কৃষি কৃষ্টি

বাঙ্গির চাষাবাদ

বাঙ্গি চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন কৃষক। আজ থাকছে এর বিভিন্ন দিক নিয়ে বাঙ্গির চাষাবাদ।

গ্রীষ্মকালীন ফল বাঙ্গি। প্রচণ্ড গরমে বাঙ্গি প্রাণে এনে দেয় স্বস্তি। গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকায় বাঙ্গি জন্মে। শরীর ঠাণ্ডা রাখতে তরমুজের পর বাঙ্গি দ্বিতীয় তালিকায় রয়েছে। বাঙ্গিগাছ দেখতে অনেকটা শসা গাছের মতো, লতানো।
অনেকে কাঁচা বাঙ্গি সবজি হিসেবে রান্না করে খেয়ে থাকে। ফল পাকলে হলুদ রঙ ধারণ করে। বাঙ্গি মূলত পাকা ফলের সুমিষ্ট সৌরভের কারণে বিখ্যাত। একটু বেশি পেকে গেলে বাঙ্গি ফেটে যায়। তাই অধিকাংশ বাঙ্গিকে ফাটা দেখতে পাওয়া যায়। ফলের ওজন এক থেকে চার কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এটি চাষের খরচ তুলনামূলক কম, আয় বেশি। তাই চাষিরা বাঙ্গি চাষে বেশ আগ্রহী।
জাত: বাংলাদেশে প্রধানত দুই জাতের বাঙ্গি দেখা যায়। বেলে ও এঁটেল বাঙ্গি। বেলে বাঙ্গির শাঁস নরম। খোসা খুব পাতলা, শাঁস খেতে বালি বালি লাগে। তেমন মিষ্টি নয়। অন্যদিকে এঁটেল বাঙ্গির শাঁস কচকচে, একটু শক্ত ও তুলনামূলক বেশি মিষ্টি।
এর বাইরে আরও এক ধরনের বাঙ্গি রয়েছে। বাঙ্গি সাধারণত লম্বাটে হলেও এটি গোলাকার মিষ্টি কুমড়ার মতো দেখতে। এ প্রজাতির বাঙ্গির নাম চীনা বাঙ্গি।
জলবায়ু ও মাটি: বাঙ্গি চাষের জন্য শুষ্ক ও উষ্ণ জলবায়ু সবচেয়ে উপযোগী। উর্বর বেলে দোআঁশ ও পলি মাটি বাঙ্গি চাষের জন্য সর্বোত্তম। যেহেতু শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টি বাঙ্গি চাষের জন্য উপযোগী নয়, সেহেতু বর্ষাকালে এ ফল চাষ করা যাবে না।
চারা রোপণ: জমিতে আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে বাঙ্গি চাষের জন্য জমি উপযুক্ত করে নিতে হবে। জাত ভেদে বাংলা সনের কার্তিকের মাঝামাঝি অর্থাৎ নভেম্বরে বপন করা হয় বাঙ্গির বীজ। আড়াই থেকে তিন মাসের মধ্যে গাছে ফল ধরতে শুরু করে। মাঘের শেষ অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির শেষে ফলের দেখা মিলে। প্রায় পাঁচ ফুট থেকে ৬ দশমিক ৬৭ ফুট অন্তর মাদা তৈরি করতে হবে। মাদা অবশ্যই চওড়া ও গভীর হতে হবে। প্রতি মাদায় চার থেকে পাঁচটি বীজ বপন সম্ভব। বীজ থেকে চারা গজানোর পর সুস্থ দুই-তিনটি গাছ রেখে বাকিগুলো তুলে ফেলতে হয়। যেহেতু বাঙ্গি গাছ লতানোভাবে বেড়ে উঠে, তাই ঘন গাছ না রেখে পাতলা রাখতে হবে। এ গাছের আয়ুষ্কাল খুবই কম। ফল ধরার দেড় থেকে দুই মাস পর্যন্ত ক্ষেত থেকে বাঙ্গি তোলা যায়।

রোগবালাই ও প্রতিকার হোয়াইট মোল্ড রোগ
বাঙ্গি সবচেয়ে বেশি যে রোগে আক্রান্ত হয় সেটি হোয়াইট মোল্ড। ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগটি হয়। এতে বাঙ্গির গায়ে সাদা তুলার মতো ছোপ ছোপ দাগ হয়। এতে আক্রান্ত হলে ফলটি পচে যায়
ব্যবস্থাপনা: প্লাবন সেচের পরিবর্তে স্প্রিংলার সেচ দিতে হবে। আক্রান্ত ফল দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। ফলের নিচে খড় বা পলিথিন বিছাতে হবে, যাতে ফল মাটির সংস্পর্শ না আসে। প্রপিকোনাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন পরপর তিনবার শেষ বিকালে স্প্রে করতে হবে। স্প্রে করার ১৫ দিনের মধ্যে সেই ফল খাওয়া বা বিক্রি করা যাবে না

কাঁঠাল পোকা
কাঁঠাল পোকা বাঙ্গি গাছের পাতা খেয়ে ঝাঁজরা করে ফেলে। ধীরে ধীরে পাতা শুকিয়ে ঝরে পড়ে
ব্যবস্থাপনা: ক্ষেত পরিষ্কার রাখতে হবে। গাছে পরিমাণ মতো ছাই ছিটাতে হবে। পাতায় এ পোকা খুঁজে বের করে মেরে ফেলতে হবে। অধিকাংশ পাতায় এ পোকা দ্বারা আক্রান্ত হলে কৃষি অধিদফতরের পরামর্শ অনুযায়ী ছত্রাক নাশক স্প্রে করতে হবে

থ্রিপস পোকা
থ্রিপস পোকা গাছের কচি পাতা ও ডগার রস শুষে খেয়ে গাছকে দুর্বল করে ফেলে। ফুল ও কচি ফলে আক্রমণের কারণে ফলে দাগ হয়। এরপর দাগের জায়গাগুলো পচতে শুরু করে
প্রতিকার: প্রতিকারের জন্য তামাক ও সাবানের গুঁড়োর সঙ্গে নিমের পাতার নির্যাস পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। সুষম সার ব্যবহার করতে হবে

ব্ল্যাক রট রোগ
আক্রান্ত পাতায় হালকা বাদামি থেকে ধূসর ছাই রঙের দাগ দেখা যায়। ধীরে ধীরে এ দাগ বড় হয়। পাতার শিরায় যখন এ রোগ আক্রমণ করে তখন ইংরেজি ‘ভি’ আকৃতি ধারণ করে
প্রতিকার: আক্রান্ত গাছের অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট করতে হবে। রিডোমিল গোল্ড প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করলে এ রোগ আক্রমণের আর সম্ভাবনা থাকে না

লিফ কার্ল রোগ
এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সাদা মাছি দ্বারা এ ভাইরাস ছড়ায়। আক্রান্ত গাছ খর্বাকৃতি হয়। পাতার গায়ে ঢেউয়ের মতো ভাঁজের সৃষ্টি হয় ও কুঁচকে যায়। অতিরিক্ত শাখা-প্রশাখা বের হয়। ফুল-ফল হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে গাছ।

উৎপাদনে চাষির সফলতা

বাঙ্গি একটি অর্থকরী ফসল। কিছুদিন আগেও চাষিরা বাঙ্গি চাষে ব্যস্ত সময় পার করেছে। এখন বাজারে কেনা-বেচার ধুম পড়েছে। ভালো ফলন ও ব্যাপক চাহিদা থাকায় প্রতি বছর বাঙ্গিচাষির সংখ্যা বাড়ছে। স্বল্প ব্যয়ে যেমন চাষ করা যায়, তেমনি স্বল্প দামেও বাঙ্গি কেনা যায়। তাই দেশের বিভিন্ন স্থান ও মানুষের কাছে বাঙ্গি বেশ প্রিয়।
চাষিরা তুলনামূলক কম পুঁজিতে বেশি মুনাফার আশায় বাঙ্গি চাষে আগ্রহী হচ্ছে। তাছাড়া অন্যান্য দেশের তুলনায় এ দেশের কৃষিজমি ও আবহাওয়া বাঙ্গি চাষের জন্য উপযোগী। তাই এ ফল চাষ করে ভাগ্যের চাকা বদলে ফেলছে চাষিরা।
স্বাদ, গন্ধ ও পুষ্টিতে অতুলনীয় বাঙ্গি। এ কারণে এর বেশ চাহিদা রয়েছে। জমি থেকে বাঙ্গি উত্তোলন করে বাজারে আনতে না আনতেই অনেক খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ী ফলটি কিনে থাকেন। সংগত কারণে চাষিদের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। দাম কম হওয়ায় বিক্রি হয় বেশি। তাই শত শত চাষি বাঙ্গি চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক চাষি বাঙ্গি চাষ করে আর্থিকভাবে সফল হয়েছে।
ভালো ফলনের জন্য জমিতে নিয়মিত পানি, ডিআইবি, টিএসপি ও পটাস সার এবং পোকামাকড় মারার জন্য কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কৃষিবিদরা। বর্তমানে একই জমিতে বাঙ্গিসহ তিন ধরনের ফসল উৎপাদন করতে পারছে চাষিরা।
চাষিদের কাছ থেকে জানা যায়, বাঙ্গি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতি বছরই উৎপন্ন হয়। বাঙ্গির সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছেএ ফল পাকানোর জন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়ে না। সময়মতো এ ফল নিজে থেকেই পেকে ফেটে যায়। এতে সুগন্ধ ছড়ায় বলে চাহিদা বেড়ে যায়। চাষের ব্যাপক প্রসার ঘটানোর জন্য কৃষি বিভাগ থেকে চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হয়।

পুষ্টিগুণে ভরা
বাঙ্গি স্বাস্থ্য উপকারী একটি ফল। জেনে নেওয়া যাক বাঙ্গির পুষ্টিগুণ
# বাঙ্গিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফলিক এসিড, যা রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে। তাই মানবদেহ, বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের জন্য বাঙ্গি বিশেষ উপকারী
 # বাঙ্গিতে কোনো চর্বি নেই। দেহের অতিরিক্ত ওজন নিয়ে যারা দুশ্চিন্তায় ভুগছেন তারা এ ফলটি খেতে পারেন নির্দ্বিধায়। দেহের ওজন কমানো ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বাঙ্গি অতুলনীয়
# এতে রয়েছে উচ্চমাত্রার বিটা ক্যারোটিন ও ভিটামিন সি। এ দুই উপাদান শরীরের ক্ষত দ্রুত সারাতে সাহায্য করে
# এ ফলে চিনির পরিমাণ কম। তাই ডায়াবেটিস রোগীরাও খেতে পারেন স্বাচ্ছন্দ্যে
# প্রচুর পরিমাণে পানি রয়েছে বাঙ্গিতে। তাই গরমে শরীরের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে নিয়মিত খেতে পারেন
# বাঙ্গিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য আঁশ, যা হজমশক্তি বৃদ্ধি করে
# গরম ও অতিরিক্ত রোদের জন্য হয় সানবার্ন, সামার বয়েল, হিট হাইপার পাইরেক্সিয়া প্রভৃতি। বাঙ্গির রস এসব রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে
# এসিডিটি, আলসার, নিদ্রাহীনতা, ক্ষুধামান্দ্য, নারীদের হাড়ের ভঙ্গুরতা রোধ করতে সাহায্য করে বাঙ্গি। পুরুষের হাড়ও মজবুত করে
# মনের অবসাদ দূর করার ক্ষমতা রয়েছে এ ফলের
# ত্বকে বয়সের ছাপ ও ত্বক কুচকে যাওয়া প্রতিরোধ করে। বাঙ্গি থেতো করে মধুর সঙ্গে মিশিয়ে ত্বকে লাগিয়ে রাখলে ত্বক উজ্জ্বল সুন্দর হয়
# ব্রণ কিংবা একজিমার সমস্যায় যারা ভুগে থাকেন তাদের জন্য বাঙ্গি অনেক উপকারী। ব্লেন্ডারে ভালো করে ব্লেন্ড করে পাতলা কাপড়ে ছেঁকে রসটুকু বের করে নিন। এ রস আপনি লোশনের মতো ব্যবহার করতে পারলে ব্রণ ও একজিমা থেকে রক্ষা পাবেন
স ভিটামিন ‘বি’ এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ইন্সনিটোল, যা নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে ও চুল পড়া রোধ করে। এ উপাদানটি বাঙ্গিতে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। নিয়মিত বাঙ্গি খেলে চুলের স্বাস্থ্য হয় উজ্জ্বল ও সুন্দর।

উৎপাদনে শীর্ষ ১০ দেশ

ফুটি বা বাঙ্গি খাবার হয়ে ওঠার ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা যায়নি। ইতিহাসবিদদের মতে, তরমুজ-গোত্রীয় এ ফলের আদিনিবাস আফ্রিকা। অনেকের মতে, ভারত কিংবা চীন থেকে ফলটি আফ্রিকায় নেওয়া হয়। ২০১৪ সালে এক হিসাব অনুযায়ী, বাঙ্গি উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের তালিকা দেখে নিতে পারেন
চীন: ১৭,৫০০,০০০ টন
ইরান: ১,৪৫০,০০০ টন
তুরস্ক: ১,৭০৮,৪১৫ টন
মিসর: ১,০০৭,৮৪৫ টন
ভারত: ১,০০০,০০০ টন
যুক্তরাষ্ট্র: ৯২৫,০৬০ টন
স্পেন: ৮৭০,৯০০ টন
মরক্কো: ৭১৭১,৬০২ টন
ব্রাজিল: ৫৭৫,৩৮৬ টন
মেক্সিকো: ৫৭৪,৯৭৬ টন।

সর্বশেষ..