মত-বিশ্লেষণ

বাংলাদেশকে উন্নত হতে হলে শিশুশ্রম বন্ধ করতে হবে

কাজী সালমা সুলতানা: যে ছেলেটা প্রতিদিন বাড়ির সামনের রেস্তোরাঁয় টেবিল মুছে খাবার অর্ডার নেয় তার বয়সটা কতই বা হবে! খুব বেশি হলে ৮ বা ১০। এ বয়সে তো মায়ের হাত ধরে তার স্কুলে যাওয়ার কথা। কিন্তু জীবনের প্রয়োজনে তাকে শিক্ষাজীবনকে বিসর্জন করে রাত-দিন কাজ করতে হচ্ছে। মূলত অর্থ উপার্জনের তাগিদে মা-বাবার সান্নিধ্য ছাড়তে তারা বাধ্য হয়। অনেক শিশুই ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও নিয়োজিত হয়। অনেকে অসংখ্য ঝালাই, স্প্রে পেইন্টিং, অটোমোবাইল গ্যারেজ, প্লাস্টিক দ্রব্য তৈরির কারখানায় কাজে নিয়োজিত হচ্ছে। জাতিসংঘ কর্তৃক চিহ্নিত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মধ্যে ঝালাই কারখানার কাজ অন্যতম। কারখানা মালিকদের অধিক মুনাফা লাভের আশায় সেখানে নামমাত্র বেতনে দাসের মতো শিশুদের দিন-রাত খাটানো হয়। কখনও শুধু একবেলা খাবারের বিনিময়ে তাদের কাজে নিয়োজিত করা হচ্ছে। কারখানার পরিবেশ দূষণজনিত কারণে শিশুরা শ্বাসকষ্ট, শ্রবণবৈকল্যসহ নানা রকম রোগের শিকার হয়। এছাড়া কারখানা মালিকের নির্যাতন-নিপীড়ন তো রয়েছেই।
শ্রমজীবী শিশুরা যে কর্মপরিবেশে তাদের কাজ সম্পাদনা করে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা তাদের অনুকূলে থাকে না। শ্রমে নিয়োজিত একজন শিশুকে দৈনিক সর্বোচ্চ পাঁচ কর্মঘণ্টার অতিরিক্ত সময় কাজ করানো হয়। তারা এমন কাজ করে, যা তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা এবং সামাজিক অবস্থানের ওপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি করে। এসব শিশু নিরাপত্তাহীন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করা ছাড়াও তাদের বিনা মজুরি, অনিয়মিত মজুরি, স্বল্প মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। কখনও কখনও তাদের দিয়ে সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করানো হয়। এতে তাদের শিক্ষাজীবন বন্ধ হয়ে যায়। এসব কাজ করতে গিয়ে শিশুরা নির্যাতিত ও ব্যক্তি মর্যাদা হারায়।
আমাদের দেশে শিশু শ্রমিকের মধ্যে একটি বিশাল অংশ হচ্ছে মেয়েশিশু। দরিদ্র পরিবারের বেশিরভাগ মেয়েশিশুকে গৃহকর্মীর কাজ করতে হয়। এছাড়া নির্যাতন, যৌননিপীড়ন তো রয়েছেই। বাংলাদেশে কারখানাসহ প্রায় ৪৭ ধরনের কাজ করানো হয় শিশুদের দিয়ে। বাংলাদেশে শতকরা ৯৪ ভাগ শিশু শ্রমিক কৃষি এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছে। প্রায় ৪৭ লাখ শিশু শ্রমিকের মধ্যে পাঁচ থেকে ১৪ বছরের শিশুর সংখ্যা বেশি। আর পাঁচ থেকে ১৭ বছর বয়সের প্রায় ৭৫ লাখ শ্রমজীবী শিশুর মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ শিশু জনপ্রতি সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে কাজ করে থাকে। যদিও আন্তর্জাতিক শ্রম আইনে ১৮ বছরের কম বয়সের শিশুদের দিয়ে এ ধরনের কাজ করানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারখানায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের নিয়োগদানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে কার্যকর এবং গৃহকর্মে নিয়োগ ও ভাঙ্গাড়ি খাতকেও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। শিশুশ্রম প্রতিরোধ কার্যক্রমকে সফল করে তুলতে অবিলম্বে শিশুনীতি বাস্তবায়ন, আইএলও কনভেনশন ১৮২ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও ১৩৮ অনুসমর্থন করাসহ পথশিশু, ছিন্নমূল শিশু এবং শিশু শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও কল্যাণে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কলকারখানার বিকাশ, উৎপাদন বৃদ্ধি ও ব্যাপক কর্মসংস্থানের প্রসার ছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব নয়। আবার দারিদ্র্য নির্মূল করা ছাড়া শিশুশ্রমও বন্ধ করা যাবে না।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে গ্রেট ব্রিটেনে কারখানা চালু হলে সর্বপ্রথম শিশুশ্রমকে একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চল ও মধ্য পশ্চিমাঞ্চলে গৃহযুদ্ধের পর এবং দক্ষিণে ১৯১০ সালের পর শিশুশ্রম একটি স্বীকৃত সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। আগেকার দিনে শিশুরা কারখানায় শিক্ষানবিশ অথবা পরিবারে পরিচায়ক হিসেবে কাজ করত। কিন্তু কারখানাগুলোতে তাদের নিয়োগ দ্রুতই প্রকৃত অর্থে হয়ে দাঁড়ায় দাসত্ব। ব্রিটেনে ১৮০২ সালে এবং পরবর্তী বছরগুলোয় সংসদে গৃহীত আইন দ্বারা এ সমস্যার নিরসন হয়। ইউরোপের অন্যান্য দেশে একই ধরনের আইন অনুসরণ করা হয়। যদিও ১৯৪০ সাল নাগাদ বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশে শিশুশ্রম আইন প্রণীত হয়ে যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উৎপাদন বৃদ্ধির আবশ্যকতা বহু শিশুকে আবার শ্রমবাজারে টেনে নিয়ে আসে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯১৮ এবং ১৯২২ সালে সুপ্রিম কোর্ট মার্কিন কংগ্রেস কর্তৃক প্রণীত শিশুশ্রম আইন অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। ১৯২৪ সালে কংগ্রেসে একটি সংবিধান সংশোধনী পাস করা হয়, কিন্তু সেটি অনেক অঙ্গরাজ্যেই অনুমোদন পেতে ব্যর্থ হয়। ১৯৩৮ সালে প্রণীত প্রথম লেবার স্ট্যান্ডার্ড অ্যাক্টস ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত পেশার জন্য ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং সাধারণ নিয়োগের জন্য ১৬ বছর ধার্য করে দেয়।
জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০০২-২০০৩ অনুযায়ী সারা দেশে শ্রমজীবী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৩১ লাখ ৮০ হাজার এ কাছাকাছি। যাদের মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকা শহর ঢাকাতেই রয়েছে সাত লাখ আট হাজার শিশু এবং এদের মধ্যে তিন লাখ ৮৭ হাজার শিশুই বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম হিসাব সংখ্যার বাইরে, তবে ২০০২-০৩-এর জাতীয় শিশুশ্রম জরিপের পর আর কোনো গ্রহণযোগ্য জরিপ না হওয়ায় বর্তমান সময়ের শ্রমজীবী শিশুদের সংখ্যা সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে বর্তমানে শ্রমজীবী শিশুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের।
সম্প্রতি বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন-২০১৮-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এই শ্রমিকবান্ধব শ্রম আইনের ৪১টি ধারার মধ্যে বলা হয়েছে, কেউ যদি শিশু শ্রমিক নিয়োগ করে তাকে পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দিতে হবে। তবে ১৪ থেকে ১৮ বছর ‘কিশোর বয়স’ পর্যন্ত কিশোররা হালকা কাজ করতে পারবে। আগে ১২ বছরের শিশুদের হালকা কাজ করতে দেওয়া হতো। শিক্ষাবঞ্চিত নি¤œবিত্ত ও বিত্তহীন শিশুদের স্বল্পমেয়াদি কারিগরি প্রশিক্ষণদানের পর তাদের ঝুঁকিমুক্ত কাজের সংস্থানের জন্য সরকার ও বেসরকারি সংস্থা এগিয়ে এলে শিশুশ্রমের প্রবণতা কমে যাবে। অধিকারবঞ্চিত শিশুদের পুনর্বাসনের মানবিক দায়িত্ব সমাজের বিত্তবানদের ও রাষ্ট্রের। শিশুশ্রম বন্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে বাস্তবায়নের পথও উš§ুক্ত হবে। তবে সাম্প্রতিক একটি বেসরকারি জরিপে দেখানো হয়েছে, ১৫ বছরের নিচে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৮ লাখ মেয়েশিশু গৃহকর্মে নিয়োজিত। আর এদের অধিকাংশই শিকার হয় শারীরিক-মানসিক ও যৌন নির্যাতনের।
শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এজন্য ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের প্রত্যাহারের লক্ষ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ২৮৫ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে তৈরি পোশাকশিল্প ও চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে শতভাগ শিশুশ্রম মুক্ত করা হয়েছে।
আমাদের দেশের শিশুদের লেখাপড়া, খাদ্য, স্বাস্থ্য ও মেধা বিকাশের জন্য অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা ছাড়া শিশুশ্রম বন্ধ করা কোনোভাবেই সম্ভব না। তাই শিশুশ্রম বন্ধে তাদের শিক্ষার বাধ্যকতা করতে হবে। এ লক্ষ্যে শিশুশ্রমের কুফল সম্পর্কে শিশুর অভিভাবকসহ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সচেতন করে তুলতে হবে। তবে দারিদ্র্য, ক্ষুধা থাকলে কোনোভাবেই শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব হবে না। মনে রাখতে হবে আজকের শিশু আগামীদিনের ভবিষ্যৎ নাগরিক।
তাই সুনাগরিক গড়ার স্বার্থে শিশুশ্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করলেই এ সামাজিক সমস্যার সমাধান আসবে।

গণমাধ্যমকর্মী

salma15augustÑgmail.com

সর্বশেষ..