বাংলার ভেনিস

পর্যটকদের প্রিয় গন্তব্য রাঙামাটি। ঘুরে এসে এই শহর ও তার আশেপাশের বিস্তারিত জানাচ্ছেন মো. ইমরান হোসেন

ভ্রমণপ্রিয় মানুষ আমি। ঘুরে বেড়াতে ভীষণ পছন্দ করি। মনে হয় যেন নবজীবন পাই। হয়তো তাই প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য ছুটে বেড়াই দেশের আনাচেকানাচে। গিয়েছিলাম সাজেক ভ্যালি। হাতে সময় ছিল এক দিন। সময় নষ্ট না করে ওই দিন চলে যাই রাঙামাটি, চারদিকে উঁচু পাহাড় আর মাঝে সরু রাস্তা। দূর পাহাড়ের দু-একটা বাড়ি চোখে পড়ে। পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করেছেন বাসিন্দারা।

সবুজ অরণ্য ও লেকের শহর রাঙামাটি। তাই পাহাড়ের টানে ছুটে গিয়েছিলাম রাঙামাটির অপূর্ব সৌন্দর্য উপভোগ করতে। ইতালির ভেনিস শহরের সঙ্গে রাঙামাটির কিছুটা মিল রয়েছে। ভেনিসের চারদিকে পানি। এর মধ্যে মাথা উঁচু করে কংক্রিটের দালানগুলো দাঁড়িয়ে আছে। রাঙামাটি শহরটা অনেকটা এমনই। এর চারদিকে হ্রদ। হ্রদের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দালানগুলো। দেখে মনে হয় যেন বাংলার ভেনিস।

রাঙামাটিতে গিয়েছিলাম পাঁচ বন্ধু আমিসহ জাবেদ হোসেন শীতল, রাকিবুল হাসান, পারভেজ আবেদিন জিকু ও বনি আমিন রাফি। পরে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন আরও আট পর্যটক ফয়সাল আদনান, মিনহাজ হোসাইন, রোমান হোসেন, ইয়াকুব হোসেন, মুসা শিকদার, ফরহাদ আহমেদ, জয়নুল ইসলাম ও সাব্বির সরকার। তারাও সাজেক ভ্যালি থেকে রাঙামাটির সৌন্দর্য দেখার জন্য আমাদের সঙ্গী হয়েছিলেন। তারা কুমিল্লা থেকে বেড়াতে এসেছিলেন।

আমরা রাতে রাঙামাটি শহরে পৌঁছে স্থানীয় একটি হোটেলে উঠি। পর্যটকদের জন্য এখানকার হোটেলগুলো সব সময়ই খোলা রয়েছে। ফ্রেশ হয়ে রাতের

রাঙামাটি দেখার জন্য বেরিয়ে পড়ি। রাতে শহরটা ভীষণ নীরব। তবু পর্যটক আর স্থানীয় বাসিন্দারা মুখর করে রেখেছে শহরটিকে।

রাতেই ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা করলাম। এখানে ঘুরে বেড়ানোর জন্য ইঞ্জিনচালিত নৌকার বিকল্প নেই। সব হোটেলের সামনে নৌকার মালিকরা ভিড় জমান। বিভিন্ন সুবিধার কথা বলে পর্যটকদের নৌকায় ওঠানোর জন্য তারা মুখিয়ে থাকেন। আমরা দুই হাজার টাকায় একটি নৌকা ঠিক করলাম। সারা দিন ঘুরে বেড়াব ওই নৌকায় চড়ে।

পরদিন মোবাইলের অ্যালার্মে ঘুম ভাঙে। ঘুম থেকে উঠে জানালার পর্দা সরাতেই চোখে পড়ে অন্য রাঙামাটি শহর। রাতের চেয়ে সকালের চিত্রটা ভিন্ন। রাতে শহরটা ব্যস্ত না থাকলেও সকালের শহরটা অনেক ব্যস্ত। তবে যানজট নেই। ছোট ছেলেমেয়েরা বিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওনা দিচ্ছে। ছোটাছুটি করছে ইঞ্জিনচালিত অটোরিকশাগুলো।

সবাইকে ঘুম থেকে ওঠাই। সকালের খাবার সেরে রওনা দিলাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার উদ্দেশ্যে। ট্রলারে উঠলাম। কাপ্তাই লেকের ভেতর দিয়ে চলতে শুরু করেছে। বিশাল লেক এটি। পানি স্বচ্ছ কাচের মতো। এর পাশাপাশি সুভলং ঝরনা, নির্বাণ মন্দির, চাংপাই রেস্টুরেন্ট, মেজং, ঝুলন্ত ব্রিজ, বৌদ্ধ বিহার ও চাকমা রাজার বাড়ি ঘুরে বেড়াই সেদিন। ট্রলারে করে প্রথমে একটা বাজারে গেলাম। এখান থেকে পণ্য কিনে সবাই ছোট ছোট নৌকায় নিয়ে যায়। ট্রলার চলতে চলতে শহর থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। দূর থেকে শহরের বাড়িগুলো বেশি সুন্দর দেখায়। অনেকেই আবার কাঠের বাড়িও করেছে।

প্রথমে যাই নির্বাণ মন্দিরে। অনেক পুরোনো মন্দির এটা। এত বেশি পরিষ্কার যে নতুন মনে হয়। মন্দিরে একটি বিশাল মূর্তি রয়েছে। রোদের ঝলকানিতে জ্বলজ্বল করছে।

পরের গন্তব্য ছিল রাজার বাড়ি। কিছুক্ষণ ট্রলার চলার পর পৌঁছে যাই সেখানে। এখানে আসার পথে ছোট একটি কাপড়ের বাজার দেখতে পাবেন। এখানকার কাপড়ের দাম তুলনামূলক কম। আমরা এখান থেকে কয়েকটি গামছা, শাল ও চাদর কিনি। রাজবাড়িতে ১৭০০ সালের পুরোনো যুদ্ধের কামান দেখতে পাই। ঘোরাঘুরি করে আবার ট্রলারে ফিরি। এবারের গন্তব্য সুভলং ঝরনা। সুভলং নামে দুটি ঝরনা আছেÑএকটি অনেক বড়, অন্যটি ছোট। সুভলং ঝরনা অনেক দূরে। ট্রলার চলছে আর উপভোগ করছি সবুজ অরণ্যের দৃশ্য। পাহাড়গুলো বিশাল বিশাল পাথরের খণ্ড দিয়ে বেষ্টিত। পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ছে লেকের পানি। এখানকার মানুষের যাতায়াতের প্রধান বাহন নৌকা। প্রায় দুই ঘণ্টার বেশি ট্রলার চলার পর আমরা সুভলংয়ের বড় ঝরনার কাছে পৌঁছাই। এই ঝরনায় পানি কম, গোসলের জন্য উপযোগী নয়। আমরা ট্রলার থেকে না নেমে চলে যাই ছোট ঝরনায়। এখানে পানির কমতি নেই। ওপর থেকে পানি পড়ছে। এর সবই প্রাকৃতিক। ঝরনার পানিতে ভেজার লোভ সামলাতে

পারলাম না। নেমে পড়ি সবাই। এর আগে কখনও ঝরনায় গোসল করিনি, তাই উত্তেজনাটা একটু বেশিই ছিল। গোসল, ছবি তোলা সবই হলো একসঙ্গে। প্রায় এক ঘণ্টা পর ট্রলারে এসে কাপড় বদলে নিলাম।

আবার ট্রলারে যাত্রা শুরু করি। সূর্যটা আমাদের মাথার ওপর চলে এসেছে। পেটেও টান পড়েছে। তাই মেজং বা চাংপাই রেস্টুরেন্টের দিকে ছুটে চলি। জায়গা দুটো স্থানীয় খাবারের জন্য বিখ্যাত। এখানকার ঐতিহ্যবাহী খাবার ব্যাম্বু চিকেনের সঙ্গে ডাল ও ভর্তা দিয়ে দুপুরের খাবার সেরে নিই। খাবারগুলোর দাম তুলনামূলক ব্যয়বহুল। খাওয়া শেষে ঝুলন্ত ব্রিজ দেখার জন্য রওনা দিই। একদিকে ট্রলারের আওয়াজ, অন্যদিকে টানা তিন দিনের ভ্রমণ। কেউ কেউ ট্রলারের ভেতর ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঘণ্টাখানেক ট্রলার চলার পর ঝুলন্ত ব্রিজের কাছে পৌঁছালাম। ভাগ্য খারাপÑঝুলন্ত ব্রিজটি পানির নিচে ডুবে আছে। শুধু দু’পাশ থেকে দেখা যাচ্ছে। ইচ্ছা ছিল ঝুলন্ত ব্রিজে ওঠার, কিন্তু সব ইচ্ছা কি পূরণ হয়!

সূর্যটাও বিদায় নিয়েছে। পড়ন্ত বিকালে খুবই ক্লান্ত আমরা। ফিরতে হবে হোটেলে। উত্তেজনা ঝিমিয়ে গেছে। তবু এত সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছেড়ে যেতে মন চায় না। ইচ্ছা হয় উঁচু পাহাড়ে থেকে যাই দীর্ঘদিনের জন্য।

হোটেলে পৌঁছাই সন্ধ্যার দিকে। ফিরতি গাড়ি রাত সাড়ে ৮টায়। হাতে তখনও প্রায় দুই ঘণ্টা। দেরি না করে চলে গেলাম স্থানীয় বাজারে। বাজারের নাম বনরুপা। এখানে পর্যটকদের কাছ থেকে দাম বেশি রাখা হয়। ঘুরতে ঘুরতে বাস ছাড়ার সময় হয়ে যায়। চলে যাই রাঙামাটি বাসস্ট্যান্ডে।

বাসের সিটে বসলাম। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার। সরু রাস্তা দিয়ে বাস চলছে। ক্লান্ত মনে বসে আছি। পেছন থেকে মনে হচ্ছে পাহাড় যেন ডাকছে। জানি না এমন অপরূপ পরিবেশের সঙ্গে আবার কবে দেখা হবে।

 

যেভাবে যাবেন

যেখানে থাকবেন

রাজধানী থেকে বিভিন্ন পরিবহনের বাসে চড়ে যেতে পারবেন রাঙামাটি। বিভিন্ন পরিবহনের মধ্যে রয়েছে শ্যামলী, সোহাগ, ইউনিক, ডলফিন, এস আলম, হানিফ প্রভৃতি। জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৬৫০ টাকা। এখান থেকে রাঙামাটি যেতে চাইলে প্রথমে খাগড়াছড়ি বাস টার্মিনালে আসতে হবে। ভাড়া ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। এখান থেকে গাড়ি সকাল-বিকাল দুবার ছাড়ে। আরেকটি সিটিং সার্ভিস আছে, ভাড়া ২০০ টাকা।

একটু নিরিবিলি ভালো পরিবেশে থাকতে চাইলে উঠতে পারেন রাঙামাটির পর্যটন মোটেলগুলোয়। এখানে সিঙ্গেলের পাশাপাশি ডাবল রুমও রয়েছে। এসি রুমের জন্য ভাড়া গুনতে হবে দুই হাজার ২০০ টাকা। নন-এসি রুমের ভাড়া এক হাজার ৪০০ টাকা। দরদাম করে আরও কমেও পেতে পারেন।

বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কয়েকটি হোটেল রয়েছে। এর মধ্যে পৌরসভা কার্যালয়ের পাশে হোটেল সুফিয়া, দোয়েল চত্বরের হোটেল প্রিন্স, রিজার্ভ বাজারের গ্রিন ক্যাসেল, কলেজ গেটের মোটেল জর্জ কিংবা বনরূপার হোটেল নিডস হিল ও পুরাতন বাসস্টেশনে অবস্থিত হোটেল হিল প্যালেস উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি রয়েছে হোটেল ডায়মন্ড, হোটেল হাসান প্রভৃতি। এসব হোটেলে সিঙ্গেল রুমের ভাড়া ৫০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। নন-এসি ডাবল রুমের ভাড়া ৯০০ থেকে দুই হাজার টাকা। এর বাইরে মাঝারি মানের হোটেলের মধ্যে রয়েছে হোটেল ডিগনিটি, সমতা বোর্ডিং, হোটেল আনিকা, হোটেল আল-মোবা, হোটেল সৈকত প্রভৃতি।

নব দম্পতিদের জন্য রয়েছে পর্যটন কমপ্লেক্সের হানিমুন কটেজ। অনন্য শৈলীতে নির্মিত কটেজের এসি রুম ভাড়া ছয় হাজার টাকা, নন-এসি তিন হাজার ২০০ টাকা। ছুটির দিনে পর্যটক বেশি থাকার কারণে আগেভাগে বুকিং দেওয়া ভালো।

 

দেখার আছে অনেক কিছু

রাজবন বিহার

ঝুলন্ত ব্রিজ

রাজবাড়ি

শুভলং ঝরনা

রংরাং পাহাড়

বরকল বাজার

ফুরোমন পাহাড়

কাপ্তাই লেক

কাপ্তাই-রাঙামাটি সড়ক (নতুন)

নিরবান মন্দির

চাংপাই রেস্টুরেন্ট

মেজং

বৌদ্ধ বিহার

বনরুপা বাজার

ওয়াগ্গাছড়া চা-বাগান

কর্ণফুলী পেপার মিল

চন্দ্রঘোনা

রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্র

জলপথে বিলাইছড়ি

ছোটহরিনা

জুরাছড়ি

রাজস্থলী

কাট্টলি বিল

পাবলাখালী অভয়ারণ্য

লংগদু

সাজেক