমাণ কমে গেছে বলে মনে করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমানতের সুদহার বাড়লেও গড় হিসাবে এখন যেটা আছে, সেটা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। ফলে আমানতকারীরা ব্যাংকে টাকা রাখলে তাদের কোনো লাভ হচ্ছে না। এতে আমানত প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। আর এ কারণে তারা সুদহারটা কিছুটা বাড়িয়েছে। এছাড়া ঋণ প্রবৃদ্ধিও বেড়েছে। ফলে নগদ অর্থের প্রয়োজন মেটাতেও ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহে জোর দিচ্ছে।