বাজেটে মানুষের প্রত্যাশা তুলে ধরার প্ল্যাটফর্ম থাকে না

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান। দায়িত্ব পালন করেছেন পরিকল্পনা কমিশনসহ সরকারের বিভিন্ন দফতরে। বাজেট প্রণয়নের নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন কয়েক বছর। সম্প্রতি দেশের বাজেট বিষয়ে নিজের ভাবনার কথা জানিয়েছেন শেয়ার বিজকে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শামসুন নাহার ও তৌহিদুর রহমান

শেয়ার বিজ: বাজেট-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ও দিকনির্দেশনাগুলো কেবল ব্যবসায়ী সমাজকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। এ ব্যাপারটাকে কীভাবে দেখছেন?

আবদুল মজিদ: এটা তো স্পষ্ট। ‘কেমন বাজেট চাই’ বা এ ধরনের প্রতিপাদ্য নিয়ে নানা আলোচনা-বৈঠকের কথা শুনি। কিন্তু সেখানে কাদের চাওয়া তুলে ধরা হচ্ছে? স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংঘের সুবিধা ও প্রত্যাশা নিয়েই সব কথা হয়। বাজেটকে সামনে রেখে তাদের মধ্যেই যত তৎপরতা দেখা যায়। সেখানে দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। কিন্তু সরকারের সব ধরনের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের উন্নয়ন সাধন। অর্থনীতি মানে তো ব্যবসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত নীতি নয়। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সব ব্যাপারই অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। এমনকি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি এমন হওয়া উচিত, যাতে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে জনকল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। আমজনতার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও জীবনমান উন্নত করার মাধ্যমে মুনাফা অর্জন যদি ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য না হয়, তাহলে তা অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকা রাখতে পারে না।
আবার সরকার যে আর্থিক ব্যবস্থাপনা করে তা মূলত অর্থের বণ্টন ও পুনঃবণ্টন, অর্থাৎ ধনীর কাছ থেকে অর্থ নিয়ে আমজনতার স্বার্থে ব্যয় করা। এ কাজেরই রোডম্যাপ হলো বাজেট। বাজেট হলো জনগণের কাছে সরকারের প্রতিশ্রুতিপত্র। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বাজেটে শুধু সাধারণ মানুষের সুবিধা ও প্রত্যাশাগুলো তুলে ধরার কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই, মাধ্যম নেই। অথচ জনগণের করের পয়সায় গড়ে ওঠে জাতীয় বাজেট। প্রতিটি পণ্য কেনার সময় তাদের ট্যাক্স দিতে হয়। এই ট্যাক্সের অর্থ ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সরকারের কোষাগারে পড়ছে কি না, তা জানার স্বচ্ছ উপায় নেই। ভ্যাট আইন নিয়ে তাদের মতামত জানানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। এতে ব্যবসায়ীদের জন্য কর ফাঁকি দেওয়া সহজ হয়েছে।
আরেকটি ব্যাপার হলো, বাজেট প্রণয়ন করেন আমলারা। তারা সাধারণ মানুষ থেকে অনেক দূরের। এটা হলো উপনিবেশবাদের ফল। তারা নিজেদের জনসাধারণ থেকে আলাদা ভাবেন। তারা শাসক, নীতিনির্ধারক আর জনগণ হলো প্রজা। অর্থাৎ এখানে একটি ‘আমরা’ বনাম ‘অন্যরা’ থিওরি কাজ করে। তাই তারা জনগণের সমস্যা অনুধাবন তো করেনই না, বরং তাদের দাবিয়ে রাখার মনোভাব ধারণ করেন। এ জন্যই বাজেট নিয়ে এত গোপনীয়তা। বাজেট প্রস্তাবের আগে জনগণ জানতে পারে না, কী সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে। কারণ পুরো প্রক্রিয়ায় তাদের তো কোনো অংশগ্রহণই নেই। তাই যেভাবেই হিসাব দেখানো হোক না কেন তা মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায়ও নেই। ফলে এভাবে প্রতিবছর বাজেটের আকার যেমন বড় হচ্ছে, জনসাধারণের বঞ্চনাও বাড়ছে।

শেয়ার বিজ: ব্যবসায়ীদের প্রতি সরকারের পক্ষপাতের কারণ কী?

আবদুল মজিদ: পক্ষপাত থাকবে না কেন? সরকারে যারা আছেন তাদের অনেকেই তো ব্যবসায়ী। সব দলেরই এক অবস্থা। সংসদ সদস্যদের বেশিরভাগই বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি। ফলে তারা কেবল ব্যবসায়ীদের স্বার্থই দেখছেন। আর বিরোধী দলেও যারা আছেন তারাও বাজেট নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা বা পরামর্শ দিতে পারেন না। এর পেছনে অজ্ঞতা যেমন রয়েছে, তেমনি সদিচ্ছার অভাবও রয়েছে। বাজেট উত্থাপনের পর সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা সরকারের স্তুতি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আর অন্যরা এমনভাবে সমালোচনা করেন যার মধ্যে সারবস্তু কিছু থাকে না। তাদের চাইবার মতো আছে কেবল নিজের এলাকার একটি সড়ক, সেতু বা এ-জাতীয় কিছু। অর্থাৎ কোন খাত থেকে কীভাবে অর্থ সংগ্রহ করা দরকার বা সংগৃহীত অর্থ কোন খাতে ব্যয় করলে বেশি লাভবান হওয়া যাবে, তার কোনো পরামর্শই তাদের মুখে শোনা যায় না। এ থেকেই বাজেট সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতারই প্রমাণ পাওয়া যায়। সামগ্রিকভাবে বাজেটকে কীভাবে আরও জনহিতৈষী করা যায় এ ব্যাপারে তাদের কোনো বক্তব্য বা নির্দেশনা দেওয়ার নেই। ফলে জাতীয় বাজেটে ‘জাতীয়’ শব্দটির আদতে কোনো অর্থ থাকছে না। মোট কথা, নির্দিষ্ট কিছু পক্ষের স্বার্থরক্ষার জন্যই বাজেট গোপনীয়তার খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না।

শেয়ার বিজ: বাজেটের আগে জিডিপি বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সুবিধা আদায় করে নেয়। এভাবে জিডিপি বাড়ানোর ওপরই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়াটা কতটুকু যৌক্তিক?

আবদুল মজিদ: জিডিপি হচ্ছে একটা ভিত্তি। তবে জিডিপি বৃদ্ধিকেই একমুখী গুরুত্ব দেওয়া কতটা যৌক্তিক এটা যেমন ভাববার বিষয়, তেমনি জিডিপির হিসাবটি কতটা সঠিক এটাও গুরুত্বপূর্ণ। আমার মতে, জিডিপির হিসাবেই একটি বিরাট গলদ রয়েছে। অর্থনীতি কেমন এগোচ্ছে এটা পরিমাপের একটি অন্যতম ভিত্তি হলো জিডিপি। এর গুরুত্ব আছে অবশ্যই। কিন্তু সরকার বারবার জিডিপি পরিমাপের ভিত্তি পরিবর্তন করছে। বড় করে দেখানোর জন্যই এটা করা হচ্ছে। এর পেছনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, একটা ‘ক্যামোফ্লেক্স’ সৃষ্টি করা। মূলত আমাদের জিডিপি আসলে ১০-এর উপরে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে। এখন জিডিপি আড়াই থেকে তিন শতাংশ চুরি হয়ে যাচ্ছে। আবার আমাদের বোঝানো হচ্ছে, জিডিপি ৭-৮ হলেই বিরাট কিছু অর্জন করা হলো। মানুষকে প্রতি বছরই দেখানো হচ্ছে আমাদের জিডিপি বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ রফতানি আয় বৃদ্ধি হয়েছে। বৈদেশিক রেমিট্যান্সও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব যুক্ত হয়েছে দেশের অর্থনীতিতে। তাহলে এর তো একটা উৎপাদনশীলতা আছে। অর্থের সমাগম হলে বিনিয়োগ হবে। কিন্তু তার সুফল দেখা যাচ্ছে না। চুরিটা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্পে দফায় দফায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করে। দুই-তিনগুণ পর্যন্ত খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সহজ ভাষায় বলি। জিডিপি মানে তো মোট দেশজ উৎপাদন (গ্রস ডোমেস্টিক প্রডাক্ট)। তাহলে ধরুন, একটি সড়ক বানানোর জন্য তিনশ’ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলো। কিন্তু কয়েক দফায় সময় ও বরাদ্দ বাড়ানোর কারণে তিন মাসের কাজ দেড় বছরে তিনগুণ বেশি ব্যয়ে শেষ হলো, যেটা আমাদের দেশে সাধারণত হয়ে থাকে। তাহলে ১২শ’ কোটি ব্যয়ে আমাদের জিডিপিতে তিনটি সড়ক যুক্ত হতো, কিন্তু দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে আমরা পাচ্ছি মাত্র একটি সড়ক। এভাবেই চুরি যাচ্ছে জিডিপি।
এছাড়া যে কোনো সরকারের সময় উচ্চ পর্যায়ের এক হাজারেরও বেশি কর্মকর্তা ওএসডি করে রাখা হয়। তারা বেতন পাচ্ছে, কিন্তু কোনো কাজ করছে না। বর্তমান সরকারের সময়েও সেটা হয়েছে। এখানে টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু কোনো অর্থনৈতিক প্রতিদান পাওয়া যাচ্ছে না। এটা বন্ধ করা সম্ভব হলে জিডিপি এতদিনে ১০-এর উপরে যেতে পারত। অর্থাৎ সরকার যদি কেবল জিডিপিকে গুরুত্ব দেওয়ার কাজটিও দক্ষতার সঙ্গে করতে পারত, তাহলেও অন্তত কিছুটা লাভ হতো। আবার ব্যবসায়ীরাও যত বড় বড় আশা দেখান, বাস্তবে ততটা প্রতিদান দিতে পারেন না।

শেয়ার বিজ: প্রতিবছরই বাজেটের আকার বাড়ছে। কিন্তু সে অনুপাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। অর্থাৎ কর্মসংস্থানহীন একটা বাজেট দেওয়া হচ্ছে। এই যে বিরাট বাজেট সত্ত্বেও কর্মসংস্থান বাড়ছে না এর পেছনে কারণ কী?

আবদুল মজিদ: এর মূল কারণ হলো বাজেটের একটা বড় অংশ অনুৎপাদনশীল কাজে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। কর্মকর্তারা বসে বসে বেতন নিচ্ছেন, কিন্তু কোনো আউটপুট নেই। পণ্য, সেবা বা সম্পদ তৈরি হচ্ছে না। আবার সরকারের দৃষ্টি বড় বড় প্রকল্পের দিকে। এসব প্রকল্প শ্রমঘন নয়। এ প্রকল্পগুলোতে সাধারণ মানুষকে তেমন একটা সম্পৃক্ত করা যাচ্ছে না। এটিও কর্মসংস্থান না হওয়ার একটি কারণ। অন্যদিকে, কৃষি খাত এদেশে একটি সফল খাত। কিন্তু সেটা সরকারের সাফল্য নয়। সাধারণ কৃষকরা রাজনীতির মধ্যে নেই। তারা চাষ কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। তারা আগে এক ফসলি চাষবাস করত, এখন তিন ফসল করছে। কৃষিতে সাফল্যের অনেক উদাহরণ রয়েছে। দেশের উন্নয়নের বড় নায়ক হচ্ছে কৃষক। আর সবচেয়ে ক্ষতি করেছে শিক্ষিত রাজনীতিবিদ, আমলা থেকে শুরু করে আমরা সবাই। আমাদের উদ্দেশ্যের গলদের কারণেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। কৃষককে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। কৃষক লাভবান হলে আখেরে দেশেরই লাভ। কিন্তু হচ্ছে তার উল্টো। জোতদারি ব্যবস্থার মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই কৃষক মার খাচ্ছে। এতেও কৃষিনির্ভর কর্মসংস্থান কমছে। কৃষকদের সুরক্ষা দেওয়া হলে অর্থনীতি অনেক এগিয়ে যাবে।
এছাড়া দিন দিন শহরাঞ্চল ও গ্রামাঞ্চলে বৈষম্য বাড়ছেই। গ্রামাঞ্চলকে শোষণ করে শহরাঞ্চল এগিয়ে যাচ্ছে, পিছিয়ে পড়ছে গ্রাম। গ্রামের একজন তার পুকুরে ভালো মাছ চাষ করে সেটি না খেয়ে শহরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। কারণ সেখানে বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে। এতে তার পুষ্টির পরিমাণও কমে যাচ্ছে। এছাড়া সরকারের সব উন্নয়ন পরিকল্পনা শহরকেন্দ্রিক। এজন্য মানুষও আর গ্রামে থাকছে না, শহরমুখী হচ্ছে। ফলে গ্রামে কর্মসংস্থান সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। জিডিপিতে শহরের অবদান বেশি। কিন্তু গ্রামের অবদানও কম নয়। যতটা প্রাপ্য তা থেকেও অনেক বঞ্চিত হচ্ছে গ্রাম। স্থানীয় সরকারের বাজেট নেই বলতে গেলে চলে।

শেয়ার বিজ: উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য বেশ কয়েক বছর ধরেই তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিতে কতটা প্রস্তুত?

আবদুল মজিদ: অর্থনীতিকে প্রয়োজন মতো গঠন দেওয়া সরকারের কাজ। এর জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন দরকার হয়। বাজেট এর মধ্যে একটি। দুঃখজনক হলো, আমাদের বাজেট কোনোভাবেই উদ্যোক্তাবান্ধব হচ্ছে না। বাজেটে উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়ার কোনো পথনির্দেশ নেই। আমাদের অর্থনীতি একটা গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে। বর্তমানে আমরা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর ভেতরে আছি। আমাদের জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ হলো যুবসমাজ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। যে কোনো অর্থনীতির জন্য এমন সুযোগ কালেভদ্রে একবার-দু’বার আসে। আমাদের সেই সুযোগ এসেছে ২০০৮ সাল থেকে। আমাদের যুবসমাজ অনেক কিছুই করতে পারে। কিন্তু এটা দুর্যোগে পরিণত হতে যাচ্ছে। কারণ এদের কাজ দেওয়া যাচ্ছে না। এমনকি সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেও ঘরে বসে থেকে চাকরির বয়স শেষ হয়ে যাচ্ছে। যুবসমাজের একটা অংশ হতাশাগ্রস্ত হয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। চাকরির সুযোগ না পেয়ে তারা এখন বিভ্রান্ত, হতাশ।
উদ্যোক্তা হতে গেলে এখন প্রতি পদে পদে বাধা। সুদের হার বেড়ে যাচ্ছে। তাদের জন্য সহজ ঋণ সুবিধা নেই। অথচ সমাজের একটি অংশ কোটি কোটি টাকা খেলাপি করে যাচ্ছে, কেউ কিছু বলছে না। বড় কোম্পানিগুলো শুধু ঋণ পাচ্ছে। অথচ বিরাট জনগোষ্ঠীর এই দেশে বাজেট হওয়া উচিত এসএমইনির্ভর। কারণ জনশক্তিই হচ্ছে অর্থনীতির প্রাণশক্তি।

শেয়ার বিজ: ব্যক্তিগত আয়ের করসীমা কেমন হওয়া উচিত?

আবদুল মজিদ: ব্যক্তি পর্যায়ে আয়ের করসীমা বাড়ানোর দরকার ছিল। এখানে ব্যক্তির পাশাপাশি এনবিআরেরও নিজের স্বার্থ আছে। কারণ তাদের পর্যাপ্ত জনবল নেই। সেক্ষেত্রে সাধারণ করসীমা বাড়ালে এনবিআরের কাজের পরিমাণ কিছুটা কমে আসবে। তখন তারা অন্য কাজে মনোযোগ দিতে পারবে। এছাড়া কম করের পরিমাণ বেশি থাকলে কর আদায়ের খরচও বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ অল্প পরিমাণ অর্থ আদায় করতে গিয়ে বেশি খরচ হয়ে যাবে। কিন্তু একইসঙ্গে একটা ঝুঁকিও রয়ে গেছে। ব্যক্তি পর্যায়ে করহার বৃদ্ধি করলেও সেটা সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সেক্ষেত্রে বড় করদাতারাও সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে। সেজন্য যাদের কম আয় তাদের করহার কমানো এবং একইসঙ্গে যাদের আয় করসীমা থেকে যত বেশি উপরের দিকে সেটি সমন্বয় করে নেওয়া উচিত। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য প্রদত্ত সুবিধা যেন বড় করদাতারা পেয়ে না যায়। এটা প্রতিহত করতে হবে। তা না হলে কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ক্ষেত্রে বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। করপোরেট কর কমানো হলেও এর মাধ্যমে যাতে বিনিয়োগ ও কর্মসৃজন হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সেটা যাতে ব্যক্তিগতভাবে খরচ না হয় সেটা দেখতে হবে। আমাদের দেশে কর আইন বেশি জটিল এবং করহারও বেশি। এর কারণ হলো আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতাটা কম। আইন জটিল হয় ব্যবহারকারীর কর্মকাণ্ডের কারণে। করের হার কমিয়ে দিলে যে এর সদ্ব্যবহার হবে সেটা করদাতাকে নিশ্চিত করতে হবে।

শেয়ার বিজ: রাজস্বের একটা বড় অংশ গার্মেন্টস ও রেমিট্যান্স থেকে আসে। এ ধরনের বড় খাত আর তৈরি হচ্ছে না। এটার কারণ কী আর এর ঝুঁকিটাই বা কতটা?

আবদুল মজিদ: বিরাট ঝুঁকি আছে। শুধু গার্মেন্টস ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করলে ভবিষ্যতে বড় মার খেতে হতে পারে। এসব খাতের বড় সুবিধা হলো ব্যাপক কর্মসংস্থান। আর কর্মসংস্থান বেশি বলেই ঝুঁকিটাও বড়। এ খাতগুলো কোনো কারণে পড়ে গেলে বিরাট জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে পড়বে। অর্থনীতিতে একটি বড় ধাক্কা আসবে। বিভিন্ন কারণেই এটা হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার পরিবর্তন হতে পারে। আবার প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে নতুন নতুন যন্ত্রপাতি আসছে। গার্মেন্ট খাতে রোবটের ব্যবহার বাড়বে। এজন্যও কর্মসংস্থান কমে যাবে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন বা অন্য কোনো কারণে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের যে কোনো সময় ফেরত পাঠানোও হতে পারে। ফলে কেবল একটা কি দুটি খাতের ওপর নির্ভর করে বসে থাকা বুমেরাং হবে। এ বিষয়গুলো নিয়ে এখন থেকেই কাজ করা প্রয়োজন। তাই বাজেটে অন্যান্য খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য দূরদর্শী পরিকল্পনা থাকা দরকার।

শেয়ার বিজ: সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

আবদুল মজিদ: ধন্যবাদ।