বাজেটে অপূর্ণ মধ্যবিত্তের প্রত্যাশা

পৃথিবীতে এমন বহু দেশ রয়েছে যেখানে বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল খুব একটা নেই। বাজেট কখন উত্থাপিত হয়, কখন পাস হয় নাগরিকরা তা জানেন না, খোঁজখবর রাখেন না প্রায়ই। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম নিঃসন্দেহে। এখানে সাধারণ মানুষের বাজেট বিষয়ে আগ্রহ তো আছেই; আবার একশ্রেণির ব্যবসায়ী জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার আগেই বাজারে সংকেত দেওয়া শুরু করেন বাজেট আসন্ন। স্পষ্টত বেখেয়ালে ভুলে গেলেও ওসব ব্যবসায়ী কর্তৃক বাজেট পাসের আগেই পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির ঘটনার পর আর অগ্রাহ্য করা যায় না বাজেট ভাবনাকে। সেজন্য জুন মাসে গণমাধ্যমেরও অন্যতম ফোকাস থাকে এই বাজেট। বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখতে চাইবেন সবাই। কেননা এর মধ্য দিয়ে নাগরিকদের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক চিন্তা প্রতিফলিত হয়। তদুপরি বাজেট ঘিরে সর্বস্তরের জনগণের বাচনিক অংশগ্রহণ বাড়ে অন্তত। অবশ্য কেবল কথার মধ্যে দিয়ে বাজেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকাটা মানুষের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। তারা দেখতে চান, বাজেটে তাদের জন্য কী আছে। সে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হলে বৃহস্পতিবার সংসদে অর্থমন্ত্রী ঘোষিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট ঘিরে সর্বস্তরের মনোভাব মিশ্র বলা যায়। কারও কারও মতে, এ বাজেটে কিছু উদ্দেশ্য ও কয়েকটি গোষ্ঠী সন্তুষ্ট হলেও সার্বিকভাবে জনগণ বিশেষত মধ্যবিত্তদের জন্য আশান্বিত হওয়ার মতো কিছু নেই এতে। অভিযোগটি অধিকতর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
খেয়াল করা দরকার, শেয়ার বিজসহ গতকাল স্থানীয় প্রায় সব পত্রপত্রিকায়ই শিরোনাম হয়েছে বাজেট নিয়ে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, বাজেট নিয়ে লাগামছাড়া মন্তব্য কোথাও নেই; রয়েছে সতর্ক সমালোচনা। তার কারণ মোটামুটি স্পষ্ট। সেটি হচ্ছে, বাজেটটির মধ্য দিয়েই সরকারের বিবেচনাগুলো মোটামুটি ব্যাখ্যাত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাজেটের বিশাল আকারের ব্যাখ্যায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন এ বাজেটের মূল লক্ষ্যবস্তু যেহেতু প্রবৃদ্ধি সেহেতু এর আকার ওই টার্গেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া বাঞ্ছনীয়। তার এ যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা কঠিন। প্রবৃদ্ধি ভিন্ন এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, এ পুরোনো কথা। নতুন কথা হলো, প্রবৃদ্ধিই শেষ কথা নয় এবং প্রবৃদ্ধি নিজে গিয়ে সব মানুষের ভাগ্যের উন্নতি ঘটিয়ে আসবে না। সেজন্য প্রয়োজন উপযুক্ত বণ্টনমূলক ব্যবস্থা। আমরা প্রত্যাশা করব, প্রবৃদ্ধির গতি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি এর প্রতিও সদয় দৃষ্টি দেবেন সংশ্লিষ্টরা।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, স্থানীয় মধ্যবিত্ত যেসব পণ্যের চিহ্নিত গ্রাহক বাজেট বক্তৃতায় সেগুলোর ওপর বাড়তি করারোপের উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী। এমনকি অনলাইন সেবাকেও ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণেই এমন উদ্যোগ। এও অসহায় বাস্তবতা যে, চূড়ান্ত বিচারে সিংহভাগ ভ্যাট প্রদানকারী মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকেই গুনতে হবে ওই কর। অনেকের প্রত্যাশা ছিল, করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হবে এবার। তেমন কোনো প্রস্তাব আসেনি। তার মানে আয়করের প্রধান টার্গেটও ওই মধ্যবিত্তই এবং এক্ষেত্রে আহরণ সুবিধাই প্রধান বিবেচ্য বলে প্রতীয়মান। অথচ আয়করের বেলায় আয়ের উচ্চস্তরে জোরটা বেশি দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। মধ্যবিত্তকে কর বেশি দিতে হয়, এ নিয়ে কারও আক্ষেপ থাকা উচিত নয়। কেননা গুটিকয়েক দেশ বাদ দিলে সাধারণভাবে মধ্যবিত্তরাই সার্বজনীন বৃহত্তম করদাতা (প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর) গোষ্ঠী এবং অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কথা হলো, এই মেরুদণ্ড কতটা করভার বহনে সক্ষম, সেটি নির্ভর করে মেরুদণ্ড কতটা শক্তিশালী তার ওপর। সেজন্য অন্যান্য দেশে বাজেটের মাধ্যমে মধ্যবিত্তশ্রেণি শক্তিশালীকরণেরও উদ্যোগ নেয়া হয়। দুর্ভাগ্যবশত এখানে দেখা যাচ্ছে, মধ্যবিত্তশ্রেণি শক্তিশালীকরণের উদ্যোগ না যতটা, তার চেয়ে বেশি এর ওপর ভার চাপানোর প্রবণতা। অথচ প্রবণতাটি ঝুঁকিযুক্ত, এ বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের অধিক সতর্কতা কাম্য।