মত-বিশ্লেষণ

বন্যা মোকাবিলায় দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

সাধন সরকার: ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পতিত হয়। বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ও সার্বভৌম ভূখণ্ডটির জš§ হওয়ার পর থেকে বন্যা নামের এই দুর্যোগটি কম-বেশি প্রতিবছরই এদেশের জানমালের ক্ষতির কারণ হয়েছে। গত কয়েক দিনের ব্যাপক বৃষ্টিতে বাংলাদেশের উত্তর, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ৪০ লাখের বেশি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তা ও বিভিন্ন ধরনের পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে পড়েছে। খবরে প্রকাশ, বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে। শ্রাবণ মাস আসতেই বৃষ্টিপাত বাড়তে শুরু করে আর বৃষ্টির পানির সঙ্গে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে পানি বাড়তে শুরু করে। দেখা যায়, বর্ষা মৌসুমের এই সময়টায় চীন ও ভারত হয়ে বন্যার পানি ও পাহাড়ি ঢল বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পৌঁছায়। এই অতিরিক্ত পানির চাপও বন্যার কারণ হয়ে থাকে। এখন ২০টিরও অধিক জেলায় বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। দ্রুত গতিতে বাড়ছে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের প্রায় সবকটি ছোট-বড় নদীর পানি বেড়েই চলেছে। কোনো কোনো নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার কারণে হাজার হাজার পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, ব্যাহত হচ্ছে লেখাপড়া। শত শত গবাদিপশু মরে গেছে, ফসলের ক্ষেত ব্যাপকভাবে প্লাবিত হয়েছে এবং হচ্ছে। কুড়িগ্রাম, জামালপুর ও সুনামগঞ্জের বন্যা গত কয়েক বছরের বন্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বন্যা প্রাকৃতিক হলেও এর ক্ষয়ক্ষতির জন্য মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কার্যকলাপ এবং সার্বিক প্রস্তুতির ঘাটতিও কম দায়ী নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অসময়ে অস্বাভাবিক মাত্রায় বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে উন্নত রাষ্ট্রগুলোও দায় এড়াতে পারে না। এশিয়ার দক্ষিণাঞ্চল এমনিতেই পৃথিবীর অন্যতম পানিবহুল ও বৃষ্টিবহুল এলাকা। এ অঞ্চলে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের গড় প্রায় এক হাজার মিলিমিটার। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রত্যেক বছর এ অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত বৃদ্ধির ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিবৃষ্টি শুধু যে বন্যার সৃষ্টি করছে তা নয়, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ অন্যান্য দুর্যোগ ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ ভারী বর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে। প্রশ্ন হলো, জলবায়ু পরিবর্তনে যাদের বা যেসব দেশের কোনো ভূমিকা নেই, সেসব দেশের মানুষ বা দেশকে কেন জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে ভুগতে হবে? জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী মাত্র শূন্য দশমিক তিন শতাংশ কার্বন নির্গমন করে বাংলাদেশ। বিশ্বকে বাসযোগ্য করার দায় উপেক্ষা করে উন্নত রাষ্ট্রগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিগর্মন করে চলেছে। তাই বন্যাসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় উন্নত রাষ্ট্রগুলো থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে জোর তৎপরতা চালাতে হবে। অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ফলে মূলত বন্যার সৃষ্টি হয়। বন্যা একটি প্রাকৃতিক বাস্তবতা এবং ভাটির দেশ হিসেবে অতিরিক্ত পানি বাংলাদেশ দিয়েই নামবে। তবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদ-নদী দখলসহ নাব্য কমে যাওয়ার ফলে অতিবৃষ্টির পানিপ্রবাহ বিঘিœত হয়। তাপমাত্রা বাড়ার ফলে মৌসুমি বায়ুপ্রবাহ এলোমেলো হয়ে যায়। মৌসুমি বায়ু যতই বিস্তৃত হয়, ততই বাড়ে বৃষ্টিপাতের অঞ্চল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের দিনের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, কিন্তু মুষলধারে বৃষ্টিপাতের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বৃষ্টিপাতের ধরনও বদলে যাচ্ছে। অল্প সময়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত অনিয়ন্ত্রিত বন্যায় রূপ নিচ্ছে। ভারতের পানিনীতিও বাংলাদেশে বন্যার তীব্রতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। শুষ্ক মৌসুমে বাঁধ দিয়ে পানি ধরে রাখা এবং বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ার ফলে বাংলাদেশে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়। প্রতিবছর বন্যা চলাকালে জানমাল ও সার্বিক অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি যেন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্যার সময়ে জানমাল ও ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও সমাধানের প্রতি গুরুত্বারোপ করা দরকার।
বন্যার সঙ্গে আবার দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। বন্যার এ সময় নদীভাঙনে শত শত পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি মানেই যেন উত্তরাঞ্চলে বন্যা আর শহরগুলোতে জলাবদ্ধতা! অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা বেড়ে যায়। এ বছর রোহিঙ্গা বসতির কারণে ভূমিধসের আশঙ্কা আগের চেয়ে অনেক গুণ বেড়ে গেছে। বন্যার সময় চরাঞ্চলের মানুষেরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হয়। বন্যার সময় বিশুদ্ধ খাবার পানি ও ওষুধ সংকটে বন্যাদুর্গতরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়। বন্যার সময় শিশু, প্রসূতি, গর্ভবতী মা ও বৃদ্ধরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। বন্যাদুর্গতদের পানিবাহিত বিভিন্ন রোগব্যাধি থেকে বাঁচাতে দ্রুত সাহায্য-সহযোগিতাসহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের সার্বিক সহযোগিতা করতে হবে। বন্যাদুর্গতদের জন্য শুকনো খাবার, নগদ টাকা ও অন্যান্য ত্রাণ তৎপরতায় কোনো ধরনের গাফিলতি কাম্য নয়। বন্যাপরবর্তী গৃহহীন মানুষকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং কৃষককে সাহায্য-সহযোগিতা করতে হবে। কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমরা এড়াতে পারব না। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করার যেটুকু সামর্থ্য আমাদের আছে, তার সবটুকু কাজে লাগাতে হবে। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদনদী এদেশকে জালের মতো ঘিরে রেখেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় অধিকাংশ নদনদী এখন দখল, দূষণ আর ভরাটকারীদের কবলে। কোনো কোনো নদনদী এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে। কোনোটা আবার মৃতপ্রায়। খালবিলসহ সব ধরনের জলাশয় দিনের পর দিন হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। অতিবৃষ্টিতে পানি যাওয়ার পথ থাকছে না। বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়াতে নদনদীর ড্রেজিং করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। যদিও এ ব্যাপারে সরকার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। নদনদী, খালবিলসহ সব ধরনের জলাশয় পরিকল্পনামাফিক রক্ষা করা গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলাসহ বন্যার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। বন্যাকালীন ও বন্যাপরবর্তী স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়েও পরিকল্পনা থাকা জরুরি। তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান শুধু নয়, প্রতিবছর হওয়া এ দুর্যোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ও ক্ষয়ক্ষতি সর্বোচ্চ কমিয়ে আনার পথ খুঁজতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে বন্যা মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে।

কলাম লেখক ও পরিবেশকর্মী

[email protected]

সর্বশেষ..



/* ]]> */