বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি নিয়ে ধোঁয়াশা

নিজস্ব প্রতিবেদক: উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে কম দাম বিক্রি করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এ জন্য প্রতি বছর বড় অঙ্কের লোকসান গুনছে সংস্থাটি। এ ঘাটতি পূরণে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ভর্তুকি চাইছে সংস্থাটি। গত নভেম্বরে চিঠি দেওয়া হলেও এখনও সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এছাড়া আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বজেটেও ভর্তুকি নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। ফলে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তথ্যমতে, উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে কমমূল্যে বিক্রি করায় ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৩৯ হাজার ৬০৪ কোটি লোকসান গুনেছে পিডিবি। অর্থবছর শেষে তা ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ জন্য প্রতি বছর ভর্তুকি চাইলেও তা ঋণ হিসেবে দেওয়া হতো পিডিবিকে। তবে গত নভেম্বরে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির শুনানি শেষে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলালিটি কমিশন (বিইআরসি) পিডিবির ঘাটতিকে ভর্তুকি হিসেবে প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি ৬০ পয়সা হারে বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।
যদিও গত বছর বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে বাল্ক (পাইকারি) বিদ্যুৎ মূল্য বাবদ ইউনিটপ্রতি এক টাকা ৯ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়। তবে পাইকারিতে বিদ্যুতের মূল্য না বাড়িয়ে উল্টো কমানো হয়েছে। আর এ খাতে ঘাটতি অর্থ সরকারের কাছ থেকে বরাদ্দ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে বাজেটে ভর্তুকি চেয়েছে পিডিবি। এরই মধ্যে ডিসেম্বরের ঘাটতি হিসেবে ২২১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়ে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির শুনানি শেষে বিইআরসি সে সময় জানায়, বিদ্যুতের পাইকার মূল্যহার নির্ধারণে পিডিবির রাজস্ব চাহিদা ৩২ হাজার ৩১৮ কোটি টাকায় স্থির করা হল। বছরে তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকা অনুদান বিবেচনায় এর বর্তমান গড় পাইকারি মূল্যহার চার টাকা ৮৪ পয়সা অপরিবর্তিত রাখা হলো।
বিইআরসি আরও জানায়, গ্রাহক পর্যায়ে মূল্যহার সহনীয় রাখার লক্ষ্যে পাইকারি পর্যায়ে পিডিবির প্রকৃত সরবরাহ ব্যয় পাঁচ টাকা ৪৪ পয়সা ও নির্ধারিত পাইকারি মূল্যহার চার টাকা ৮৪ পয়সা এর মধ্যকার ব্যবধান কিলোওয়াট ঘণ্টা প্রতি ৬০ পয়সা সরকার কর্তৃক পিডিবিকে অনুদান হিসেবে প্রদান করা প্রয়োজন। পিডিবি এ অনুদান প্রদানের জন্য মাসভিত্তিক চাহিদা সরকারের নিকট প্রেরণ করবে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত মাসে অর্থ বিভাগে পাঠানো চিঠিতে পিডিবি জানায়, বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিয়োজিত আইপিপি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে বিদ্যুৎ ক্রয়, ভারত হতে বিদ্যুৎ আমদানি ব্যয় পরিশোধ ও নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ব্যয় নির্বাহ করতে হয় পিডিবিকে। জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য বিপিসিকে অগ্রিম প্রদান করে উৎপাদন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা হয়। তবে সামগ্রিকভাবে মোট উৎপাদনের জন্য ইউনিটপ্রতি ব্যয় হয় তার চেয়ে বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য হার ৩০ শতাংশ কম। সরকার হতে ঋণের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে এ যাবৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা সচরা রাখা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, বিইআরসি বিদ্যুতের মূল্যহার গ্রাহক পর্যায়ে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পাইকারি পর্যায়ে তা চার টাকা ৮৪ পয়সা নির্ধারণ করে। অথচ পিডিবির প্রকৃত সরবরাহ ব্যয় পাঁচ টাকা ৪৪ পর্যসা। এক্ষেত্রে কিলোওয়াট ঘণ্টাপ্রতি ৬০ পয়সা সরকার কর্তৃক পিডিবিকে অনুদান হিসেবে প্রদান করা প্রয়োজন। পিডিবি কর্তৃক বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি বা সংস্থাগুলোর কাছে মাসভিত্তিক বিদ্যুৎ বিক্রির পরিমাণের ভিত্তিতে ৬০ পয়সা কিলোওয়াট ঘণ্টা হারে অনুদান প্রদানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে পাইকারিতে মূল্যহার ঘাটতি বাবদ গত ডিসেম্বরের জন্য ২২১ কোটি ৬৭ লাখ টাকার চাহিদাপত্রও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে ডিপিডিসির নিকট বিক্রয় বাবদ ঘাটতি রয়েছে ৩৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, ডেসকোতে ১৮ কোটি ৯৭ লাখ, ওজোপাডিকোতে ১২ কোটি ২৩ লাখ, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ৯৬ কোটি ৭৭ লাখ, নেসকো ১৪ কোটি ৬৬ লাখ ও পিডিবির নিজস্ব বিতরণ ব্যবস্থায় ৪৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
জানতে চাইলে অর্থ বিভাগে বাজেট ব্যবস্থাপনা বৈঠকে উপস্থিত পিডিবির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) মো. কাওসার আমীর আলী শেয়ার বিজকে বলেন, গত বছর বিদ্যুতের পাইকারি মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছিল। তা অনুমোদন না করে উল্টো ইউনিটপ্রতি ছয় পয়সা কমনো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। এতে পিডিবির ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে প্রতি ইউনিটে ৬০ পয়সা। তাই বিইআরসির নির্দেশনা মোতাবেক চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ অর্থ ভর্তুকি হিসেবে চাওয়া হয়েছিল। তবে এখনও কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও বলেন, পিডিবির ঘাটতি মেটাতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি দেওয়া হবে বলে শোনা যাচ্ছিল। যদিও প্রস্তাবিত বাজেটে এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। আবার প্রস্তাব ফেরতও দেয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়। তাই ভর্তুকির বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
পিডিবির তথ্যমতে, ২০১০-১১ অর্থবছরে সংস্থাটি লোকসান গুনেছে চার হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ছয় হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে পিডিবির লোকসান দাঁড়ায় পাঁচ হাজার ২৬ কোটি, ২০১৩-১৪তে ছয় হাজার ৮০৬ কোটি ৫৩ লাখ, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সাত হাজার ২৭৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা। পরের অর্থবছর তা বেশকিছুটা কমে দাঁড়ায় তিন হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা আবার বেড়ে দাঁড়ায় চার হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। আর চলতি অর্থবছর এপ্রিল পর্যন্ত লোকসান দাঁড়িয়েছে এক হাজার ২৪৭ কোটি টাকা, অর্থবছর শেষে যা দেড় হাজার কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে।
উল্লেখ্য, প্রতি বছর ভর্তুকির পরিবর্তে ঘাটতিকে ঋণ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে পিডিবিকে। আবার এ ঋণের ওপর তিন শতাংশ সুদও দাবি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। যদিও লোকসানের কারণে ঋণ পরিশোধ না করে বরাবরই তা ভর্তুকিতে রূপান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে পিডিবি। প্রতিবারই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণাতে সরকারের প্রতি এ আহ্বান জানিয়েছে বিইআরসি। তবে এতো তা মানতে রাজি ছিল না অর্থ মন্ত্রণালয়।