বাজারের ওপর সুদহারের প্রভাব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিন

ড. আর এম দেবনাথ: এ মুহূর্তে দেশে সবচেয়ে প্রভাবশালী কাজের লোক হচ্ছে কোমলমতি ছাত্রছাত্রী এবং ব্যাংকের মালিকরা। ছাত্রছাত্রীরা নানা দাবি নিয়ে রাস্তায় নামছে আর সরকার তাদের ক্ষমতা আঁচ করতে পেরে সব দাবি মেনে নিচ্ছে। এসব দাবির অনেকগুলোই ন্যায্য। যেমন রাস্তায় নিরাপত্তা, পথচারীদের নিরাপত্তা। বহুদিন ধরেই বেপরোয়া ড্রাইভারদের কারণে পথচারী মারা যাচ্ছে, ছাত্রছাত্রীরা মারা যাচ্ছে। এগুলোর কোনো বিচার নেই। কারণ ড্রাইভার, পরিবহন শ্রমিক ও পরিবহন মালিকরা খুবই সংগঠিত আর ক্ষমতাধর। তাদের কেউ কিছু করতে পারে না। একমাত্র দেখা যাচ্ছে এবার ছাত্রছাত্রীরা পারল। তারা সংগঠিত না হলেও সংখ্যায় হাজার হাজার এবং সারা দেশে। অন্যদিকে তারা পেরেছে ‘কোটা’র আন্দোলনে গতি আনতে। সরকারি চাকরিতে ‘কোটা’ ব্যবস্থা এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে। ছাত্রছাত্রীদের এসব আন্দোলনের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের সরাসরি সংযোগ নেই। তবে এর পরোক্ষ ফল আছে। দোকানে কেনা-বেচা কমে। মানুষ ভোগান্তির কারণে ঘর থেকে বের হয় কম। এসবের প্রতিক্রিয়া-প্রভাব পড়ে ব্যবসায়। কিন্তু ব্যাংক মালিকরা যেসব দাবি করছেন এবং যা সরকারের কাছ থেকে আদায়ও করে নিচ্ছেন, তার প্রভাব সরাসরি পড়ে ব্যাংক-বাজারে, অর্থনীতিতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে। যেমন সর্বশেষ খবরের কাগজে দেখলাম, ব্যাংক মালিক ও এর প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী একটা সভা করছেন বৃহস্পতিবার (২ আগস্ট)। এ সভার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সব কাগজে শুক্রবার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। একটি রিপোর্টে বলা হচ্ছে: ‘সব ব্যাংককে বাধ্যতামূলকভাবে ঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ, আমানতের ক্ষেত্রে ৬ শতাংশ সুদ মানতে হবে। যেসব ব্যাংক এখনও এটি কার্যকর করেনি, সেগুলোকে আগামী ৯ আগস্ট থেকে অবশ্যই কার্যকর করতে হবে। এটি সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য’। রিপোর্টে বলা হয়েছে, অর্থমন্ত্রী সভাশেষে তা-ই বলেছেন। এর আগে ব্যাংক মালিকরা বেশ কয়েকটা দাবি আদায় করে নিয়েছেন। তারা নিজেদের করপোরেট ট্যাক্স কমিয়ে নিয়েছেন। আর সেটি করা হয়েছে বাজেটে। আড়াই শতাংশ কর রেয়াত তারা পেয়েছেন। এ সুবিধা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক এবং নতুন অ-তালিকাভুক্ত ব্যাংকও পাবে। আগে বোর্ডে একজন পরিচালক ৬ বছর একনাগাড়ে থাকতে পারতেন। এখন তারা থাকবেন ৯ বছর। এক পরিবারের দুইজনের বেশি ব্যাংকের বোর্ডে থাকতে পারত না। এখন থাকতে পারবে চারজন। প্রত্যেক ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তাদের আমানতের একটা অংশ নগদে রাখতে হয়। এর নাম ক্যাশ রিজার্ভ রিকোয়ারমেন্ট (সিআরআর)। সেটি কমানো হয়েছে এক শতাংশ। এর অর্থ, তাদের ‘তারল্য’ (লিকুইডিটি) বাড়ল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যে সুদহারে বাণিজ্যিক ব্যাংককে ঋণ দেয়, সেই ‘রেপো রেইট’ দশমিক ৭৫ শতাংশ হ্রাস করা হয়েছে। এর অর্থ, বেসরকারি ব্যাংক সস্তায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ পাবে। সর্বোপরি তারা সরকারি সংস্থা থেকে বেশি বেশি আমানত পাবে। নিয়ম ছিল, তারা আমানতকারী সরকারি সংস্থার ২৫ শতাংশের বেশি আমানত সংগ্রহ করতে পারবে না। এখন তা করা হয়েছে ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ সরকারি সংস্থা তাদের ‘আমানতযোগ্য’ ফান্ডের ৫০ শতাংশ রাখবে বেসরকারি ব্যাংকে। এসবই সরকার করেছে একটা কারণে। ‘লেন্ডিং রেইট’ এক অঙ্কে নামিয়ে আনার জন্য। কিন্তু ব্যাংকগুলো তা করছে না। না করে তারা নানা দাবি উত্থাপন করে এবং সরকার একে একে সব দাবি মেনে নেয়। তারপরও কোনো কোনো ব্যাংক সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনে, কেউ কেউ তা করেনি। তারা সর্বশেষ বলেছে, সরকারি ব্যাংক ও সরকারি সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিতে হবে, যাতে তারা ৬ শতাংশে বেসরকারি ব্যাংকে আমানত রাখে। এ ধরনের নানা দাবির প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার ব্যাংকমালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী। এবার আর রাখঢাক নেই। প্রকাশ্যে তিনি বললেন, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা বাধ্যতামূলক। তিনি তারিখও বলে দিয়েছেন। বলেছেন, ৯ আগস্ট হচ্ছে ‘কাটডেট’। এই তারিখ থেকে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক সবাই ৯-৬ শতাংশ সুদহার কার্যকর করবে। না করলে শাস্তি। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয়, একেক ব্যাংকের ‘বোর্ড’ নয়, অর্থমন্ত্রীই ৯-৬ শতাংশ সুদহার বাধ্যতামূলক করে দিলেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি ব্যাংকমালিকদের আরেক দাবি; সেটিও মেনে নিয়েছেন। তাদের দাবি, ‘সঞ্চয়পত্রের’ সুদহার কমাতে হবে। এর মধ্যে নাকি ব্যাংকের আমানত সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। আলোচ্য বিষয়ে যুক্তিতর্কের আর অবকাশ নেই। দুই-তিন মাস ধরে এ সম্পর্কে মিডিয়ায় অনেক আলোচনা হয়েছে। বর্তমান সিদ্ধান্তগুলোর নৈতিক দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর ফল কী হতে পারে, সে সম্পর্কেও কিঞ্চিৎ আলোচনা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, কোনো যুক্তিতর্কই অর্থমন্ত্রীর কাছে গ্রাহ্য নয়। ব্যাংকমালিকরা যা বলছেন, তা-ই তার কাছে শিরোধার্য। অতএব এর ফল কী হবে, তা নিয়েই কিছুটা আলোকপাত করা দরকার।
একটা ফল তো পরিষ্কার। আর সেটি হচ্ছে, মানুষের আয় হ্রাস। দ্বিতীয় ফল সস্তায় ঋণ। ঋণ পাবে ব্যবসায়ীরা। বলা হচ্ছে, সস্তায় ঋণ দিলে বিনিয়োগ বাড়বে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে। রফতানি বাড়বে। আমরা কী নিশ্চিত যে, সস্তায় ঋণ দিলেই দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে? বিনিয়োগ শুধু ঋণের ওপর নির্ভরশীল নয়। অবকাঠামো লাগে, গ্যাস-বিদ্যুৎ লাগে। প্রশাসনিক সাপোর্ট লাগে। বিনিয়োগের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশ লাগে। সব কিছু থাকলেই ঋণ কাজে আসতে পারে। অধিকন্তু কথা আছে, সস্তার তিন অবস্থা। সস্তার ঋণ যে হেলায়-ফেলায় ব্যয়িত হবে না, তার কী গ্যারান্টি? ১০-১৫ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল বিজার্ভ সস্তায় ঋণনীতি অনুসরণ করে দেশটির কী অবস্থা করেছিল, তা সবারই জানা। ঋণ হতে হয় পরিমিত, সুদহার হতে হয় অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বলা হয়, সস্তায় ঋণ দিলে রফতানি বাড়বে। আমাদের রফতানি মানেই হলো পোশাক রফতানি। সেই খাতে কী অবস্থা? কাগজে দেখেছি, ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে আমাদের পোশাক রফতানি বেড়েছে। আমরা এখন চীনের পরেই পোশাক রফতানিতে স্থান করে নিয়েছি। বিশ্বের মোট পোশাক রফতানিতে আমাদের হিস্যাও বেড়েছে। ২০১১ সালে আমাদের হিস্যা ছিল ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা হয়েছে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এটি কিন্তু পূর্বতন সুদকাঠামোর মধ্যেই হয়েছে। বস্তুত সুদব্যয় যে কোনো উৎপাদন ব্যয়ের একটা অংশ মাত্র। ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কস্ট’-এর অনেক উপাদান আছে। আছে প্রশাসনিক ব্যয়, বিপণন ব্যয়। আছে দক্ষতার প্রশ্ন। আছে শ্রমব্যয়। এ সবকিছুর সামান্য একটা অংশ হচ্ছে সুদব্যয়। দেখা যাচ্ছে, আমরা সুদব্যয়ের ওপরই জোর দিচ্ছি বেশি; বাকি উপাদানগুলো সম্পর্কে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে।
উপরিউক্ত বিবেচ্য বাদে রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেটি হচ্ছে, চাহিদার প্রশ্ন, বাজারের প্রশ্ন ও মার্কেটের প্রশ্ন। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, বর্তমান সরকারি সিদ্ধান্তগুলোর কারণে লাখ লাখ মানুষের আয় ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। দ্বিগুণ-আড়াই গুণ বেতন এবং সুবিধাভোগী সরকারি কর্মকর্তাদের দিয়ে চাহিদা সৃষ্টি হবে না। শত হোক, সংখ্যায় তারা আর কত? সরকারি খাতের বাইরেই লোকজন বেশি। তাদের আয়ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দেখা যাচ্ছে, ৯-৬ শতাংশের অন্যতম অংশ হচ্ছে আমানতের ওপর সুদ। ব্যাংকগুলো এমনিতেই কোনো সুদ দিতে চায় না। সঞ্চয়ী আমানতের ওপর সুদের হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। এখন ছয় শতাংশ সুদ মানে, তা হবে বর্তমান মূল্যস্ফীতির চেয়েও কম। অর্থমন্ত্রী ছয় শতাংশ সুদ নির্ধারণের আগে এ কথাটি কি ভেবে দেখেছেন? এটা কোন যুক্তিতে ৬ শতাংশ হয়? মূল্যস্ফীতির কম হারে সুদ দিলে এর প্রতিক্রিয়া বাজারে কী হবে? পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, ১০-১২ শতাংশের স্থলে ৬ শতাংশ সুদের অর্থ হচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষের আয় প্রায় অর্ধেক। লাখ লাখ লোক আমানতের সুদের ওপর, নির্ভরশীল সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর। বলা হচ্ছে, সঞ্চয়পত্রের সুদও কমানো হবে। এর অর্থ লাখ লাখ সঞ্চয়কারী, চাকরিজীবী, বেওয়া-বিধবা, মুক্তিযোদ্ধা, অবসরগ্রস্ত লোকজনের আয় প্রায় অর্ধেক হবে। তার মানে, তারা বাজার করবে অর্ধেক। চিনি, পেঁয়াজ, রসুন, তেল প্রভৃতি ভোগ্যপণ্যের ভোগ তারা কাটছাঁট করতে বাধ্য হবেন। যাতায়াত খরচ, শিক্ষা খরচ প্রভৃতি কমাতে বাধ্য হবেন। শত হোক, তাদের আয় অর্ধেক। এখন চাহিদা যদি কমে, তাহলে অর্থনীতির অবস্থা কী দাঁড়াবে? বাজার অর্থনীতির বড় কথা হলো বাজার। বিনিয়োগ করে কী হবে, যদি তার বাজার না থাকে? তাহলে কি মানুষ আয় বাড়ানোর জন্য সবাই ব্যবসায় নামবে, শেয়ারবাজারে যাবে, জমি-ফ্ল্যাটের দিকে যাবে, সোনার দিকে যাবে? সরকার কি এটি চায়? বিষয়গুলো ভাবার মতো।

অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক