বন্ধ হোক ব্যাংক পরিচালকদের অপেশাদারি কার্যক্রম

গত কয়েক বছর ধরেই বড় ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তাদের ওপর পরিচালনা পর্ষদের চাপ সৃষ্টির অভিযোগ চাউর হচ্ছে। বিষয়টি এবার উঠে এলো ব্যাংকার প্রশিক্ষণের প্রধান প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) গবেষণায়। এ ধরনের চাপ পরিচালনা পর্ষদের অপেশাদার আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ, যা এ খাতে সুশাসনের পরিপন্থী।
গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নিয়মের ব্যত্যয় হওয়া সত্ত্বেও অপেক্ষাকৃত মন্দ গ্রাহককে বড় ঋণ দেওয়ার জন্য পর্ষদ চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি ঋণ বিতরণের লক্ষ্য পূরণে এক শতাংশ বোনাসের ঘোষণা দিয়ে থাকে, যা একধরনের প্রলোভন। এ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক কর্মকর্তারাও জড়িয়ে পড়ছেন অনিয়মে। এভাবে ঋণ বিতরণ ও সুশাসন পরিপালনে যে ব্যত্যয় ঘটে, তা উদ্ঘাটনে ব্যাংকের নিজস্ব অডিট বিভাগও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। বিআইবিএমের ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গতকাল শেয়ার বিজে ‘বড় ঋণ দিতে পর্ষদ চাপ দেয় কর্মকর্তাদের’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
এর আগে ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে গ্রাহকের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার কথাও উঠেছে ব্যাংক পরিচালকদের বিরুদ্ধে। রয়েছে টাকার বিনিময়ে কর্মকর্তা নিয়োগের অভিযোগ। কারও বিরুদ্ধে আবার সুপারিশে দেওয়া ঋণ পরিশোধ না হলেও অভিনব কায়দায় পরিশোধ দেখানোর অভিযোগ। গুরুতর অনিয়মে নৈতিক স্খলন ঘটছে পর্ষদ সদস্যদের। এ ধরনের অনিয়ম বের করতে বহিঃনিরীক্ষক দিয়ে বিশেষ নিরীক্ষার বিকল্প নেই।
এটি ঠিক যে, ব্যাংক কর্মকর্তাদেরও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। কিন্তু তাদের ম্যানেজ করেই, ক্ষেত্রবিশেষে চাকরিচ্যুতির ভয় দেখিয়ে স্বার্থ হাসিল করেন পর্ষদ সদস্যরা। নিরীক্ষকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে অনেক অনিয়ম ধরা পড়বে। এতে বিপদে পড়তে পারেন পর্ষদ সদস্যদের কেউ কেউ। বড় ঋণ জোগাতে চাপ দেন পর্ষদ সদস্যরা, নিজেরাও নামে-বেনামে ঋণ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক (অডিট বিভাগ) আইসিসিডির জন্য আলাদা গাইডলাইন তৈরি করে দিলেও তা তেমন কাজে আসছে না। এর প্রধান কারণ আইন পরিপালনে অনীহা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যবেক্ষণের অভাব।
নিরীক্ষা বিভাগের কর্মীরা দক্ষ ও প্রশিক্ষিত হলে ব্যাংকগুলো অনিয়ম থেকে রক্ষা পাবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, পরিচালনা পর্ষদের দ্বারা সংঘটিত অনিয়ম কীভাবে ঠেকাবেন নিরীক্ষা বিভাগের কর্মীরা? ব্যাংক মালিকদের বিভিন্ন দাবি মেনে নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রণীত আলাদা গাইডলাইনে নিরীক্ষা বিভাগ কর্মীদের সুরক্ষা বিষয়ে কিছু আছে কি না, তা বলেননি ডেপুটি গভর্নর। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সততা ও নৈতিকতার সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলেছেন তিনি। বেশিরভাগ বেসরকারি ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ সততা ও নৈতিকতার উদাহরণ কিন্তু দেখাতে পারেনি।
কেবল আইসিসিডি নয়, জনবল সংকট হলে সব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ওপরই চাপ বাড়ে। কিন্তু ব্যাংকগুলোয় বড় চাপ থাকে মালিকদের পক্ষ থেকেই। এটি দুঃখজনক। ঋণ কেলেঙ্কোরিসহ অনিয়মের দায়ে ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু পরিচালনা পর্ষদের চাপে দেওয়া ঋণের দায় তো কেবল ব্যাংকারদের নয়। এর দায় নিতে হবে পরিচালনা পর্ষদকেও।