বর্তমান প্রেক্ষাপটে সুশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা

 

শিক্ষা আলোকিত সমাজ বিনির্মাণের হাতিয়ার। শিক্ষা ছাড়া আলোকিত মানুষ হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অন্ধকারে ও অতল-গহ্বরে নিমজ্জিত সমাজকে আলোর মুখ দেখাতে পারে একমাত্র সুশিক্ষা।

শিক্ষা একটি ব্যাপক ও জটিল অর্থবোধক শব্দ। এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, সুশিক্ষা একটি জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির চাবিকাঠি। সুশিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করে। প্রকৃতপক্ষে যে জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে মানুষের সুপ্ত সম্ভাবনার বিকাশ, মানবিক উন্নয়ন, কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রয়োগযোগ্য অভিজ্ঞতা হয় তা-ই সুশিক্ষা।

সুশিক্ষার জন্য চাই সুশিক্ষক, কারণ শিক্ষকের ওপরে নির্ভর করে শিক্ষার গুণগত মান। একজন শিক্ষককে মনেপ্রাণে শিক্ষক হতে হবেÑযিনি তার পেশাকে ভালোবাসেন এবং যিনি সৎ, নিষ্ঠাবান, ন্যায়পরায়ণ, সংবেদনশীল ও মানবিক। তাকে দায়িত্ব-কর্তব্যের প্রতি হতে হবে আন্তরিক। এছাড়া দেশের সামগ্রিক স্বার্থে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করার ব্যাপারেও যথার্থ ভূমিকা পালন করবেন তিনি।

আধুনিক ধারণামতে, সময় ও অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাই সুশিক্ষা। শিক্ষকরা যেহেতু জ্ঞান আহরণ, লালন, অনুশীলন ও বিতরণে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন, তাই তারা হবেন চিন্তা-চেতনায়, মেধা-মননে সম্পূর্ণ সৎ, নিরপেক্ষ, সহনশীল ও অগ্রগামী। সুশিক্ষার লক্ষ্য হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাণ শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পুষ্টি, শারীরিক ও মানসিক গঠন এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে তাদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা।

শুধু পাঠদান বা অধ্যয়ন ও পুস্তক মুখস্থ করার নামই শিক্ষা নয়; পুঁথিগত বিদ্যা অর্জন করে সুন্দর পদ্ধতিতে ও কল্যাণকর কাজে বিদ্যাকে ব্যবহার করার নামই সুশিক্ষা। শিক্ষা হলো বিশ্বাস ধারণ, আশা লালন এবং ভালোবাসা ও বিতরণের অনুরাগ সৃষ্টি করা। সততা, সহিষ্ণুতা, মানবিকতা ও পরোপকার হলো সুশিক্ষার দর্শন। এজন্য আদর্শ শিক্ষক ও আদর্শ অভিভাবকের প্রয়োজন।

সুশিক্ষা মানুষকে সংস্কৃতিমনা করে তোলে। সুশিক্ষার মাধ্যমে মানুষ তার ভেতরের আমিকে চিনতে, জানতে ও সর্বোপরি আবিষ্কার করতে সমর্থ হয়। সুশিক্ষায় শিক্ষিতরা সব ধরনের অন্যায় ও নিষ্ঠুরতাকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করে। তাদের মধ্যে নিষ্ঠুরতা একেবারে না থাকাই বাঞ্ছনীয় বা নেইও।

অনেক ব্যক্তি কাক্সিক্ষত বস্তু পাওয়ার জন্য অনেকটা একরোখা আচরণ করেন, যৌক্তিকতাকে আমলে নিতে চান না বা নেন নাÑএকে অনেকটা গোঁয়ারতুমি বলা চলে। সমাজে তাদের সংখ্যা অনেক এবং এই আধিক্যের কারণে সুশিক্ষিতেরা তাদের কাছে নিয়মিত ঠকেন, লাঞ্ছিত হন। সুশিক্ষার উন্নয়নের দ্বারা মূল্যবোধের প্রচার ও প্রসার ঘটানো না গেলে এ ভাবধারা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া দুঃসাধ্য।

সুশিক্ষার আরেকটি কাজ হলো বুদ্ধির উৎকর্ষ বৃদ্ধি। আমাদের সমাজে বেশি বুদ্ধির লোকের অভাব নেই, কিন্তু বুদ্ধির উৎকর্ষের শীর্ষে এমন লোকের অভাব নেই। বেশি বুদ্ধির লোকদের বলা হয় চতুর, আর বুদ্ধির উৎকর্ষ সাধন করে যারা তাদের বলা হয় মনীষী। যেসব ব্যক্তি বুদ্ধির উৎকর্ষ সাধন করতে পেরেছেন, তারা আজ স¥রণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন। যেমন, নেলসন ম্যান্ডেলা। যারা তা করতে পারেননি, কেউ তাদের মনেও রাখেননি। সেজন্য বলা হয়ে থাকে বুদ্ধিজীবী হয় অনেকেই, কিন্তু মনীষী হাতেগোনা।

যেসব মানুষ সুশিক্ষিত হতে পারেননি, অর্থাৎ সুশিক্ষার মাধ্যমে সুকুমারবৃত্তির পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারেননি, তাদের মাধ্যমে মূল্যবোধ আর যুক্তিবিচার চর্চা কখনও সম্ভব হবে না। সুশিক্ষিত হলেন তিনি, যিনি তার শিক্ষাকে সৎ আর ন্যায়ের পথে কাজে লাগান; যৌক্তিক বিষয়াদিকে যৌক্তিক বোঝার পর নিজ স্বার্থের দিকে নজর না দিয়ে, অযৌক্তিকতাকে দূরে ঠেলে দিয়ে সুন্দর প্রতিষ্ঠা করার জন্য ব্রতী হন। সুশিক্ষা আর যুক্তিবিচার দুটি সমান্তরালে চলে, আর তার মধ্যে যথেষ্ট মূল্যবোধের সৃষ্টি হয়।

শিক্ষার পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হতে হলে মানুষকে নিজস্ব প্রচেষ্টায় অব্যাহত থাকতে হবে এবং সুশিক্ষিত হওয়ার জন্যে স্বশিক্ষা বা নিজে শেখার ব্যবস্থা করতে হবে। কেননা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানশক্তি অর্জন করা। জ্ঞানকে আত্মস্থ করার জন্য আত্মপ্রয়াসের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার পরিধি অনেক বড়। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষালাভের সময়।’ তাই যথেষ্ট জ্ঞান অনুশীলন ব্যতীত কেউ সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারেন না। সক্রেটিস, এরিস্টটল, প্লেটো, নিউটন, গ্যালিলিও, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল প্রমুখ ছিলেন সুশিক্ষায় শিক্ষিত, যে কারণে তারা অমর হয়ে আছেন। সুশিক্ষায় শিক্ষিত লোকের মন মুক্তবুদ্ধির আলোকে উদ্ভাসিত হয়। তিনি বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হন। পরিশীলিত রুচিবোধে  তিনি হন উদার ও বিনম্র। সুশিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ নিঃসন্দেহে হবেন আলোকিত মানুষ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষে যথার্থ জ্ঞানার্জনের জন্য জ্ঞানের রাজ্যে বিচরণ করতে হয়।

মেধাবীরা যদি শুধু বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করাকেই জীবনের ধ্রুবতারা মনে করে, তা হবে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের মহোৎসব। এতে করে জীবন-মান উন্নত হয় সত্য, তবে জীবন সমৃদ্ধ হয় না। জীবন সমৃদ্ধ হয় সুশিক্ষা অর্জনে এবং সে শিক্ষা উপযুক্ত স্থানে প্রয়োগের দ্বারা। জীবন সমৃদ্ধ করতে হলে ব্যক্তিপর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপর্যায়ে সুশিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে মূল্যবোধ আর যুক্তিবিচার করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

 

রুতব সরকার

শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়