বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও এসডিজি বাস্তবায়ন

. শামসুল আলম: সামাজিক বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি অতুলনীয়। এর মধ্যে রয়েছে বিশেষ করে প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি, পাঁচ বছরের নিচে মৃত্যুহার কমানো, মোট জন্মহার কমানো, স্কুলে মেয়ে শিক্ষার্থীর ভর্তিহার বৃদ্ধি ও টিকাদান কর্মসূচি। এ লেখার মূল উদ্দেশ্যগুলোর একটি হলো এসডিজি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্যগুলোর হালনাগাদ বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বেশ কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন লক্ষ্য করার মতো। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্রমবর্ধমান জিডিপি প্রবৃদ্ধি, সরকারি বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যু হার কমানো, মোট জন্ম হার কমানো, প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি ও বয়স্কদের সাক্ষরতার হার বাড়ানো।

এছাড়া কিছু সূচকে লক্ষ্য অর্জনের প্রক্রিয়া চলমান। এর মধ্যে রয়েছে শিল্প প্রবৃদ্ধি, রফতানি ও আমদানি, সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রকৃত ভর্তি, নিরাপদ সুপেয় পানির প্রাপ্যতা ও বিদ্যুৎ। বেসরকারি বিনিয়োগে গতি সঞ্চার, কৃষি খাত ত্বরান্বিতকরণ, রেমিট্যান্স, কর বাড়ানো, জিডিপির অনুপাতে সরকারের সার্বিক ব্যয় বৃদ্ধি, মাতৃমৃত্যুর অনুপাত কমানো এবং জন্ম নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ে আরও বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন।

এসডিজি ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে সম্পদের আরও বেশি সংহতকরণ, জনসংখ্যা বোনাসের লঘুপাত, অপরিকল্পিত নগরায়ণ সুব্যবস্থাপনায় আনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, দক্ষতার উন্নয়ন ও গুণগত শিক্ষা, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগী সক্ষমতার উন্নয়ন, সুশাসন, অসমতা নিয়ন্ত্রণ ও আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো।

বাংলাদেশের অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে মানবসম্পদ উন্নয়নে বর্ধিত বিনিয়োগ, অবকাঠামোগত ঘাটতি নিরসন, গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ ও গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রফতানি বহুমুখীকরণ, অসমতা কমানো এবং উত্তর-দক্ষিণ, দক্ষিণ-দক্ষিণ ও ত্রিধারার সহযোগিতা। মোটা দাগে সফলতা নির্ভর করছে তিনটি প্রধান বিষয়ে সমন্বয়নের ওপর। এগুলো হলোÑসম্পদ সংহতকরণ, শাসনব্যবস্থার উন্নয়ন ও সব পক্ষের মধ্যে আন্তসহায়তার উন্নয়ন ঘটানো।

নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে একটি কাল্পনিক রূপকথার মতো অবস্থা থেকে উন্নয়নের গোলক ধাঁধায় রূপান্তর হয়েছে। বিশেষ করে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অতিমাত্রায় ঘনবসতিপূর্ণ জনসংখ্যার সুব্যবস্থাপনা করে উন্নয়ন করাটা ছিল মহা চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদরা এমন বিষয়ের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। বিশেষ করে প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল, পাঁচ বছরের নিচে শিশুর মৃত্যুহার কমানো, সার্বিক জন্ম হার নিয়ন্ত্রণ, প্রাথমিকে মেয়ে শিক্ষার্থীর ভর্তি শতভাগে উন্নীত করা ও সফল টিকাদান কর্মসূচির মতো সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ বিশ্বে মডেল স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে বলে তারা মনে করেন।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সব সময় একই ধারায় প্রবাহিত হয় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সামাজিক উন্নয়ন অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে (ড্রেজ ও সেন, ২০১৩)। সহস্রাব্দ উন্নয়ন অভীষ্টগুলোর মধ্যে পাঁচ বছরের নিচে মৃত্যুহার কমানো, নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য নিরসনে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভিন্ন স্বীকৃতি অর্জন করেছে, যা দেশের নীতিনির্ধারকদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এ আত্মবিশ্বাস টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টগুলো সফলভাবে বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।

২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন বাংলাদেশকে একটি নতুন দিগন্তে দাঁড় করিয়েছে। প্রায় দেড় দশক ধরে চলে আসা ছয় শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির বৃত্ত ভেঙে ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সাত শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে অর্জিত সাত দশমিক ২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর ‘অভিজাত ক্লাবে’ উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। ২০১৬ সালে মাথাপিছু আয় ছিল এক হাজার ৪৬৫ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে ২০১৭ সালে তা এক হাজার ৬১০ ডলারে উন্নীত হয়।

২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ প্রতিবছর এক দশমিক আট শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমাতে সক্ষম হয়েছে। এর পরের পাঁচ বছর এ কমার হার ছিল এক দশমিক সাত শতাংশ। আর ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর দারিদ্র্য কমেছে এক দশমিক দুই শতাংশ হারে। ২০১৬ সালে চূড়ান্ত হওয়া সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপের (এইচআইইএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে দেশে সাধারণ বা উচ্চ দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক তিন শতাংশ। আর নিম্ন বা চরম দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে সর্বশেষ ছয় বছরে জিনি সূচকে কিছুটা অবনতি হয়েছে। এ সময়ে বৈষম্য কিছুটা বেড়ে দশমিক ৪৫ থেকে ৪৮-এ উঠে গেছে।

খাদ্য নিরাপত্তা ও সরবরাহে দক্ষ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নতি, কৃষির ভালো উৎপাদনশীলতা, বাজার ব্যবস্থার উন্নতি ও সমন্বিত বাজার ব্যবস্থা গ্রামীণ অর্থনীতিকে কেবল পুনরুজ্জীবিতই করেনি, বরং এসব বিষয়ে অসমতা নিরসনে বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০১৪ সালে পাঁচ বছরের নিচের বয়সী শিশুদের মধ্যে নির্দিষ্ট ওজনের চেয়ে কম ওজনের শিশুর হার কমে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে (মেয়ে শিশু ৩৩ দশমিক এক ও ছেলে শিশু ৩২ দশমিক দুই শতাংশ)। ১৯৯০ সালে খর্বকায় (স্ট্যান্টিং) শিশুর হার ছিল ৬৬ শতাংশ, ২০০৪ সালে ছিল ৫০ দশমিক ৬ শতাংশ। সে সময় থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে কমে এই হার ৩৬ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে।

দেশের প্রত্যাশিত আয়ুষ্কালেও ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে মানুষের গড় প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ৭১ দশমিক ছয় বছর। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির ওপর ২০১৫ সালে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, সাড়ে ৮২ শতাংশ শিশুকে সম্পূূর্ণভাবে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। ১৯৮৫ সালে এ হার ছিল মাত্র দুই শতাংশ। ১৯৮২ সালে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি হাজার শিশুর মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২১২ জন। ২০১৫ সালে তা নেমে আসে মাত্র ৩৬ জনে। সার্বিক জš§হারও কমে এসেছে। ১৯৭৫ সালে একজন নারীর বিপরীতে গড় শিশুর হার ছয় দশমিক তিনজন। ১৯৯১ সালে তা নেমে আসে চার দশমিক তিন জনে। আর ২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী নারীপ্রতি শিশুর হার দুই দশমিক একজন (সূত্র: নিপোর্ট, ২০১৬)। ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রাথমিকে ভর্তি এক দশমিক ছয়গুণ বৃদ্ধি হয়েছে। ওই সময় প্রতি ঘরে শিশুর সংখ্যা বেশি থাকা সত্ত্বেও মোট ভর্তি ছিল এক কোটি ১৯ লাখ। ২০১৫ সালে তা এক কোটি ৯০ লাখে উন্নীত হয়। এর মধ্যে ৫১ শতাংশই মেয়ে শিশু। এ অগ্রগতির হাত ধরে বৈশ্বিক জেন্ডার গ্যাপ সূচকেও বাংলাদেশের উন্নতি হয়েছে। ২০১৭ সালে ১৪৪ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭তম।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বড় ধরনের উল্লম্ফনের দ্বারপ্রান্তে। বর্তমানে সরকারের প্রধান লক্ষ্য ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ বিনিয়োগের মাধ্যমে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। তবে এর মূল লক্ষ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য হার আরও কমানো, যাতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী এর সুফল পেতে পারে। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা হবে বিভিন্ন পর্যায়ে সম্পদ সংহতকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও সব পর্যায়ে শাসনব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানোর মাধ্যমে। বর্তমানে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেশে বিরাজমান জনমিতির লভ্যাংশ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) দক্ষতার সঙ্গে সর্বোত্তম ব্যবহার করা। বর্তমানে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সর্বোত্তম পর্যায়ে রয়েছে। অবশ্য এটি খুব বড় সময় ধরে থাকবে না। কারণ সমাজে বয়স্কদের সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৫-১৬ পঞ্জিকাবর্ষে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত শ্রমশক্তি জরিপের প্রকাশিত ফলে দেখা যায়, দেশে ১৫ বছরের বেশি বয়সী ২৬ লাখ মানুষ বেকার। এতে বোঝা যায়, আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি এক বিরাটসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানের আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে।

আরেকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে ব্যবসায় বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের উদ্যোগ সত্ত্বেও জ্বালানি সরবরাহ ও সবার জন্য জ্বালানি প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাও এক বড় চ্যালেঞ্জ। ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জ্বালানি খাতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ দরকার। অন্যদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নগরায়ণ ঘটছে দ্রুতগতিতে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে, বাংলাদেশ সেগুলোর অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তন এ দেশের মানুষের জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া আরও একটি বড় উদ্বেগের বিষয় আমাদের অর্থনীতিতে বিরাজমান। তা হলো, আমাদের রফতানি গুটিকয়েক পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলে মুষ্টিমেয় পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা সার্বিক রফতানি খাতের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগী সক্ষমতাও এক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, যা বিনিয়োগ ও রফতানিকে প্রভাবিত করে। এক্ষেত্রেও বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। দক্ষতা উন্নয়ন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারের বিষয়। এটির উন্নতি সাধন করতে পারলে দেশের প্রবৃদ্ধি আরও জোরদার হওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক শ্রমবাজারেও কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। যদিও বৈষম্য সারা বিশ্বেই কোনো না কোনোভাবে বিরাজমান। তারপরও এটি নিয়ন্ত্রণ করা নৈতিক দায়িত্ব। সে অনুযায়ী কর্মপদ্ধতি নিতে হবে। আর এসডিজি অর্জনের বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভর করছে দৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতি ও ঐসকল প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিতের ওপর। অবশ্য এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

এমন পরিস্থিতিতে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হলে সরকারকে মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। বিশেষ করে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ ও প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। জ্ঞানভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চূড়ান্ত উন্নতি সাধনের জন্যই এটা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ব্যাপক হারে বেড়েছে। যদিও আমরা এখনও এ ক্ষেত্রে বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে পিছিয়ে। নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর জন্য প্রয়োজন নারীর জন্য সহায়ক কর্মপরিবেশ নিশ্চিতসহ সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি অন্যদের বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন প্রয়োজন।

অবকাঠামো উন্নয়নে ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ভুক্ত প্রকল্প নেওয়ার পাশাপাশি বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও অবকাঠামো খাতে আরও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি প্রবৃদ্ধি স্থায়ীভাবে বাড়বে দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ (সূত্র: রহমান ও খন্দকার, ২০১৬)। ২০২০ সাল নাগাদ আট শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে পৌঁছাতে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। কেবল স্থানীয় উৎস থেকে এ বিনিয়োগের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ পুরোদমে কার্যকর করতে হলে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজন। সাম্প্র্রতিক বছরগুলোয় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এফডিআই এসেছে ২৪৫ কোটি ডলার। যদিও ২০২০ সাল নাগাদ নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় এটি খুবই কম। ২০২০ সালে এফডিআই’র লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৯৬০ কোটি ডলার। এসব লক্ষ্য অর্জনে সরকারকে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর আরও জোর দিতে হবে। বিশ্বায়নের এ যুগে উন্নয়নের জন্য আমাদের অন্য দেশের সঙ্গে অংশীদারিত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি সবার সঙ্গে মৈত্রী প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এ লেখার অন্যতম উদ্দেশ্য সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বর্ণিত অগ্রাধিকারমূলক লক্ষ্যগুলোর অগ্রগতি সংক্ষেপে পর্যালোচনা ও আগামী দিনে এটির বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা। সে সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে এসডিজি বাস্তবায়নের সম্ভাব্য নির্দেশনা প্রদান। দক্ষতার সঙ্গে এসডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ এরই মধ্যে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যা এবারের বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের (বিডিএফ) বৈঠকে উন্নয়ন সহযোগীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে এটি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও সেসব মোবাবিলায় সম্ভাব্য উপায় কী হতে পারে তাও বিডিএফ সভায় তুলে ধরা হয়।

গত ১৭ ও ১৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে মোট আটটি প্রতিপাদ্য নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এসব অধিবেশনে সাম্প্র্রতিক বছরগুলোর উন্নয়ন ও এক্ষেত্রে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জগুলো বর্ণনা করা হয়। আলোচনার মধ্যে উঠে আসে গত বছরের মাঝামাঝি ঘটে যাওয়া অপ্রত্যাশিত বন্যার ফলে সৃষ্ট ফসলহানি এবং এর ফলে প্রধান খাদ্যপণ্য চালের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি। একই সঙ্গে এ বন্যার ফলে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি তিন শতাংশের নিচে নেমে যায়। বাংলাদেশের কৃষি ক্রমবর্ধমান হারে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে, যা কৃষি খাতকে আরও ভঙ্গুর করে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বাংলাদেশের মানুষের জীবিকা এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যার নির্মম শিকারে পরিণত হবে লাখ লাখ মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তনের এমন প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা (বিডিপি)-২১০০ শীর্ষক দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনার প্রতিপাদ্য দীর্ঘ মেয়াদে খাদ্য ও পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ, কার্যকরভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা অর্জন, জলবায়ু পরিবর্তন ও ব-দ্বীপসংক্রান্ত অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর উপযোগী সমন্বিত কৌশল নির্ধারণ ও পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা। ডেল্টা পরিকল্পনার লক্ষ্য জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন দিক চিহ্নিত করে তা সমাধান, পানিসম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও তহবিল সংহতকরণ। (চলবে)

 

লেখক: বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ও দারিদ্র্য বিমোচন বিষয়ে সরকারের ফোকাল পয়েন্ট

 

গত ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের বৈঠকে ইংরেজিতে উপস্থাপিত প্রধান প্রতিবেদন

ভাষান্তর: মাসুম বিল্লাহ