মত-বিশ্লেষণ

বাঙালির স্বাধীনতা

কাজী সালমা সুলতানা: ১৪ এপ্রিল, ১৯৭১। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রদত্ত এক ভাষণে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদ বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চল সফরের জন্য বিশ্বের সব বার্তাজীবী এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের প্রতি আমন্ত্রণ জানান। তিনি সব বন্ধুরাষ্ট্রের সরকার ও জনগণের এবং রেড ক্রসসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতি সরাসরি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানান।
এদিকে ঢাকায় মৌলভী ফরিদ আহমদের সভাপতিত্বে শান্তি কমিটির স্টিয়ারিং কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামকে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের চক্রান্ত আখ্যা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ধ্বংস করার শপথ ঘোষণা করে হানাদারদের সহযোগীরা।
এদিন সারা দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বিমান হামলা চালায়। আশুগঞ্জেও পাকিস্তানি বাহিনী বিমান আক্রমণ করে। এই আক্রমণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বহু নিরীহ মানুষ ও মুক্তিকামী বাঙালি সৈন্য মৃত্যুবরণ করে।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি ব্রিগেড কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে অগ্রসর হয়। পাকিস্তানি বাহিনী উজানিসার ব্রিজের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের কাছাকাছি এলে মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপক আক্রমণ চালায়। এ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর একজন অফিসারসহ ১৭৩ জন সৈন্য নিহত হয়।
এদিন মধুপুর গড়ে মুক্তিবাহিনী ও পাকবাহিনীর মধ্যে সারা দিন ধরে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে আধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রাণ বাঁচাতে পিছু হটে কালিহাতী ও ঘাটাইল অঞ্চলে অবস্থান নেয়।
এদিকে প্রথম রেজিমেন্ট চৌগাছা থেকে সদর দফতর তুলে নিয়ে বেনাপোলের ৩ মাইল পূর্বদিকে কাগজপুকুর গ্রামে স্থাপন করে এবং যশোর বেনাপোল রাস্তার দুই ধারে প্রতিরক্ষা ব্যূহ গড়ে তোলে।
দিনাজপুরের খানসামা এলাকায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর নীলফামারী থেকে আসা পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ চালায়। পাকিস্তানি বাহিনীর হঠাৎ আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা বিচ্ছিন্নভাবে পিছু হটে।
ঠাকুরগাঁও পঞ্চগড় এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ব্যূহতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আক্রমণ করে এবং আগুনে বোমার সাহায্যে পঞ্চগড় শহরকে সম্পূর্ণরূপে জ্বালিয়ে দেয়। মুক্তিযোদ্ধারা শহর ছেড়ে অমরখানায় প্রতিরোধ অবস্থান গ্রহণ করে।
এদিন সকাল ৯টায় পাকিস্তানি বাহিনী কুড়িগ্রামের খলিলগঞ্জ এসে জেলখানার উত্তরে অবস্থান গ্রহণ করে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী জেল অফিসে কর্মরত হেড ক্লার্ক ও সিপাইসহ পাঁচজনকে গুলি করে হত্যা করে।
রাজশাহী শহরের লক্ষ্মীপুর গার্লস স্কুলের সামনে পাকিস্তানি সৈন্যরা মোশারফ হোসেন সন্টুসহ ৩০ জনকে ধরে নিয়ে আসে। এদের মধ্য থেকে মঈনউদ্দিন আহমদ মানিক, আশরাফ হোসেন রতন ও মাসুদ রানা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দৌড়ে পালায়। বাকি সবাইকে পাকিস্তানি হানাদাররা গুলি করে হত্যা করে। সৌভাগ্যক্রমে মোশারফ হোসেন সন্টু লাশের নিচে চাপা পড়ে আহত অবস্থায় বেঁচে যান।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সান্তাহার পৌঁছালে বিহারিরা হানাদারদের সঙ্গে মিলিত হয়ে আশপাশের গ্রামগুলো ঘেরাও করে এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অগণিত মানুষকে হত্যা করে। এ হত্যাযজ্ঞ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘সান্তাহার গণহত্যা’ নামে পরিচিত।
পাকিস্তানি বাহিনীর দুটি কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধাদের রাজারহাট ও কুলারহাট অবস্থানের ওপর ব্যাপক আক্রমণ চালায়। এ সংঘর্ষে মুক্তিযোদ্ধারা স্থান দুটি ছেড়ে দিয়ে পিছু হটে।
রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এলাকায় ক্যাপ্টেন আফতাব কাদেরের নেতৃত্বে একটি কোম্পানি, বুড়িঘাট ও রাঙামাটির মধ্যস্থলে একটি কোম্পানি নিয়ে ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান, রাঙামাটি ও বরফকলের মধ্যস্থলে লে. মাহফুজ একটি কোম্পানি নিয়ে এবং কুতুবছড়ি এলাকায় সুবেদার মুতালেব একটি কোম্পানি নিয়ে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় এদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনী প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে পাকিস্তানিদের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধারা কসবা পুনর্দখল করে নেয়। মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে পাকশী সেতুর কাছে তীব্র সংঘর্ষ হয়।
এদিন নিউইয়র্ক টাইমসে লেখা হয়, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার মতো শহরে সম্ভবত ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মানুষ অবস্থান করছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সামরিক আক্রমণে যারা বেঁচে গেছেন তারা প্রায় সবাই প্রতিরোধকারীদের দলে যোগ দিয়েছেন।

তথ্যসূত্র: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও তৎকালীন সংবাদপত্র

সর্বশেষ..