বহুজাতিক কোম্পানির ভ্যাট কারসাজি কাম্য নয়

সারা বিশ্বে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো স্বচ্ছ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সাধারণভাবে পরিচিত। এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিক লেনদেন, সরকারের প্রাপ্য শুল্ক-কর পরিশোধ প্রভৃতি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখে বলেই ধারণা। এটা সংশ্লিষ্ট কোম্পানি থেকে সাধারণ ভোক্তা পর্যন্ত সব পক্ষের জন্যই ইতিবাচক। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানগুলোও যদি কারসাজির আশ্রয় নেয়, তাহলে তা সব পক্ষের জন্যই নেতিবাচক। গতকালের শেয়ার বিজে ‘সেবাকে রফতানি দেখিয়ে ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে জিই হেলথকেয়ার’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে কারসাজির মাধ্যমে জিই হেলথকেয়ারের মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সরঞ্জামের বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদান করে ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সেবা বা সার্ভিস চার্জ বৈদেশিক মুদ্রায় নেওয়া হলেও এটিকে রফতানি হিসেবে দেখিয়ে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। স্বনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এমন কারসাজি কারও কাম্য নয়।
প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ভারতের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল সরঞ্জাম উৎপাদক ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান উইপ্রো জিই হেলথকেয়ার প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী এদেশে তাদের পণ্যের বিক্রয়োত্তর সেবা দিচ্ছে জিই হেলথকেয়ার। সে অনুযায়ী জিই হেলথকেয়ারকে ১০ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জসহ সার্ভিসিং সেবামূল্য প্রদান করে থাকে উইপ্রো। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির কাগজপত্র পর্যালোচনা করে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১৯ কোটি ছয় লাখ টাকা ভ্যাট তারা পরিশোধ করেনি বলে প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানাচ্ছে সংস্থাটি। জিই হেলথকেয়ার’র একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এক্ষেত্রে সদুত্তর দিতে পারেননি বলেই প্রকাশিত খবরে প্রতীয়মান। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য। এছাড়া সব পক্ষই সঠিকভাবে ভ্যাট দিচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা ও না দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব এনবিআর পালন করবে বলেই বিশ্বাস।
খবরে বলা হয়েছে, বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কোটি কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টি ইতিমধ্যে উদ্ঘাটন করেছে এনবিআর। জিই হেলথ কেয়ারের কাছ থেকে ভ্যাট পরিশোধে দাবিনামা জারির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটিকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে জানা যায়। এক্ষেত্রে এনবিআর তার দায়িত্ব পালন করেছে। তবে শুধু এই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নয়, সব বহুজাতিক ও দেশীয় কোম্পানিই যথাযথভাবে ভ্যাট প্রদান করছে কি না, তা খতিয়ে দেখার বিকল্প নেই। ভ্যাট আমাদের রাজস্ব আহরণ তথা দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি বলে বিবেচিত। এ অবস্থায় ভ্যাট প্রদানে কারসাজি হলে এবং সেটা চলতে থাকলে তা সবার জন্যই নেতিবাচক ফল বয়ে আনবে।
বিভিন্নভাবে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রায়ই উঠে আসছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নিয়মানুযায়ী ভ্যাট আদায় এবং অনিয়ম হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া এনবিআরের দায়িত্ব বৈকি। জিই হেলথ কেয়ারের ওই ধরনের কারসাজির খবর নানা কারণে নেতিবাচক। এ বিষয়গুলো যখন ব্যাপকভাবে প্রকাশ পাবে, তখন সমধর্মী অন্যান্য কোম্পানিও একই রকম কারসাজির আশ্রয় নিতে প্ররোচিত হতে পারে। এ ধরনের কারসাজির ঘটনা বহির্বিশ্বেও নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে আমাদের রাজস্ব তথা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে। এটা স্থানীয় ব্যবসার জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো, কর-জিডিপি অনুপাতের ক্ষেত্রে বিশ্বে যেসব দেশ সবচেয়ে পিছিয়ে, বাংলাদেশ তার অন্যতম। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও আমরা এক্ষেত্রে পিছিয়ে। ফলে প্রতি বছরই রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অন্যান্য উৎস থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে চলতে হচ্ছে। দেশীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে ভ্যাট প্রদান করলে বা তা আদায় করা গেলে কর-জিডিপি অনুপাত শক্তিশালী অবস্থানে যেতে পারবে বলেই বিশ্বাস। এটা প্রকারন্তরে আমাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। এর বিপরীতটি হলে কর-জিডিপি অনুপাত আরও দুর্বল হওয়ার শঙ্কা রয়েছে, যা নেতিবাচক ফল বয়ে আনবে।