বাংলাএদশের মহাকাশ জয়!

মোতাহার হোসেন: মহাকাশে উড়াল দিয়েছে আমাদের গর্ব, স্বপ্নের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। এই সেøাগানে ধ্বনিত হলো সুদূর আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মাটি, প্রকম্পিত হলো সেখানে উপস্থিত বাংলাদেশি ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের হƒদয়ও। স্বপ্নের এই স্যাটেলাইট মহাকাশে উড়াল দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মহাকাশ জয়ের মাইলফলক স্পষ্ট করার দিন এটি। দেশের ১৭ কোটি মানুষ এই দিনের জন্য অপেক্ষা করেছে স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ ৪৭ বছর। আমাদের প্রত্যাশাÑঅদূর ভবিষ্যতে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর মতো আরও স্যটেলাইট মহাকাশে ভেসে বেড়াবে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান হবে অসীম উচ্চতা ও মর্যাদায়।
স্যাটেলাইটটি মহাকাশের উদ্দেশে উড়ালের দৃশ্যটি সরাসরি প্রত্যক্ষ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাজধানীর অদূরে গাজীপুরের গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফ্লোরিডায় উৎক্ষেপণ কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হন। আর ক্যাপ ক্যানাভেরালে ছিল প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল। এর আগে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিটিআরসি স্পেসএক্সের বরাত দিয়ে দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের চূড়ান্ত দিনক্ষণ ঘোষণা করে।
শুক্রবার (১১ মে) যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বিকাল ৪টা ১৪ মিনিট আর বাংলাদেশ সময় শুক্রবার রাত ২টা ১৪ মিনেটে ফ্লোরিডার ক্যাপ ক্যানাভেরাল স্পেস স্টেশন থেকে মহাকাশে ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ উড়াল দেওয়ার সময় বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় অধিকাংশ গণমাধ্যম ও টিভি সরাসরি সম্প্রচার করে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট মহাকাশে উড়াল দেওয়ার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সেখানে উপস্থিত প্রবাসী বাংলাদেশি ছাড়াও বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সাংবাদিক, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সুশীল সমাজের বিপুল সংখ্যক মানুষ উপভোগ করেন এই বিরল দৃশ্যটি। দেশের কৃত্রিম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’-এর মহাকাশে ডানা মেলার এই মাহেন্দ্রক্ষণ দেখার জন্য কয়েক দিন ধরেই উৎসুক দেশের মানুষ, উৎসুক প্রবাসী বাংলাদেশিরা। অপূর্ব এই দৃশ্যটি একনজর দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে যেমন প্রবাসী বাংলাদেশিরা আগে থেকে ফ্লোরিডায় অবস্থান করছিলেন, তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ছুটে গেছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এই দৃশ্য দেখার জন্য সে স্থান বাংলাদেশিদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। এ যেন আরেক বাংলাদেশ হয়ে উঠল ফ্লোরিডা।
স্মৃতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের গায়ে বাংলায় ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ সেøাগানটি লেখা রয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সুদূরপ্রসারী ভাবনা থেকে ১৯৭২ সালে বেতবুনিয়ায় দেশের প্রথম ভূ-উপগ্রহ স্থাপনের মাধ্যমে। সেই উপগ্রহই ছিল মহাকাশের সঙ্গে দেশের যোগাযোগের প্রথম সেতুবন্ধ। তখন বিদেশি স্যাটেলাইটের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে আবহাওয়ার পূর্বাভাস-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া ছিল সেই ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের কাজ। জাতির পিতা সেদিন স্বপ্নের যে বীজ বুনেছিলেন, তার পথ ধরেই আজ আকাশে উড়ছে দেশের প্রথম নিজস্ব স্যাটেলাইট। এর নামও জাতির পিতার নামেই, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং তার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে গৌরবময় বিশ্ব স্যাটেলাইট ক্লাবে। আবেগাপ্লুত সজীব ওয়াজেদ জয় ‘যেখানে মানুষ পৌঁছাতে পারে না, যা অসীম মহাশূন্য, সেখানেও পৌঁছে যাবে বঙ্গবন্ধুর নাম।’
যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ অনুসন্ধান ও প্রযুক্তি কোম্পানি ‘স্পেসএক্স’ জানায়, এবারই প্রথম উপগ্রহ উৎক্ষেপণে তাদের ফ্যালকন-৯ রকেটের ব্লক ৫ সংস্করণ ব্যবহার করতে যাচ্ছে স্পেসএক্স। গত ৪ মে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে নতুন এই রকেটের স্ট্যাটিক ফায়ার টেস্ট সম্পন্ন হয়। তিন হাজার ৫০০ কেজি ওজনের জিওস্টেশনারি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-কে নিয়ে ফ্যালকন-৯ কক্ষপথের দিকে ছুটবে কেনেডি স্পেস সেন্টারের ঐতিহাসিক লঞ্চ কমপ্লেক্স ৩৯-এ থেকে, যেখান থেকে ১৯৬৯ সালে চন্দ্রাভিযানে রওনা হয়েছিল অ্যাপোলো-১১।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট মহাকাশে গেলে নিজস্ব স্যাটেলাইটের অধিকারী বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটবে। এছাড়া এই স্যাটেলাইট স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের যেমন নির্ভরতা কমবে অন্য দেশের ওপর, তেমনি দেশের অভ্যন্তরীণ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার জন্য গাজীপুরের জয়দেবপুরে প্রাথমিক এবং রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র দ্বিতীয় গ্রাউন্ড স্টেশনের নির্মাণ কাজ করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল, ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ভি-স্যাট সংস্থা বিদেশি স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে। এটি চালু হলে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কারণে বিপুল অর্থ দেশেই থেকে যাবে। প্রত্যাশা এভাবেই অনাগত দিনে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের সাফল্য গাঁথা, আর বিষ্ময়কর উত্থান,অগ্রগতির গল্প রচিত হবে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।

সাংবাদিক ও কলাম লেখক
[email protected]