বনের জমিতে কারখানা ইনডেক্স এগ্রোর

পলাশ শরিফ: পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের অপেক্ষায় রয়েছে ইনডেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ‘ইনডেক্স এগ্রো’। তবে তালিকাভুক্তির আগেই ব্যাংক ঋণ ও মালিকানায় পারিবারিক আধিপত্য ইস্যুতে বিতর্কের মুখে রয়েছে কোম্পানিটি। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ময়মনসিংহের ভালুকায় বনভূমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। তবে ‘বনের জমি দখলের অভিযোগ সত্য নয়’ বলে দাবি করেছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।

বন বিভাগের তথ্যমতে, ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ী বন বিটের অধীন কাঁঠালী মৌজায় সিএস ১০৭ নং দাগে ৪৫ একর ৫০ শতক জমির মালিক বন বিভাগ। প্রায় দেড় যুগ আগে ওই জমির মধ্যে প্রায় পাঁচ একর দখল করেন ইনডেক্স গ্রুপের কর্ণধার মাযহারুল কাদের। ২০১১ সালের জুনে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা দলিলের মাধ্যমে ওই জমি নিজেদের প্রতিষ্ঠান ইনডেক্স এগ্রোর কাছে বিক্রি করেন। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসংলগ্ন ওই জমিতে বর্তমানে ইনডেক্স এগ্রোর কারখানা-অবকাঠামো রয়েছে। কোম্পানিটির আইপিও প্রসপেক্টাসে ওই জমিসহ  কোম্পানির মোট ১৩ একর ৮১ শতক জমি কেনা ও উন্নয়ন খাতে প্রায় ২০ কোটি ৮১ লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বনের জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করছেন ইনডেক্স এগ্রোর দায়িত্বশীলরা। আলাপকালে কোম্পানিটির চেয়ারম্যান মাযহারুল কাদের শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ভালুকায় বনের কোনো জমি দখল করা হয়নি। জমিগুলো আগের মালিকদের কাছ থেকে কেনা। নিয়ম-কানুন মেনে ওই জমিতে কারখানা-অবকাঠামো করা হয়েছে। এ নিয়ে বন বিভাগের সঙ্গে কোনো মামলা-মোকদ্দমাও নেই। বন বিভাগ কী বলছে না বলছে, সেটা বিবেচ্য নয়। বনের সঙ্গে মামলা ছিল, নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। আমরা রায় পেয়েছি।’

যদিও এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে বন বিভাগ, যা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বন বিভাগ আপিল করেছে কি না, এমন কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। দেখুন, এটা বন বিভাগের বিষয়। তাছাড়া এটা নিয়ে আপনারা কেন মাথা ঘামাচ্ছেন? বনের জমি দখলের অভিযোগ সত্য নয়।’

নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যমতে, দখলের বিষয়টি আড়াল করতে এরই মধ্যে বেশকিছু কাগজপত্র তৈরি করেছে ইনডেক্স এগ্রো। মিথ্যা তথ্য দিয়ে তৈরি করা ওই কাগজপত্র দিয়ে ময়মনসিংহের বনের জমি বন্দোবস্তকারী কর্মকর্তা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) কাছ থেকে কোম্পানির অনুকূলে অবমুক্ত করিয়েছে। জমি অবমুক্তির সুযোগ নিয়ে স্থানীয় ভূমি অফিসের মাধ্যমে এরই মধ্যে প্রায় তিন একর ২৪ শতক জমি কোম্পানির নামে রেকর্ড করা হয়েছে, যার কল্যাণে ওই জমির খাজনাও দিচ্ছে ইনডেক্স এগ্রো। তবে ইনডেক্স এগ্রোর দাখিল করা কাগজপত্র, অবমুক্তি ও খাজনা-খারিজের আইনি ভিত্তি নেই বলে দাবি করছেন বন বিভাগের দায়িত্বশীলরা। যদিও কয়েক দফায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েও ওই জমি উদ্ধার করতে পারেনি সংস্থাটি।

এ বিষয়ে আলাপকালে বন বিভাগের ভালুকা রেঞ্জ কর্মকর্তা শেখ আবদুল কাদির শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমাদের কাছে থাকা তথ্যানুযায়ী ভালুকার কাঁঠালী মৌজার ১০৭ নম্বর দাগে বন বিভাগের ৪৫ একর ৫০ শতক জমি রয়েছে। সব জমির মালিক বন বিভাগ। ওই জমিতে ইনডেক্স এগ্রোর কারখানা রয়েছে। ওই জমির মালিকানা নিয়ে আপিল মোকদ্দমা চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে বিভাগীয় অফিসে তথ্য পাবেন।’

বন বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, ১৯৫১ সালের এ-সংক্রান্ত গেজেট নোটিফিকেশন অনুযায়ী ওই দাগের সব জমির মালিক বন বিভাগ। ওই গেজেট বাতিল বা সংশোধন করা না হলে কোনো জমি অবমুক্তির সুযোগ নেই। তারপরও মিথ্যা তথ্য দিয়ে তৈরি করা দলিলপত্র দাখিল করে বনের জমির মালিকানা দাবি করছে ইনডেক্স এগ্রো। তাদের কাগজপত্র, অবমুক্তি ও খাজনা-খারিজের আইনি ভিত্তি নেই। ওই জমি উদ্ধারে বন বিভাগ আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

বন বিভাগের ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. সাইদুর রশিদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘অনেক বছর আগে ওই জমি জবরদখল করা হয়েছে। আমি যতটুকু জানি, এ নিয়ে মামলা চলছে। এর আগে তারা রায় পেয়েছে। পরে আমরা আপিল করেছি। বর্তমানে রিভিশন মামলা শুনানির অপেক্ষায় আছে। জমি উদ্ধারে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০০৪ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া ইনডেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইনডেক্স এগ্রো বুক বিল্ডিং পদ্ধতির মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ৪০ কোটি টাকা তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে রোড শোও সম্পন্ন করেছে কোম্পানিটি। আইপিও প্রসপেক্টাসে, আইপিও খাতে প্রায় দুই কোটি টাকা, রাজেন্দ্রপুরের ব্রিডার ফার্মের সম্প্রসারণে ১০ কোটি পাঁচ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, ভালুকার ফিস প্লান্ট ও ফিস মিল সম্প্রসারণে ১২ কোটি ৯৪ লাখ ১৬ হাজার টাকা, বগুড়ার ব্রিডার ফার্ম সম্প্রসারণে নয় কোটি ৯৫ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং হ্যাচারি সম্প্রসারণে পাঁচ কোটি চার লাখ ৭২ হাজার টাকা ব্যয় করার কথা বলা হয়েছে।