বাংলাদেশের মানবিক অবস্থান

গত মঙ্গলবার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী যে আবেগাপ্লুত বক্তব্য দিয়েছেন, সঙ্গত কারণেই তা গুরুত্বসহ প্রচার হয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। সেখানে দুর্গতদের উপযুক্ত ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলের কাছে এ ইস্যুর সুরাহা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী। ওই বক্তব্য রোহিঙ্গা ইস্যুতে তার সরকারের মানবিক অবস্থানকেই নির্দেশ করে। উদ্ভূত পরিস্থিতির একেবারে গোড়া থেকে ঘরছাড়া, নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদানের ব্যাপারে বাংলাদেশের মনোভাব ইতিবাচক। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতারা নির্দ্বিধায় কাজ করেছেন প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা মানুষগুলোর জন্য। শরণার্থীদের এক বড় অংশ শিশু ও নারী। দীর্ঘযাত্রায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তাদের অনেকে। এদের সেবা দিতে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা সেখানে সক্রিয়। তদুপরি প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন আশ্রিতদের সেবা-শুশ্রƒষার তদারকি করতে। আমরা প্রত্যাশা করি, এর অন্যথা হবে না। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি। তাতে এটা স্পষ্ট, আশ্রিত রোহিঙ্গারা যেন স্থানীয়ভাবে ‘শোষণে’র শিকার না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং তারা মিয়ানমারের নাগরিক ও একসময় নিজ দেশে সবাই ফিরে যাবেনÑএটা ধরে নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ দরকার। অভ্যন্তরীণ এ নীতি বাস্তবায়নে আমাদের জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ যতœবান হবে, এটাই প্রত্যাশিত।

প্রতিবেশী মিয়ানমারে সংখ্যালঘু আরাকানি অধিবাসীদের ওপর সম্প্রতি যা চলছে (এবং অতীতেও যা ঘটেছে), সেটিকে কোনোভাবেই জাতিগত দাঙ্গা বা নিছক নিপীড়ন বলা চলে না। একে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বলাই শ্রেয়। মাত্রাগত দিক থেকে পার্থক্য থাকলেও প্রকৃতিগত দিক থেকে এই রোহিঙ্গা নিধন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদি নিধন কিংবা তৎপরবর্তী সময়ে বসনিয়ায় সংঘটিত মুসলিম নিধন অভিন্ন। দুর্ভাগ্যজনক, এ ব্যাপারে মানব ইতিহাসে সবচেয়ে নির্যাতিত ইসরাইলের অধিবাসীরা নীরব এবং ঐকমত্যে পৌঁছতে পারছে না আন্তর্জাতিক মহল। অবশ্যই এক্ষেত্রে পরিস্থিতির জটিলতা অস্বীকার করা যাবে না। আবার রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকেও প্রাক-আরম্ভিক উসকানি থাকতে পারে। কিন্তু লাখ লাখ মানুষকে প্রাণের ভয় দেখিয়ে উচ্ছেদ কিংবা শুধু ধর্মের কারণে নিরপরাধ মানুষ হত্যা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। এদিকে কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে বলে যে খবর প্রকাশ হয়েছে, তা কতটুকু বস্তুনিষ্ঠ জানা নেই। অন্যদিকে ক্রমে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সহায়তার তুলনায়ও যেন বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে দেশটির নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব অং সান সুচির ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা। নিঃসন্দেহে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সুচির নিষ্ক্রিয়তা নিন্দনীয়। শান্তিতে কাদের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে বিশ্বজুড়ে। কিন্তু চলমান প্রেক্ষাপট সে বিতর্ক নিরসনের উত্তম সময় নয় বলেই আমরা মনে করি। এখন বরং দরকার মিয়ানমারে এথনিক ক্লিনজিং রোধ এবং বিষয়টির স্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা। রোহিঙ্গারা নিজ দেশে নির্যাতিত হবে এবং বাংলাদেশের কাজ হবে কেবল সেসব অসহায় মানুষকে আশ্রয় দেওয়া, তা কোনো নীতি হতে পারে না। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার বেশ কিছু দেশ আন্তরিকভাবে সরব বলে প্রতীয়মান। অথচ এ বিষয়ে চীন যেন কিছুই বলছে না; আর ভারত মাঝেমধ্যে যা বলছে, তাকে হতাশাজনক বলাই ভালো। প্রত্যাশা হচ্ছে, দ্রুত রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে সক্রিয় হবে অন্তত এ দুটি দেশ। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী গৃহীত বৈদেশিক নীতি বাস্তবায়নে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকবে বলে বিশ্বাস।