হোম প্রচ্ছদ ৫ বছরে পণ্য আমদানি তিনগুণ বাড়লেও লাইটারেজ কমেছে ৩০০

৫ বছরে পণ্য আমদানি তিনগুণ বাড়লেও লাইটারেজ কমেছে ৩০০


Warning: date() expects parameter 2 to be long, string given in /home/sharebiz/public_html/wp-content/themes/Newsmag/includes/wp_booster/td_module_single_base.php on line 290

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ২০১১-১২ অর্থবছরে বহির্নোঙরে খালাস হওয়া পণ্যের পরিমাণ ছিল এক কোটি ৭৮ লাখ টন। সে সময়ে পণ্য পরিবহনে লাইটার জাহাজ ছিল এক হাজার। আর গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পাঁচ কোটি ৫৪ লাখ টন পণ্য আমদানি হয়েছে। আলোচ্য সময়ে আমদানি পণ্যের পরিমাণ তিনগুণ হলেও গত পাঁচ বছরে বহির্নোঙরে খালাসের কাজে ব্যবহৃত জাহাজের সংখ্যা কমেছে তিন শতাধিক। ফলে চাহিদানুসারে জাহাজ সংকটের কারণে বহির্নোঙরে প্রায় সময় জাহাজজট লেগে থাকে ও আমদানিকারকদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় বেড়ে গিয়ে পণ্যেও দাম বাড়ছে।

বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, পণ্যবাহী বড় জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে সাগরে নোঙর করে রাখা হয়। ওই এলাকা বহির্নোঙর নামে পরিচিত। বড় জাহাজে করে আনা পণ্য সেখানে ক্রেনের সাহায্যে লাইটার জাহাজে স্থানান্তর করা হয়। এরপর চট্টগ্রাম, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের ৩৯টি ঘাট এলাকায় নিয়ে লাইটার জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের কাজ চলে। বর্তমানে লাইটার জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া হয় ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল নামের একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে। প্রতিদিন সভা করে সংস্থার হাতে খালি থাকা জাহাজ আমদানিকারকদের বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে লাইটার জাহাজ সংকটের কারণে ঈদের ছুটির পর ৪ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় দিনের মধ্যে চারদিনই জাহাজ বরাদ্দের জন্য সভা করতে পারেনি ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল।

জাহাজ মালিকদের সংগঠন ইনল্যান্ড ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (আইভোয়াক) সভাপতি হাজি শফিক আহমদ শেয়ার বিজকে বলেন, “পণ্য আমদানি যে হারে বাড়ছে, তাতে অন্তত আরও ৫০০ ছোট জাহাজ দরকার ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে নতুন লাইটারেজ জাহাজ নির্মাণ বন্ধ থাকায় তা আর বাড়েনি। উল্টো কমেছে, এখন আছে ৬৫০ থেকে ৭০০টি জাহাজ। এ প্রয়োজনীয়তাকে উপলব্ধি করে সরকার সম্প্রতি নতুন করে আবারও নতুন ছোট জাহাজ নির্মাণ আদেশ জারি করে, যা আরও আগে করা উচিত ছিল। এতে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় বন্ধ হবে। দিনের পর দিন সাগরে পণ্য নিয়ে জাহাজ বসে থাকতে হবে না। তবে এটা ঠিক কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে ব্যবহার করছে।”

অবশ্য লাইটার জাহাজ পরিচালনাকারী ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের একাধিক সদস্য শেয়ার বিজকে বলেন, এখন যে পরিমাণ লাইটার জাহাজ রয়েছে, তা পর্যাপ্ত। তাহলে সংকট কেন- জানতে চাইলে তারা বলেন, নতুন জাহাজ নির্মাণের ফলে সংকট কিছুটা হলেও কমবে। তবে আমদানিকারকদের জাহাজকে পণ্যের গুদাম বানানোর মানসিকতা বন্ধ করতে হবে।

আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, লাইটার জাহাজ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা ছিল। কিন্তু নৌপরিবহন অধিদফতর দীর্ঘ ২১ মাস নির্মাণের অনুমোদন বন্ধ রেখেছে। পাশাপাশি ২০১৫ সালের ১ ডিসেম্বর লাইটার জাহাজ নির্মাণের নকশা অনুমোদন স্থগিত করে সার্কুলার জারি করে সংস্থাটি। তবে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কিছু জাহাজের নকশা অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যার প্রমাণ মিলেছে নকশা অনুমোদনের জন্য ঘুষ নিতে গিয়ে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি দলের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন নৌপরিবহন অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী একেএম ফখরুল ইসলাম।

সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালক কমোডর সৈয়দ আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বহির্নোঙরে পণ্য স্থানান্তর কাজে ব্যবহৃত লাইটার বা ছোট জাহাজ নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে নৌপরিবহন অধিদফতর। কেননা অনেক দিন ধরে ছোট জাহাজ সংকটের কারণে আমদানি পণ্য খালাসে দেরি হচ্ছিল। এতে আমদানিকারকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। এই আদেশের মাধ্যমে সংকটের সমাধান হবে বলে আশা করছি।’

উল্লেখ্য, প্রতি বছর আমদানির পরিমাণ বাড়লেও বহির্নোঙরের পণ্য স্থানান্তর বা লাইটারিংয়ে বাড়েনি ছোট জাহাজ। আমদানি হার অনুসারে লাইটারেজ জাহাজের সংখ্যা হওয়ার কথা দু’হাজারের অধিক। অথচ ৩০০ জাহাজ কমে বর্তমানে মাত্র ৭০০ ছোট জাহাজ দিয়ে বাড়তি পণ্য খালাস করতে গিয়ে নাকাল হতে হয়েছে আমদানিকারকদের। আর চাহিদার তুলনায় বহির্নোঙরে পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা কম থাকায় গত এক বছরের অধিক সময় কার্গো জাহাজ থেকে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য স্থানান্তরে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। ফলে প্রতিদিন ১০ হাজার ইউএস ডলার ডেমারেজ বা মাসুল গুনতে হয়েছে পণ্যের আমদানিকারকদের। আর এ জরিমানা ডলারে মাসুল পরিশোধ করতে গিয়ে এ টাকা বিদেশে চলে গেছে। এ অবস্থা চলমান গত কয়েক মাস ধরে।

জানা যায়, চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের রাশিয়া থেকে আমদানি করা ৫৪ হাজার টন গম নিয়ে ‘এমভি ডরিক ড্রাইডেন্ট’ নামের একটি জাহাজ গত ৩ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় (বহির্নোঙরে) ভেড়ে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী লাইটার জাহাজ না পাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। ফলে জাহাজটি থেকে গম খালাস করতে সময় লেগেছে ৫০ দিন। অথচ এই পরিমাণ গম খালাস করতে সর্বোচ্চ ২২ দিন লাগার কথা। সময়মতো সব পণ্য বুঝে না পাওয়া এবং পরিবহনের বাড়তি খরচ উভয় দিকেই ক্ষতির শিকার হয়েছে এ গ্রুপটি।

আমদানিকারকরা মনে করছেন, নতুন জাহাজ নির্মাণ হবে ছোট জাহাজ সংকটের অবসান হবে। এতে আমদানি পণ্য পরিবহনে খরচ অনেক কমে আসবে। আর চট্টগ্রাম বন্দরে খোলা পণ্যের দীর্ঘ জাহাজজট কিছুটা হলেও কমবে। অন্যদিকে জাহাজ মালিকরা বলছেন, পণ্য আমদানি করে জাহাজকে গুদাম হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা বন্ধ করতে না পারলে নতুন জাহাজ তৈরি করেও পুরোপুরি সুফল মিলবে না।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম শেয়ার বিজকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অনুসারে দুই হাজারের অধিক লাইটারেজ জাহাজের প্রয়োজন থাকলেও আছে অনেক কম। এতে অনেক সময় সংকোচের কারণে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি দেখা দেয়। এক্ষেত্রে যত বেশি লাইটারেজ জাহাজ থাকবে তত বেশি দেশের লাভ। ফলে এতে মনোপলি করার সুযোগ হবে না। আর এজন্য জাহাজ নির্মাণ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া দরকার।