বন্ধ হোক মেধার রাজ্যে মাদকের ছোবল

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: প্রায় সব ছাত্রছাত্রীই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখে। সেটা হোক মেডিক্যাল, বুয়েট বা অন্য যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। মা-বাবারও স্বপ্ন থাকে আদরের সন্তানকে ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন। বাস্তবতার নিরিখে এখানে কেউ সফল হন, আবার কারও স্বপ্ন অঙ্কুুরেই বিনষ্ট হয়। যারা সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সুযোগ পান, তারা কিছুটা নিশ্চিত হন। ভাবেন সন্তানের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে। এখান থেকে বের হলে সে প্রতিষ্ঠিত হবে, অর্জন করবে সুনাম, সামাজের বোঝা হবে না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর অনেকেই বিপথে চলে যায়। কেউ অসুস্থ রাজনীতি, কেউবা মাদক বিষে নীল হয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্নে জল ঢেলে দেয়। শেষ হয়ে যায় বাবা-মায়ের স্বপ্ন, প্রিয় শিক্ষক, ভাইবোন বা স্বজনদের আশা-ভরসা। অপমৃত্যু ঘটে একটি সম্ভাবনার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। এটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। তাই প্রায় সবারই আগ্রহ থাকে এখানে পড়াশোনা করার। এটি শুধু একটি বিদ্যাপীঠই নয়, হাজারো ইতিহাসেরও সাক্ষী। ভাষা রক্ষা, দেশ রক্ষা, থেকে শুরু করে এখান থেকে সূত্রপাত হয়েছে শত আন্দোলনের, গণতান্ত্রিক কিংবা স্বৈরাচারী আন্দোলনের; যেসব ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে রয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয় একটি আবেগের নাম। তাই এখানে কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত তা দেশবাসীর কাছে পৌঁছে যায়। কোনো ছাত্রের অকাল মৃত্যু হলে শোক ছুঁয়ে যায় সবাইকে। এই তো কিছুদিন হলো ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের পুকুরে ডুবে এক ছাত্রের মৃত্যু সবাইকে কাঁদিয়ে দিল। খবরটি পড়ে মনে হয়েছে, আহা রে! ছেলেটা যদি কোনোভাবে বেঁচে যেত, কেউ যদি এগিয়ে আসত তাকে বাঁচাতে। একটি ছেলের জীবন প্রদীপ অকালে এভাবে নিভে গেল!
সম্প্রতি একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে খবর এসেছে ‘মেধাবীদের চারণভূমি ঢাবির কার্জন হলের ম্যানহোল ভর্তি ফেনসিডিলের খালি বোতল’। খবরের সঙ্গে ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে। ছবি দেখে অবাক হয়েছি। কষ্ট হয়েছে। এ কী অবস্থা আমাদের দেশসেরা প্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীদের!
খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেখানে-সেখানেই পাওয়া যাচ্ছে ফেনসিডিলের বোতল, গাঁজা ও ইনজেকশন। ক্যাম্পাসে তো বটেই, প্রকাশ্যে রাস্তায় দাঁড়িয়েও মাদক সেবন করতে দেখা যায় রিকশাচালকসহ পথশিশুদের। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের কক্ষেও চলে গাঁজা ও ইয়াবা সেবন। নানা ধরনের মাদকদ্রব্য সেবন আর বিক্রির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ঢাবির ক্যাম্পাস ও এর আশেপাশের এলাকা।
বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রাতে সর্বসাধারণের প্রবেশ বন্ধ হলেও থেমে নেই মাদকের কারবার। আগে সন্ধ্যার পর উদ্যানের ভেতরে মাদকের আসর বসলেও এখন ফুটপাতেই বসছে আসর, এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। এর সত্যতাও মিলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাদের কাছে মাঝেমধ্যেই এই চিরচেনা স্থানটি বড্ড অচেনা লাগে, ভয় হয়।
সন্ধ্যা হলেই চারুকলা অনুষদ ভবন থেকে টিএসসির মোড় হয়ে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত উদ্যান ঘেঁষা ফুটপাতে মাদকাসক্তদের আনাগোনা শুরু হয়। রাত বাড়তে থাকলে জমতে থাকে আসর। তবে এ নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা নেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশের।
সকাল হলেই টিএসসির সবুজ চত্বর ও এর বাইরে মদের বোতল পড়ে থাকতে দেখা যায়। কয়েকটি সংগঠনের কক্ষেও মাদক সেবন চলে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ’র গ্যারেজ, আইন অনুষদের সামনে, ক্যাম্পাস শ্যাডোর আশেপাশে ফেনসিডিলের বোতল অহরহ দেখা যায়। লেকচার থিয়েটার ভবনের আশেপাশে ও দোতলা-তিনতলায়ও এসব দেখা যায়। চারুকলা অনুষদ ভবনের ভেতরে গাঁজা সেবন যেন কোনো বিষয়ই নয়!
লেকচার থিয়েটার, কলাভবনসহ বিভিন্ন অনুষদের বাথরুমের নষ্ট ফ্লাশবক্সের ভেতরেও ফেনসিডিলের বোতল, প্যাথেডিন ইনজেকশন ও আপত্তিকর সামগ্রীর ছড়াছড়ি। সন্ধ্যায় পর শ্যাডো এলাকায় আলো না থাকায় এখানকার পরিবেশই পাল্টে যায়। এমন উš§াদনায় মেতে ওঠে অনেকেই, যা কোনো বিবেচনায় শ্লীলতার পর্যায়ে পড়ে না। তবে এদের অধিকাংশই বহিরাগত। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এহেন নৈরাজ্যের দায় এড়াতে পারে না শিক্ষার্থীরা। অশ্লীলতা, বেহায়াপনা কিংবা মাদক থেকে পরিবেশ রক্ষায় তাদের কোনো কর্মসূচি, আন্দোলন দেখিনি কোনোদিন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিমতÑক্যাম্পাসকে মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত রাখা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর ফুটপাতে প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা ও সেবনের বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মাধ্যমে শাহবাগ থানা পুলিশকে বিষয়টি একাধিকবার জানানো হলেও কোনো লাভ হয়নি। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাব রয়েছে।
ঢাবি ভবনের ভেতরে ধূমপান নিষেধ থাকলেও তা মানছেন না শিক্ষার্থী বা কর্মচারীরা। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে শিক্ষকরাও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক গোলাম রাব্বানীর মতে, ‘আমরা মাদকের আসর বন্ধ করতে ক্যাম্পাসে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে মাদকাসক্তদের আটক করি। কিন্তু সুযোগ পেলে তারা আবারও অপকর্মটি করে। কারণ মাদকের সহজলভ্যতা। তাই আগে মাদক সরবরাহ বন্ধ করতে হবে।’
খবরে আরও উল্লেখ রয়েছেÑঢাবির বটতলা, আমতলা, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, বিজ্ঞান লাইব্রেরি এলাকা ও কার্জন হল এলাকায় সন্ধ্যা হলে আপত্তিকর দৃশ্য দেখা যায়। এসব এলাকায় সন্ধ্যার পর আলোর কোনো ব্যবস্থা নেই। আলো না থাকায় অশ্লীলতা চলছে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা। তবে এসব জায়গায় বহিরাগতদের আনাগোনা বেশি।
প্রিয় অনুজ, তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই সব অপকর্ম ঘটাচ্ছে বহিরাগতরা। তাহলে আপনাদের নিয়ে ভাবার কারণ নেই, ভয়েরও কারণ নেই। আপনারা আপনাদের মতো রয়েছেন। বাবা-মা যে জন্য আপনাকে পবিত্র শিক্ষাঙ্গনে পাঠিয়েছেন, সে কাজ যথানিয়মে করছেন আপনারা। কিন্তু যদি অন্যথা হয়, তাহলে অবশ্যই দুচিন্তার কারণ রয়েছে। এর কারণ আপনাদের হাতে রয়েছে আগামী দিনের বাংলাদেশের চাবি। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সমগ্র দেশের সব বিদ্যাপীটের প্রত্যেক শিক্ষার্থী দেশের মূল্যবান সম্পদ। এদের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে আগামী দিনের নেতা, যারা দেশ শাসনের দায়িত্ব পাবেন। সফল হাতে দেশ চালাবেন। এদের মধ্যে রয়েছে আগামী দিনের মাশরাফি, সাবিক, তামিম, মোস্তাফিজ, সালমারা। এরা পথ ভুলে বিপথে গেলে তো দেশ মুক্তি পাবে না। জাতি মুক্তি পাবে না। এতে আমরা অনেক পিছিয়ে যাব।
একসময় যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে আসতেন, তাদের উদ্দেশ্য থাকত এখান থেকে মানুষের মতো মানুষ হয়ে বেরিয়ে যাওয়া। তারা গুরুজনদের ভক্তি করতেন, বই পড়তেন। খেলাধুলায় ভালো করতেন, থাকতেন ভালো বিনোদনের সঙ্গে। ভাবতেন পরিবার ও নিজের কথা। এদের মধ্য থেকে দু’একজন যে ভুল পথে যাননি তা নয়। ধানে চিটা থাকবেÑএটা খুবই স্বাভাবিক।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এখন বিপথগামী হওয়ার শঙ্কা অনেক বেশি। আজকাল শ্রদ্ধাভক্তি বলতে গেলে উঠে গেছে। হারাতে বসেছে বই পড়ার অভ্যাস। কমে গেছে খেলাধুলা। এখন সবাই প্রযুক্তিনির্ভর। প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমরা অনেক এগিয়ে গেছি। এখন কোনো কিছু চাইলে আমরা সহজে তা পেয়ে যাই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি এটা অবশ্যই কল্যাণকর। তবে এর কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। সবকিছু তো সহজলভ্য হওয়া ভালো নয়। যেমন সহজলভ্য হয়ে গেছে সব ধরনের মাদক। ভাবতে অবাক লাগে, বাংলাদেশের হাটে-মাঠে-বাটে সর্বস্তরে পৌঁছে গেছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন। যে কেউ চাইলে সহজেই এসব পেয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হাত বাড়ালেই ইয়াবা। কলেজে না চাইতে পাওয়া যায় গাঁজা, হেরোইন। স্কুলপড়ুয়া ছেলের পকেটে দেখা মিলবে ইয়াবার! গ্রামের চা দোকানে বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের মাদক। আর এই নেশায় মাতাল হয়ে অকালে ঝরে যাচ্ছে হাজারো প্রাণ।
প্রিয় অনুজ, যে যতই বলুক, আপনারা সাবেকদের চেয়ে অনেক মেধাবী। আপনাদের জানার পরিধি অনেক বড়। বিশ্ব আপনাদের হাতের মুঠোয়। আপনারা চাইলে নিমিষেই গুগল ঘেঁটে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে যে কোনো তথ্য সহজেই বের করতে পারেন। আপনারা মেধাবী হয়ে ওঠার একটি অন্যতম কারণ ভালোমন্দ বোঝার জ্ঞান আপনাদের আছে। কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দÑতা সহজেই বের করতে পারেন। বিন্তু দুঃখ একটাই, এত কিছুর পরও আপনারা কেন মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন। অকালে শেষ করে দেন নিজেকে। ভেঙে দেন স্বজনদের স্বপ্ন। কেন ভুল পথে যান!
নিজেকে নিয়ে একটু ভাবলেই আপনারা ভুল পথ থেকে ফিরে আসতে পারেন। যদি নিজের কথা বা পরিবারের কথা ভাবেন, তাহলে নিশ্চয়ই আপনি বিপথগামী হবেন না। ভুলে গেলে চলবে না পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর ও দামি নিজের জীবন। সেটাকে সুন্দর করে সাজানোর দায়িত্ব যার যার।
এখন যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, তাদের বয়স ১৮ থেকে ২৪-এর মধ্যে। এ বয়সকে বলা হয় আবেগের। এ বয়সে সবার চোখে পরা থাকে রঙিন চশমা। দু’চোখ ভরে যা দেখা যায়, তা-ই ভালো লাগে। অনেক সময় ভালো-মন্দ বিচারের ক্ষমতাও হারিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় আঁখি মেলে যারে ভালো লাগে, তাহারেই ভালো বলে জানি/সব প্রেম প্রেম নয় ছিল না তো সংশয়/যে আমারে কাছে টানে তারে কাছে টানি। চোখ থেকে রঙিন চশমা খসে গেলেই এ বয়সে করা ভুলগুলো অনুভব করা যায়। কিন্তু তখন হয়তো আর সময় থাকে না। তাই এখনই সময় ভুলগুলো সংশোধনের। একমাত্র ছাত্ররাই পারে সমাজ তথা ক্যাম্পাসকে পুরোপুরি মাদকমুক্ত করতে। মেধার রাজ্য থেকে মাদক-ভূত তাড়াতে পারে তারাই। তারা যদি ভুল পথে না যায়, তাহলে কার সাধ্য তাকে ওই পথে পরিচালিত করে।
প্রিয় অনুজ, আপনাদের কাছে অনুরোধ ভুল পথ থেকে ফিরে আসুন। আপনারা মানুষ হয়ে ফিরবেন বাবা-মা সে অপেক্ষায় আছেন। প্রিয় শিক্ষক আপনাদের নিয়ে গর্ব করার জন্য তৈরি হয়ে রয়েছেন। স্বজনরাও রয়েছেন সে প্রত্যাশায়। দেশ অপেক্ষা করছে একজন সোনার ছেলের। আপনাদের মধ্যেই রয়েছে সেই মানুষ। যুগ যুগ ধরে যার অপেক্ষায় রয়েছে জাতি। জাতি আপনাদের খুব ভালোবাসে। আশা করি আপনারা তাদের আশায় জল ঢেলে দেবেন না।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]