প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করেই চলেছে ‘সিটি সুগার’

রহমত রহমান: দেশের ভোগ্যপণ্য ব্যবসায় অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপ। এ গ্রুপের ২৩টি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড চিনিশিল্পে দেশের সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান। চিনি পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ পুরোনো। বন্ড সুবিধায় কাঁচামাল (র-সুগার) আমদানি করলেও অপব্যবহার যেন থেমে নেই।
সর্বশেষ বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের তিনটি মামলায় প্রায় ১৮২ কোটি টাকার শুল্ককর ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, অপব্যবহার প্রমাণিত হওয়ায় সম্প্রতি তিনটি প্রতিষ্ঠানকে সাড়ে চার কোটি টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একই সঙ্গে ফাঁকি দেওয়া শুল্ককর ১৫ দিনের মধ্যে জমা দেওয়ার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে সিটি গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ হাসান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ফাঁকির বিষয় আমার জানা নেই। জানতে হবে। তবে এটি ফাঁকি তো নয়।’ বিষয়টি নিয়ে তিনি গ্রুপের পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স) বিশ্বজিৎ সাহার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন মোহাম্মদ হাসান। বিশ্বজিৎ সাহা শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ফাঁকির অভিযোগের বিষয়ে আমরা জবাব দিয়েছি। সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে শুল্ককর দাবি করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা ট্রাইব্যুনাল বা উচ্চ আদালতে যাব।’
তথ্যমতে, তিনটি মামলার মধ্যে একটিতে শুল্ককর ফাঁকি প্রায় ১৩৭ কোটি টাকা। এ মামলায় এনবিআর অর্থদণ্ড আরোপ করে তিন কোটি টাকা। অপর দুটি মামলায় ফাঁকি যথাক্রমে প্রায় ৩২ কোটি ও ৯ কোটি টাকা। এ দুই মামলায় অর্থদণ্ড যথাক্রমে এক কোটি টাকা ও ৫০ লাখ টাকা।
সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটি পরিশোধনের (রিফাইনারি) মাধ্যমে তীর ব্র্যান্ডের চিনি হিসেবে বাজারজাত করে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বন্ড রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ ও শুল্ককর পরিশোধ ছাড়াই কাঁচামাল অপসারণের অভিযোগ ওঠে। বন্ডের নিয়ম হলো শুল্কমুক্ত সুবিধার কাঁচামাল বন্দর থেকে বন্ডেড ওয়্যারহাউজে এনে ছয় মাস রাখা যায়। এরপর শুল্ককর পরিশোধ করে ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরেই শুল্ককর পরিশোধ না করে অবৈধভাবে কাঁচামাল অপসারণ করে ব্যবহার করে আসছে। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বহুবার অভিযোগ পায় এনবিআর। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট প্রিভেন্টিভ টিম পৃথকভাবে গত বছরের ২০ মে, ১৬ জুলাই ও ২০ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে। পরিদর্শন শেষে পৃথক প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
২০ মে পরিদর্শনের পর এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয় ৩১ অক্টোবর। এতে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের দুটি বন্ডেড ওয়্যারহাউজে এক লাখ ২০ হাজার ৮৬০ মেট্রিক টন অপরিশোধিত চিনি পাওয়া যায়। কিন্তু বন্ড রেজিস্টারে এ চিনি মজুদের উল্লেখ নেই। অবৈধভাবে অপসারণের জন্য এসব চিনি মজুদ করা হয়েছে। পরে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ দিয়ে আমদানি করা ৩৯ হাজার মেট্রিক টন চিনির শুল্ককর পরিশোধ করে খালাসপূর্বক মজুদ করেছে। বাকি ৮১ হাজার ৮৬০ মেট্রিক টন চিনি প্রতিষ্ঠানটি শুল্ককর ফাঁকি দিয়ে অপসারণের জন্য মজুদ করে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এ চিনির শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ৩১১ কোটি টাকা, যাতে শুল্ককর প্রায় ১৩৭ কোটি টাকা। এ শুল্ককর পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটিকে ১১ ডিসেম্বর কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি লিখিত জবাব দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় দফা ১৬ জুলাই পরিদর্শনের পর ৯ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দেওয়া হয়, যাতে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের দুটি বন্ডেড ওয়্যারহাউজে ৪১ হাজার ৯৫৯ মেট্রিক টন অপরিশোধিত চিনি পাওয়া যায়। কিন্তু বন্ড রেজিস্টারে মজুদ ৩৭ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন উল্লেখ থাকলেও বাকি চার হাজার ৪৫৯ মেট্রিক টন চিনি মজুদের উল্লেখ নেই। এছাড়া বন্ড কমিশনারেটের সিআইএস সেলের তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানটি কাস্টম হাউজ থেকে খালাস নিলেও ১৮ হাজার ৯৮০ মেট্রিক টন বন্ড রেজিস্টারে উল্লেখ করেনি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি মোট ২৩ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন চিনি অবৈধভাবে অপসারণের জন্য মজুদ করেছে। এ চিনির শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় সাড়ে ৬৯ কোটি টাকা, যাতে সুদসহ শুল্ককর প্রায় ৩২ কোটি টাকা। এ শুল্ককর পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটিকে ২৬ সেপ্টেম্বর কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ১ নভেম্বর লিখিত জবাব দেওয়া হয়।
তৃতীয় দফা ২০ নভেম্বর পরিদর্শনের পর ২০ ডিসেম্বর মামলার প্রতিবেদন দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের দুটি বন্ডেড ওয়্যারহাউজে ৩৪ হাজার ১৫৫ মেট্রিক টন অপরিশোধিত চিনি পাওয়া যায়, কিন্তু বন্ড রেজিস্টারে মজুদ উল্লেখ করা হয়নি। পরে ইনটু বন্ড রেজিস্টার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২৮ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন উল্লেখ করা হয়েছে, বাকি পাঁচ হাজার ৬৫৫ মেট্রিক টন উল্লেখ করা হয়নি। এ চিনির শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ১৬ কোটি টাকা ৭৮ লাখ টাকা, যাতে শুল্ককর প্রায় ৯ কোটি ৯ লাখ টাকা। এ শুল্ককর পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটিকে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি লিখিত জবাব দেওয়া হয়।
সিটি সুগারের পক্ষ থেকে তিনটি মামলায় প্রায় একই জবাব দেওয়া হয়, যাতে বলা হয়, কাস্টম হাউজের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড এ বিল অব এন্ট্রি (ইনটু বন্ড), ওয়্যার হাউজের বন্ড রেজিস্টার ও শুল্কায়িত র-সুগারের (এক্স বন্ড) হিসাব মেলানো হলে গরমিল থাকবে না। বন্ড রেজিস্টারে উল্লেখ না করা মানে শুল্ককর ফাঁকির উদ্দেশ্য নয়। গুদাম সংকটের কারণে ওয়্যার হাউজে মজুদ রাখা হয়েছে এবং অপসারণের জন্য নয় বলে দাবি করা হয়।
বন্ড কমিশনারেট সূত্র জানায়, গত ৪ ফেব্রুয়ারি বন্ড কমিশনারেটে সিটি সুগারের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে শুনানি হয়। এতে তিনটি মামলায় প্রতিষ্ঠানের দেওয়া যুক্তি আইনসম্মত না হওয়ায় গ্রহণ করা হয়নি। তিনটি মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার এসএম হুমায়ুন কবীর রায় প্রদান করেন। প্রতিষ্ঠানটিকে তিনটি মামলায় অবৈধভাবে অপসারণ করায় পৃথকভাবে সাড়ে চার কোটি টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এ অর্থদণ্ড শুল্ককরের অতিরিক্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করতে হবে। অর্থদণ্ডসহ তিনটি মামলায় সিটি সুগারকে প্রায় ১৮২ কোটি টাকা পরিশোধে ১৫ দিনের সময় দিয়ে আদেশ জারি করা হয়। বন্ড লাইসেন্স পাওয়ার প্রথম থেকেই অনিয়ম করে প্রতিষ্ঠানটি বড় হচ্ছে বলে এনবিআরের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন।
এর আগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর প্রায় দুই লাখ দুই হাজার টন অপরিশোধিত চিনিতে প্রায় ২৮০ কোটি শুল্ককর পরিশোধ ছাড়াই অপসারণ করার প্রমাণ পায় বন্ড কমিশনারেট।

সর্বশেষ..



/* ]]> */