বাংলার স্বপ্ন আজ মহাশূন্যে

যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণকে কেন্দ্র করে সর্বস্তরের মানুষের মনে যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা বজায় ছিল, সেটিকে অভূতপূর্ব বলা যায়। উৎক্ষেপণ ঘিরে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের মানুষ ছিল উৎসবমুখর। সমালোচকদেরও ক্ষীণস্বরে বলতে হয়েছে, গরিব এই দেশের জন্য প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার এ স্যাটেলাইটের কি খুব বেশি প্রয়োজন ছিল! বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের সুফল নিয়ে যারা এখনও সন্দিহান, তাদের জ্ঞাতার্থে বলা দরকার, এই স্যাটেলাইট থেকে প্রত্যক্ষভাবে তিন ধরনের সুফল মিলবে আমাদেরÑযদিও সুফলটি পেতে অর্থাৎ কক্ষপথে স্থিত হতে স্যাটেলাইটটির দু’তিন সপ্তাহ লেগে যাবে। সেগুলো হচ্ছেÑএক, এখন স্থানীয় টিভি চ্যানেলগুলোকে নির্ভর করতে হচ্ছে বিদেশের মালিকানাধীন স্যাটেলাইটের ওপর। এতে যে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে, তার সাশ্রয় হবে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটটির কল্যাণে। দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে সহজে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সেবা সম্প্রসারণের সুযোগ হবে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত। তৃতীয়ত, দুর্যোগ মোকাবিলা ও দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে বঙ্গবন্ধু-১। সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তাসহ অন্যান্য রুটিন ইস্যুর উল্লেখ এখানে না হয় উহ্যই থাকল।
খেয়াল করার বিষয়, আলোচ্য স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণের জন্য আমাদের অর্বিটাল সøট নিতে হয়েছে রাশিয়ার কাছ থেকে। মূল স্যাটেলাইট প্রস্তুত করেছে এক ফরাসি-ইতালিয়ান কোম্পানি; আর উৎক্ষেপণের জন্য সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের মহাকাশ স্বপ্ন পূরণে এই যে দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যক্ষ সহায়তা জুগিয়েছে এবং আরও যারা পাশে থেকেছে, তাদের সবার প্রতি থাকবে আমাদের কৃতজ্ঞতা। আর নিন্দুকদের জন্য বলতে হয়, ভারত যখন তার ‘মঙ্গলায়ন’ যানটি মঙ্গল গ্রহের উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপণ করেছিল, তখনও সমালোচনা হয়েছে এত কোটি রুপি ব্যয় করে মঙ্গল গ্রহের আবহাওয়া জানার দরকার কোথায়, যেখানে লাখ লাখ ভারতীয় মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত? সে সময় এক খ্যাতনামা ভারতীয় অর্থনীতিবিদ জবাব দিয়েছিলেন, এটা নিছক স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সবচেয়ে অভিজাত ক্লাবে প্রবেশের সুযোগ নয়; প্রকৃতপক্ষে এটা হচ্ছে আমাদের সক্ষমতার প্রমাণ। সুতরাং যত সমালোচনাই হোক সুফলগুলো একপাশে সরিয়ে রাখলেও স্বীকার করতে হবে, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট আমাদের বর্ধিত সক্ষমতার প্রমাণ।
যেকোনো স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সময় একটা ভয় থাকে, সেটা বিস্ফোরিত হয় কি না। প্রথম স্যাটেলাইট বলে আমাদের হয়তো তা আরও বেশি ছিল। সেজন্য বাংলাদেশের তরফ থেকে সতর্কতার যে কমতি ছিল না, সেটিও অনুমেয়। তবে দুর্ভাবনা আমাদের যতটা ছিল, উৎক্ষেপণকারী প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের তার চেয়ে বেশি বই কম ছিল না। কেননা প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়ে ফেলেছে, বঙ্গবন্ধু-১’কে বহনকারী ফ্যালকন ৯ ব্লক ৫ ক্যাটাগরির রকেটটি এ যাবৎকাল পর্যন্ত তাদের সবচেয়ে অত্যাধুনিক রকেট। সেজন্য আমরা যেভাবে বিটিভির মাধ্যমে উৎক্ষেপণ সম্প্র্রচার করেছিÑস্পেসএক্সের খোদ কর্ণধারও ওই কর্ম থেকে পিছিয়ে থাকেননি। তার মানে, উৎক্ষেপণটি নিয়ে কমতি ছিল না তাদের উৎসাহেরও। বিশ্ব মিডিয়ায়ও বাংলাদেশের এ উচ্চাভিলাষকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু-১’র সম্ভাব্য একটি ব্যবহার সম্পর্কেও মন্তব্য করা হয়েছে সেখানে। সেটি হলো, বাংলাদেশ এ স্যাটেলাইটের বাণিজ্যিক ব্যবহার প্রতিবেশী নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারে শুরু করতে পারে। এর মধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যু রয়েছে বিধায় মিয়ানমারের সঙ্গে বিষয়টি জটিল। তবে নেপাল, ভুটান নিয়ে তো ওই ধরনের জটিলতা নেই। এদিকে জানা মতে, বাংলাদেশ ফিলিপাইন কিংবা ইন্দোনেশিয়ায় খুঁঁজছে সম্ভাব্য বাজার। সেটি অব্যাহত থাকুক, আমরা তা-ই চাইব। এমন তাগিদও দেব, যাতে নেপাল, ভুটানের সঙ্গে স্যাটেলাইট বাণিজ্যের সম্ভাব্যতাটি অন্তত যাচাই করা হয়। সেটিই আমাদের জন্য বেশি সুবিধাজনক বলে প্রতীয়মান।
‘বঙ্গবন্ধু-১’ নামকরণই বলে দিচ্ছে, আমরা আরও স্যাটেলাইট পাঠাতে চাই মহাশূন্যে। এমন প্রত্যাশাও অনেকে ব্যক্ত করছেন যে, পরবর্তী স্যাটেলাইন যেন নিজেরা বানাতে পারি! এত দ্রুত সেটি না পারলেও আমরা যেন ইতোমধ্যে উৎক্ষেপিত স্যাটেলাইটটির কোনো সদ্ব্যবহারে পিছিয়ে না থাকি।