বর্ধিত সময়েও কাজ শেষ হওয়া নিয়ে সংশয়

জয়দেবপুর-চন্দ্রা-টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা সড়ক

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে ধীরগতি আর দুর্বল তদারকির কারণে সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প জয়দেবপুর-চন্দ্রা-টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা সড়কের চার লেনে উন্নীত করার কাজ বর্ধিত সময়েও শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। মূলত ঠিকাদারের অদক্ষতা ও প্রকল্পের দুর্বল ব্যবস্থাপনা এর জন্য দায়ী বলে মত দিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়েরর বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।
গত মাসে আইএমইডি প্রকাশিত চলমান প্রকল্প মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এমনটি জানানো হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ২০১৩ সালের এপ্রিলে অনুমোদন পায় প্রকল্পটি। কিন্তু বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। পরে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। ফলে চলতি বছরের মার্চেল মধ্যে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এরই মধ্যে প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদন হয়েছে। নতুন করে বাস্তবায়ন সম্পন্নে সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২০ সালের জুন। কিন্তু প্রকল্পটি বাস্তবায়নে যে গতি, তাতে এ বর্ধিত সময়েও এর কাজ শেষ হবে না বলে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়, প্রকল্পের শুরুতে যথাযথ পরিকল্পনার অভাবই মূল সমস্যা। এটির সম্ভাব্যতা যাচাই মাধ্যমে প্রকল্প শুরু হয়। আইএমইডির প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় কোনোরূপ তদারকি করা হয়নি এবং সেটি পর্যালোচনা ছাড়াই গ্রহণ করা হয়েছে। এতে ভুলত্রুটি আছে কি-না, তা দেখা হয়নি। প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডিতে অ্যালাইনমেন্টে বাঁক সরলীকরণ বিষয়টি বিবেচনায় আনা হয়নি। প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণে অনেক ভুলভ্রান্তি রয়েছে। ফলে অধিগ্রহণ প্রস্তাব তৈরির সময় অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঠিকাদার এখনও ভূমি বুঝে পায়নি। ফলে ওইসব স্থানে কাজও শুরু হয়নি।
আইএমইডি সম্প্রতি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে প্রকল্পটির নিবিড় পরিবীক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটি গত মাসে প্রতিবেদনটির খসড়া আইএমইডিতে হস্তান্তর করে। প্রতিবেদনটির ওপর প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করা হয়। আইএমইডির কর্মকর্তারা জানান, এ সড়কটি এশিয়ান হাইওয়ের অংশ, সার্ক হাইওয়ের করিডোর এবং সাসেক রোড করিডোরের অংশ হওয়ায় বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাও অর্থায়ন করছে।
এদিকে এলেঙ্গা হতে রংপুর পর্যন্ত ১৯০ কিলোমিটার সাসেক-২ প্রকল্পের আওতায় চারলেনে উন্নীত করার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। রংপুর হতে লালমনিরহাট হয়ে বুড়িমারী পর্যন্ত সড়কটির বাকি অংশও পরবর্তীতে চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এতে ভারত, নেপাল এবং ভুটান এ সড়কের মাধ্যমে চট্টগ্রম বন্দর পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারবে। তাই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ দ্রুত হওয়া প্রয়োজন।
আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ফিজিবিলিটি স্টাডির আলোকে ডিপিপি প্রস্তুত করতে গিয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর প্রকল্পের প্রয়োজনীয় সব অঙ্গ বিবেচনা না করে প্রকল্প ব্যয় দুই হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ের মূল ডিপিপি প্রস্তুত করে। প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও এফআইডি, এডিএফডি এবং বাংলাদেশ সরকার অর্থায়ন করছে। বর্তমানে প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে পাঁচ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। চলতি বছর মার্চে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও এটি এখন ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বাস্তবায়নের কাজে ধীরগতি, অতিবৃষ্টি, ঠিকাদারদের অদক্ষতা এবং নিম্নমানের প্রকল্প ব্যবস্থাপনার কারণে এ সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
ফিজিবিলিটি স্টাডি অনুযায়ী প্রতি কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করার জন্য ২১ কোটি ৩২ লাখ টাকা থেকে ২৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয় করার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু বাস্তবে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
মূল প্রকল্পটিতে কোনাবাড়ী ফ্লাইওভার, চন্দ্রা ফ্লাইওভার, লতিফপুর রেলওয়ে ওভারপাস, সোহাগপুর (ধেরুয়া) রেলওয়ে ওভারপাস ও রাবনা ফ্লাইওভার অন্তর্ভুক্ত ছিল। দ্বিতীয় সংশোধনীতে নাওজোর ফ্লাইওভার, শফিপুর ফ্লাইওভার, চন্দ্রা লুপ, কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক ফ্লাইওভার, লতিফপুর রেলওয়ে ওভারপাস, গোড়াই ফ্লাইওভারসহ মোট ছয়টি ফ্লাইওভার এবং ১৩টি আন্ডারপাস এবং ডানপাশের ৫১ কিলোমিটার এসএমভিটি লেন অর্থাৎ ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রকল্পে প্রত্যেক ঠিকাদারেরই জয়েন্ট ভেঞ্চারে একজন বিদেশি ঠিকাদার রয়েছে। আইএমইডির পরিদর্শনকালে একটি প্যাকেজ ছাড়া কোনো প্যাকেজেই বিদেশি ঠিকাদার বা বিদেশি লোকবল পাওয়া যায়নি। নির্মাণ প্রক্রিয়াতেও নানা অভিযোগ উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। উল্লেখ করা হয়েছে, পানি নিষ্কাষণের জন্য সড়ক পাশে ড্রেনেজের ব্যবস্থা থাকলেও সঠিক কোনো আউটলেট নেই। রাস্তার পাশে এখনও কবরস্থান ও মসজিদ সরানো যায়নি বিধায় নির্মাণকাজে বিঘœ ঘটছে।
প্রকল্প পরিদর্শন করে বলা হয়েছে, নির্মাণকাজ চলাকালীন সময়ে প্রয়োজনীয় সাইন বা সিগনালের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। রাতের বেলায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আলোর ব্যবস্থা রাখা হয়নি। রাস্তায় প্রচুর ধুলাবালির কারণে জনদুর্ভোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে।
এ প্রকল্পে তদারককারী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দক্ষ জনবল নিয়োগ দেয়নি। বিশেষজ্ঞ পরামর্শকগণ নিয়মিত সাইট পরিদর্শন না করার জন্য অদক্ষ প্রকল্প ব্যবস্থাপনাই দায়ী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরামর্শকরা আরও তৎপর হলে কাজের গুণগত মান আরও ভালো হতো। এ ধরনের বড় প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের ঘন ঘন এবং পরিদর্শন করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।