প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

বন্ড ছেড়ে অর্থ সংগ্রহে ঝুঁকছে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলো

শেখ আবু তালেব: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর বন্ড ছেড়ে অর্থ সংগ্রহের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৭ সালে ১২টি ব্যাংক বন্ড ছেড়ে অর্থ সংগ্রহ করলেও ২০১৮ সালে এ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৮টিতে। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংক দুবছরই বন্ড ছেড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাইট শেয়ার ছেড়ে অর্থ সংগ্রহ করলে ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় কিছুটা কমত। কিন্তু ক্রেতা না থাকায় মূলধন বৃদ্ধিতে ব্যাংকগুলো বন্ডের দিকেই ঝুঁকছে।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সূত্র অনুযায়ী, ২০১৮ সালে পুঁজিবাজার থেকে ১৮টি ব্যাংক বন্ড ছেড়ে ৯ হাজার ৭০০ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করে। অথচ ২০১৭ সালে পাঁচ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল ১২টি ব্যাংক। এক বছরের ব্যবধানে অর্থ সংগ্রহের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে চার হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এ সময়ে ব্যাংকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ছয়টি।
জানা গেছে, দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বর্তমানে তালিকাভুক্ত ব্যাংকের সংখ্যা হচ্ছে ৩০টি। এর মধ্যে ছয়টি ২০১৭ ও ২০১৮ সালেও বন্ড ছেড়ে অর্থ সংগ্রহ করেছে। চলতি বছরও এ ধারা অব্যাহত আছে।
এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ব্যাংকের মূলধন বৃদ্ধি করতে ব্যাংকগুলো বন্ড ছাড়ছে। টায়ার-২’র শর্ত পরিপালনে ব্যাংকগুলোকে মূলধন বৃদ্ধি করতে হবে। যদি রাইট শেয়ার ছেড়ে অর্থ সংগ্রহ করতে পারত, তাহলে উত্তম হতো। কিন্তু অনেক ব্যাংকের রাইট শেয়ারের ক্রেতা পাওয়া যাবে না। বোনাস শেয়ার ছাড়লে ব্যাংকের ইপিএস (শেয়ারপ্রতি আয়) কমে যাবে। এটিও ধরে রাখতে চায় ব্যাংক। এজন্য ব্যাংকগুলো অর্থ খরচ হলেও বন্ডের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করছে।’
জানা গেছে, ২০১৮ সালে পুঁজিবাজার থেকে দ্য সিটি ব্যাংক ৭০০ কোটি, রূপালী ব্যাংক ৬০০ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংক ৫০০ কোটি, আল-আরাফাহ্ ৫০০ কোটি, প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড ৭০০ কোটি, সাউথইস্ট ৫০০ কোটি, ঢাকা ব্যাংক ৫০০ কোটি, এনসিসি ব্যাংক ৪০০ কোটি, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ৫০০ কোটি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ৫০০ কোটি, ওয়ান ব্যাংক ৪০০ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ৩০০ কোটি, যমুনা ব্যাংক ৫০০ কোটি, ট্রাস্ট ব্যাংক ৫০০ কোটি টাকার বন্ড ছাড়ে।
এছাড়া ২০১৭ ও ২০১৮ সালে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ৪০০ ও ৬০০ কোটি, ডাচ্-বাংলা দুবারই ৫০০ কোটি, দ্য সিটি ব্যাংক ৫০০ ও ৭০০ কোটি, ইসলামী ব্যাংক ৫০০ ও ৭০০ কোটি এবং ইউসিবি ৭০০ ও ৮০০ কোটি টাকার বন্ড ছেড়ে মূলধন সংগ্রহ করে। এছাড়া ব্যাংক এশিয়া গত বছর ১০০ কোটি টাকার ইউনিট ফান্ড গঠন করে মূলধন বৃদ্ধিতে। ব্যাংকটি এরই মধ্যে ৫০০ কোটি টাকার বন্ড ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিষয়টি এখনও অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন বিএসইসিতে। এর বাইরে ইসলামী ব্যাংক দু’দফায় ২১৫ কোটি টাকার শরিয়াহ্ভিত্তিক মিউচুয়াল ফান্ড গঠন করেছে। আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ৫০ কোটি টাকার শরিয়াহ্ ফান্ড গঠন করেছে।
অপরদিকে এবি ব্যাংক বছরখানেক আগে আবেদন করলেও চলতি বছর ৫০০ কোটি টাকার বন্ড ছাড়ার অনুমোদন পায়। জানা গেছে, ব্যাংক খাত আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ব্যাসেল-৩ নীতিমালা বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি রোডম্যাপও ঘোষণা করেছে।
ব্যাসেল-৩-এর আওতায় ব্যাংকগুলোকে মূলধন বৃদ্ধি করতে হবে। এর মধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণের হারও বৃদ্ধি করতে হবে। বর্তমানে বেসরকারি খাতের কয়েকটি ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো কাক্সিক্ষত হারে তা সংরক্ষণ করতে পারছে না। ব্যাংকগুলো টায়ার-২ শর্ত পরিপালনে মূলধন সংগ্রহ করতে বন্ড ছাড়ছে।
বোনাস ও রাইট শেয়ার ইস্যু করে ব্যাংকগুলো মূলধন সংগ্রহ করতে পারে। এতে তহবিল ব্যবস্থাপনা খরচ তেমন হয় না বললেই চলে। কিন্তু বন্ড ছাড়তে প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হয়ে যায়। এজন্য সম্পদ ব্যবস্থাপনা এজেন্টও নিয়োগ দিতে হয়। এতে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
উল্লেখ্য, ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে গেলেও ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকগুলোর ব্যবসা কমে যাচ্ছে। প্রভিশন রাখতে গিয়ে আটকে যাচ্ছে মূলধন। আশানুরূপ নতুন আমানত না আসায় মূলধন সংগ্রহে ব্যাংকগুলো বন্ডের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে।

সর্বশেষ..