বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও এসডিজি বাস্তবায়ন

গতকালের পর

এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশের কর্মপরিকল্পনা সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সংগতি রেখে সরকার এসডিজি বাস্তবায়নে একটি ‘জাতীয় কর্মপরিকল্পনা’ প্রণয়ন করেছে। একই সঙ্গে অভীষ্ট ও লক্ষ্যগুলো অর্জনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে এ পরিকল্পনা ভাগাভাগি করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকার এসডিজি অর্জনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে একটি পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন কাঠামো চূড়ান্ত করেছে। এ কাঠামোটি হবে একটি ওয়েবভিত্তিক উপাত্ত ভাণ্ডার পদ্ধতি। যার মাধ্যমে উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও রিপোর্ট করার কার্যক্রম ত্বরান্বিত হবে।
আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ
সম্পদ সংহতকরণ: বিদ্যমান গতানুগতিক অর্থায়ন এসডিজি অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়। সে জন্য সরকারের উচিত হবে রাষ্ট্রীয়, ব্যক্তি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থ বিনিয়োগের যুগোপযোগী এবং উদ্ভাবনী পথ বাতলে দেওয়া। এর সঙ্গে প্রয়োজন প্রাপ্ত সম্পদের কার্যকর ও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা। অন্যদিকে ২০২০ সাল নাগাদ সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গড়ে জিডিপির ৩৪ দশমিক চার শতাংশ বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে কেবল বেসরকারি খাত থেকে আসতে হবে ২৬ দশমিক ছয় শতাংশ। আর ব-দ্বীপ পরিকল্পনা (ডেল্টা প্ল্যান) অনুযায়ী কেবল জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ ও পানি-সংক্রান্ত প্রকল্পে ২০২০ সাল নাগাদ বিনিয়োগ দরকার হবে জিডিপির এক দশমিক আট শতাংশ। এসব বিষয় অর্জনে যে পরিমাণ সম্পদ দরকার এবং বর্তমানে যে সম্পদ আছেÑএ দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। পানি-সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোয় বর্তমানে সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র দশমিক আট শতাংশ, যা খুবই অপর্যাপ্ত।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি: বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেশ দ্রুতগতিতেই বাড়ছে। ১৯৯০ সালে মোট জনসংখ্যা ছিল ১০ কোটি ৮০ লাখ। ২০১৬ সালে এসে তা ১৬ কোটি হয়েছে। ২০৫০ সাল নাগাদ এ জনসংখ্যা ২০ কোটি ছাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষি উৎপাদনে দ্রুতগতির প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। কিন্তু ফসল খাতে প্রবৃদ্ধির হার ক্রমহ্রাসমান। আর কৃষি উৎপাদন বাড়াতে গেলে তা অপরিহার্যভাবে মানব উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের প্রাপ্যতা ও পরিবেশের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ: নগরে বসবাসকারী জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ১৯৯০ সালে যেখানে মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করত, ২০১৬ সালে তা ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়। ২০৪০ সাল নাগাদ শহরে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা গ্রামে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যার বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রাম থেকে মানুষের শহরে স্থানান্তরিত হওয়া এবং অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর ফলে প্রয়োজনীয় খোলা জায়গার সংকট দেখা দিচ্ছে, যা দেশের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন: বাংলাদেশ ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হয়। এ দুর্যোগের ফলে প্রাণহানি, অবকাঠামো ও সম্পদহানির পাশাপাশি মানুষের জীবন-জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে যেসব মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, তারা বেশি সমস্যায় পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। দুর্যোগের ফলে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। জলবায়ু পরিবর্তন প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরও ঘনীভূত করবে, এরই মধ্যে যা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে।
সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার: কেবল সম্পদের সহজলভ্যতা এসডিজি বাস্তবায়নে সফলতা নিশ্চিত করতে পারবে না। পর্যাপ্ত সম্পদ থাকার চেয়েও এ ক্ষেত্রে বেশি ভূমিকা পালন করবে সম্পদের দক্ষ ও কার্যকর ব্যবহার। এ ক্ষেত্রে কী ধরনের সম্পদের দরকার হবে, সে বিষয়ে প্রাক্কলন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর সে সম্পদ কোন ধরনের জনগোষ্ঠীর জন্য কোন প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা উচিত, তাও নির্ধারণ করতে হবে।
দক্ষতা উন্নয়ন ও মানসম্মত শিক্ষা: ২০১৬ সালের শ্রমশক্তি জরিপের ফল অনুযায়ী বর্তমানে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণÑএর কোনো পর্যায়েই নেই। এতে প্রমাণ হয় যে, বিপুলসংখ্যক জনশক্তি অব্যবহƒত থেকে যাচ্ছে। যদি তাদের যথাযথ শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা যায়, তাহলে দেশের অর্থনীতির পুরো চিত্রই পাল্টে যাবে। এটা করা সম্ভব হলে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার গুণগত মান একটি বড় শঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ: বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০১৭ সালের ‘গ্লোবাল কম্পিটিটিভনেস রিপোর্ট’ অনুসারে ব্যবসায় প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ১০০ দেশের মধ্যে স্থান করে নিতে পেরেছে। বর্তমানে এ সূচকে ১৩৭ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৯তম। যদিও এখনও ব্যবসা করার ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা দুর্নীতি। তবে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে বাংলাদেশ বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কার্যক্রম সর্বোচ্চ গতিতে অব্যাহত রেখেছে।
শাসনব্যবস্থায় চ্যালেঞ্জ: দারিদ্র্যবান্ধব ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতে শাসনব্যবস্থার উন্নয়নের বিকল্প নেই। যদিও বাংলাদেশ এরই মধ্যে শাসন সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, তথাপি এ ক্ষেত্রে আরও উন্নতি প্রয়োজন। বিশেষ করে সরকারি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেবা সরবরাহ, পরিবহন, আইন প্রয়োগ, বিচার ব্যবস্থা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, কর ও শুল্ক দফতরের মতো প্রতিষ্ঠানে সুশাসন নিশ্চিত অত্যন্ত জটিল ও আপেক্ষিক ব্যাপার। কারণ এসব দফতরে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয় বলে ধারণা প্রচলিত আছে। শাসনব্যবস্থায় উন্নতির ক্ষেত্রে এসব চ্যালেঞ্জ উত্তরণের একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে ডিজিটাল পদ্ধতির প্রবর্তন।
সামাজিক অসমতা ও আঞ্চলিক বৈষম্য নিয়ন্ত্রণ: ২০১৬ সালের এইচআইইএস প্রতিবেদন অনুসারে আয়ের দিক থেকে সমাজের সর্বনি¤œ পর্যায়ের পাঁচ শতাংশেরও বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। মোট জাতীয় আয়ে ২০১০ সালে এ জনগোষ্ঠীর অংশ ছিল দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা আরও কমে দশমিক ২৩ শতাংশে নেমে যায়। এর বিপরীতে সর্বোচ্চ আয়ের মানুষের আয় আরও বেড়েছে। এ অসাম্যের বিষয়গুলো সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে। তা না হলে সামাজিক অস্থিরতা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আরও বেশি প্রান্তিকীকরণ হবে। পাশাপাশি কিছু জেলায় দারিদ্র্য চরমভাবে কেন্দ্রীভূতসহ বৈষম্য প্রকট হচ্ছে। কুড়িগ্রামে মোট জনসংখ্যার ৭০ দশমিক আট শতাংশই এখনও উচ্চ দারিদ্র্যসীমার মধ্যে রয়েছে। দিনাজপুরে এ হার ৬৪ দশমিক তিন ও বান্দরবানে ৬৩ দশমিক দুই শতাংশ। অন্যদিকে এ পরিস্থিতির ঠিক উল্টো চিত্র নারায়ণগঞ্জে। সেখানে দারিদ্র্যের হার মাত্র দুই দশমিক ছয় শতাংশ। আর সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ২০১৭ সালে জাতীয়ভাবে গড় দারিদ্র্য হার প্রাক্কলন করা হয়েছে ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
অগ্রগতির উপায়গুলো
মানব উন্নয়নে বিনিয়োগ: গত শতকের আশি ও নব্বইয়ের দশকে নারী শিক্ষা, টিকাদান কর্মসূচি, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা ও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক ফল দিয়েছে, যার স্বীকৃতি পাওয়া গেছে এমডিজি অর্জনে। এ বিবেচনায় মানব উন্নয়নে বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। বিশেষ করে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা এবং ঐচ্ছিক লক্ষ্য হিসেবে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। টেকসই উন্নয়ন ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় এর বিকল্প নেই।
অবকাঠামোগত ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা: উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ। তাই ওই পর্যায়ের দেশগুলোর মতো অবকাঠামো প্রস্তুত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অবকাঠামো, পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে মনোযোগ দিতে হবে। প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখা ও নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে এটি প্রয়োজন।
গুণগত শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ: বাংলাদেশের জন্য পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। শ্রমশক্তি জরিপের ফল অনুযায়ী, সাক্ষরতার হার বেশি থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। মোট বেকারের ৯ শতাংশই এ শ্রেণির। এছাড়া আমাদের বাজেটে গবেষণা ক্ষেত্রে খুবই কম বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা মোট জিডিপির এক শতাংশেরও কম। উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে সরকারকে অবশ্যই গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এসব কার্যক্রম যাতে ব্যক্তি খাতের জন্য সহায়ক হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
উদ্ভাবন, ডিজিটালকরণ ও ওয়ান স্টপ সেবাকেন্দ্র স্থাপন: মানব সভ্যতার আরও অগ্রগতি সাধনে বিশ্ব খুব দ্রুত প্রযুক্তিসংক্রান্ত নতুন উদ্ভাবন গ্রহণ করছে। এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে বহির্বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশকে প্রযুক্তির এসব নতুন উদ্ভাবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হবে। এতে করে বাণিজ্যসহ অন্যান্য খাতে যেসব বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ আছে, তা কাটিয়ে উঠতে পারবে বাংলাদেশ। আর ওয়ান স্টপ সেবাকেন্দ্র চালু হলে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন হবে, যা বাংলাদেশের প্রতিযোগী সক্ষমতা বাড়াবে। এরই মধ্যে জাতীয় সংসদে এ-সংক্রান্ত একটি বিল পাস হয়েছে। এসডিজির ১৭তম অভীষ্ট অনুযায়ী এখন বিভিন্ন প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীদের উচিত বাংলাদেশকে সহায়তা করা।
শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও শাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন: গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সুনীতি প্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রাষ্ট্রের জন্য বোঝাস্বরূপ। তাই উচ্চতর পেশাগত দক্ষতাসম্পন্ন মানুষদের দিয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ: অস্বীকার করার উপায় নেই যে, গত এক দশকে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। তারপরও এ হার এখনও অনেক কম। মাত্র ৩৬ শতাংশ নারী এখনো বিভিন্ন ধরনের কাজে নিয়োজিত। যেখানে বৈশ্বিক গড় ৪৯ শতাংশ। এটা খুব সহজেই অনুমেয় যে, বৈশ্বিক গড়ের সম পরিমাণ নারী শ্রমশক্তিও যদি কর্মে নিয়োগ করা যায়, তাহলে তা প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ, দারিদ্র্য দূরীকরণ, ক্ষমতায়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়তে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি, নিয়মতান্ত্রিক কর্মপরিবেশ ও শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের মতো প্রণোদনামূলক কার্যক্রম শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে সহায়ক হবে। কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষা কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে বৃত্তি চালু করার বিষয়টি অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
রপ্তানি বহুমুখীকরণ: বাংলাদেশের রপ্তানি কয়েকটি নির্দিষ্ট পণ্যের মধ্যে আটকে আছে। বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের নজরে আসা উচিত। রপ্তানি বহুমুখীকরণের বিষয় বেশ আগেই নজরে এসেছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সমাধান হয়নি। তবে বহুমুখীকরণ বিষয়টি সময়সাপেক্ষ। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহুমুখীকরণের ধারণায়ও পরিবর্তন আসে। তাই কোন সময়ের মধ্যে কী কী পণ্যের দিকে অগ্রসর হতে হবে, সে বিষয়ে ভাবার অবকাশ আছে। অনেক নবীন শিল্পকে সরকার দীর্ঘ সময় ধরে প্রণোদনা দিয়ে আসছে। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের বোঝা উচিত যে, কেবল সরকারি প্রণোদনা তাদের জন্য ভালো কিছু হতে পারে না। তাদের নিজেদের প্রতিযোগী সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া উচিত।
অসমতা দূরীকরণ: যদিও দেশে সার্বিক দারিদ্র্য হার কমেছে, তা সত্ত্বেও এখনও প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ মানুষ দরিদ্র। এদের মধ্যে ২ কোটি ১০ লাখ চরম দরিদ্র, যাদের দৈনিক রোজগার ১ দশমিক ৯০ ডলারের কম। আর্থিক সম্পদের প্রাপ্যতার সীমাবদ্ধতা, জনসম্পদে পরিণত না হতে পারা এবং প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়ের মতো বিষয় দারিদ্র্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। জিনি সূচকে আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে সূচকটি দশমিক ৪৮, যা বৈষম্যকে নির্দেশ করে। এসডিজির দশম অভীষ্ট অর্জন করতে হলে অবশ্যই অসমতা দূর করতে হবে। আয়ের ক্ষেত্রে নিচের দিকে অবস্থানকারী ৪০ শতাংশ মানুষের বার্ষিক আয় প্রবৃদ্ধির গড় হার সামষ্টিক জনসংখ্যার আয় প্রবৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি হতে হবে। অধিকন্তু অসমতা কেবল আয় দারিদ্র্যের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা কাম্য নয়। কে কতটা অর্থ উপার্জন করতে পারছে, কেবল সেই বিবেচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বহুমাত্রিক দারিদ্র্য চিহ্নিত করে তা মোকাবিলার সময় এসেছে।
উত্তর-দক্ষিণ, দক্ষিণ-দক্ষিণ ও ত্রিধারার সহযোগিতা: বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অংশীদারিত্বের সংস্কতি যে উন্নতি ভাগাভাগির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পারে, তার অনেক জ্বলন্ত প্রমাণ আছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন আঞ্চলিক জোটের বাইরে সরকারকে জিটুজিভিত্তিক অংশীদার সন্ধান করে সেখানে নতুন সম্ভাবনা খুঁজতে হবে। জিটুজি অংশীদার খোঁজার প্রচেষ্টা আমাদের অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ আরও জোরদার করতে পারে। জিটুজি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ২০১৭ সালে পিপিপিভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নের পদক্ষেপ সরকারের এটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এখন জনশক্তি নিয়োগের জন্য সরকারের উচিত বিজনেস টু বিজনেস উদ্যোগ শক্তিশালী করা।
পরিশেষে বলতে চাই, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, এসডিজি ও ব-দ্বীপ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন মোটা দাগে তিনটি বিষয়ের সমন্বয় সাধনের ওপর নির্ভর করছে। সেগুলো হলোÑসম্পদ সংহতকরণ, শাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সমাজের সব পক্ষের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারকরণ। উল্লিখিত পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়নে যে সম্পদ দরকার, তা সরবরাহের মাধ্যমেই সরকারের প্রচেষ্টা, উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং ব্যক্তি খাতের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি প্রতিফলিত হবে। এ সমন্বয়ের যদি কোনো বিচ্যুতি ঘটে, তাহলে তা বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভাবনা ও পরিকল্পনা দলিলগুলোয় যেসব লক্ষ্য অর্জনের কথা বলা হয়েছে, তা বিপন্ন হতে পারে। (শেষ)

লেখক: বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ও দারিদ্র্য বিমোচন বিষয়ে সরকারের ফোকাল পয়েন্ট

গত ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের বৈঠকে ইংরেজিতে উপস্থাপিত প্রধান প্রতিবেদন
ভাষান্তর: মাসুম বিল্লাহ