বন্যা মোকাবিলায় চাই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি

গতকালের শেয়ার বিজে ‘বাঁধ সংস্কার না করায় ঝুঁকিতে নওগাঁর লক্ষাধিক মানুষ’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় চলতি বর্ষা মৌসুমে জেলার আত্রাই নদীর বাঁধের আশেপাশে লক্ষাধিক মানুষ বন্যায় বড় ক্ষতির শঙ্কায় রয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা এলেই গণমাধ্যমে এ ধরনের খবর প্রকাশ হয়। বাঁধ যথাসময়ে সংস্কার না করা ও বন্যার ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে আগে থেকে প্রস্তুতি না নেওয়ায় প্রতিবছরই বড় রকম ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে দেশগুলো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, বাংলাদেশ তার অন্যতম। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও অতিবৃষ্টি, বন্যা, আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো আঘাত হানছে। দুর্যোগগুলোর মধ্যে অস্বাভাবিকতাও পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে আকস্মিক বন্যায় অনেক নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। অতিবৃষ্টিতেও অনেক এলাকা নিয়মিত প্লাবিত হচ্ছে; খরাও দেখা দিচ্ছে। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের মধ্যে এক ধরনের প্রস্তুতি থাকলেও নতুন প্লাবিত এলাকার মানুষকে এজন্য বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। সাম্প্রতিককালে দিনাজপুর অঞ্চলে এমনটি ঘটতে দেখেছি আমরা।
গত কয়েক বছরে দেশে নদীভাঙন ও ঘূর্ণিঝড় অনেক বেড়েছে বলে মনে হয়। আবার কোনো বছর অনাবৃষ্টিতে খরা দেখা দেওয়ায় নষ্ট হচ্ছে ফসল; ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ মানুষ। আবহাওয়ার এ বিরূপ পরিস্থিতি কোনো দেশ বা অঞ্চলের জন্য ভালো খবর নয়। এ অবস্থায় গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নও কঠিন হয়ে পড়ে। জীবনযাত্রার অগ্রগতি ধরে রাখাও সে ক্ষেত্রে হয়ে পড়ে কঠিন।
প্রসঙ্গত বলতে হয়, আত্রাই নদীর বাঁধটি বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ ও ইঁদুরের গর্তে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। পানির চাপে কিছু স্থানের মাটি ধসে বিলীন হয়ে গেছে নদীতে। এটির মতো দেশের অনেক বাঁধের পরিস্থিতিই যে ভালো নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গত বছর হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যায় বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, এটা সবারই মনে আছে। এর চাপ পড়েছিল চালের বাজারে। চলতি বছর তেমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়নি অবশ্য। তবে এরই মধ্যে সিলেট, কক্সবাজার ছাড়াও উত্তরাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। কয়েকদিন ধরে অনেক নদী-তীরবর্তী অঞ্চলে শুরু হয়েছে ভাঙন। মধ্যাঞ্চলের কিছু এলাকাও বন্যায় প্লাবিত বলে খবর মিলছে। কক্সবাজার অঞ্চলে আগত রোহিঙ্গাদের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলগুলো ব্যস্ত সময় পার করছে। এরই মধ্যে এ ধরনের দুর্যোগের খবর শঙ্কার কারণ বৈকি। এতে তাদের জন্য প্রশাসনিক ব্যস্ততা আরও বাড়বে। গত বছরের বন্যায় দুর্গত এলাকার মানুষকে পর্যাপ্ত ত্রাণের অভাবে কষ্টে দিনাতিপাত করতে দেখেছি আমরা। এবারও তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক, তা কেউই চায় না।
প্রতিবছরই বর্ষা শুরু হলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সংস্কার ও নির্মাণসহ এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আশ্বাস দেয় সংশ্লিষ্ট মহল। বাস্তবতা হলো, এর অধিকাংশই আলোর মুখ দেখে না। ফলে প্রতিবছরই বর্ষা এলে দেশের উল্লেখযোগ্য অংশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নষ্ট হয় ফসল। ছোট-বড় ব্যবসায়িক উদ্যোগও কম ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। সে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা হয়ে পড়ে কষ্টকর। প্রকৃতির ওপর কারও হাত নেই সত্য, তবে যথাযথ প্রস্তুতি থাকলে এসব দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বা কমানো সম্ভব। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুধাবন করতে হবে। দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থা এখন শক্তিশালী বৈকি। একে আরও শক্তিশালী করে তোলার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট আমাদের আরও সহায়তা জোগাবে বলেই বিশ্বাস।
বন্যা এবার কতটা বিস্তৃত হবে বা কী রূপ নেবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে সংশ্লিষ্ট সব মহলে এটি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি থাকবে বলেই আমাদের আশা। অঞ্চলভেদে প্রস্তুতির ধরন ভিন্ন হবে, এটাও স্বাভাবিক। এ কাজে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সুসমন্বয় থাকলে সুফলও বেশি মিলবে।