বাজেট প্রতিক্রিয়া

বাজেট গতানুগতিক বাস্তবায়নযোগ্য নয়

এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

প্রস্তাবিত বাজেট গতানুগতিক হয়েছে। এতে নতুন কিছু নেই। এটি বাস্তবায়নযোগ্য নয়। যে আকার দেখানো হয়েছে তাও যৌক্তিক নয়। বিগত বছরগুলোয় আমাদের বাজেট বাস্তবায়নের হারও কমেছে। আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবায়নের হার কমছে। বাজেট বাস্তবায়ন করতে না পারলে আকার বাড়িয়ে লাভ নেই।
অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় বলেছেন, কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার জন্য জনগণ প্রবৃদ্ধির সুফল পাচ্ছে না। কিন্তু কি কাঠামো সেটা পরিষ্কার করেননি বা বাজেট বক্তৃতায় সেটা স্পষ্ট নয়। সাধারণ মানুষ বাস্তবিক অর্থেই সুফল পাচ্ছে না। সেটা দারিদ্র্য বিমোচনের হারের দিকে লক্ষ্য করলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। বিগত বছরগুলোতে দারিদ্র্য বিমোচনের হার কমেছে। ২০০৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে দারিদ্র্য বিমোচনের হার ছিল আট দশমিক পাঁচ শতাংশ আর ২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে দারিদ্র্য বিমোচনের হার দাঁড়ায় সাত দশমিক দুই শতাংশ। বাজেটে দারিদ্র্য বিমোচনের বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত নেই। দারিদ্র্য বিমোচনের হার বাড়াতে হবে। দারিদ্রতা কমাতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে হবে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে অর্থ বরাদ্দ কিছুটা বাড়লেও মোট বাজেটে শতাংশের হিসাবে বরাদ্দ কমেছে। স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ তা আন্তর্জাতিক মানের নয়। বরাদ্দ আরও বাড়াতে হবে এবং এর যথার্থ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
বাজেটে এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। ঘাটতি পূরণে বলা হয়েছে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়া হবে ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি লক্ষ্যের চেয়ে বেশি হয়। তাই ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে বলে মনে হয় না।
রাজস্ব প্রাপ্তির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে সেটিও অবাস্তব। আগেও দেখা গেছে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ হয় না। এটার পূরণ হবে বলে মনে হয়ে না।

খেলাপি ঋণের কারণে কর ছাড় কাজে আসবে না

আবু আহমেদ
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ

প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর কিছুটা কমানো হয়েছে। এটা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য কাজে আসবে না, কারণ ব্যাংকগুলোতে যে পরিমাণ খেলাপি ঋণ রয়েছে এতে করহার কমলেও তারা ভালো লভ্যাংশ দিতে পারবে না।
ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আনার জন্য অন্য ক্যাটেগরির কোম্পানির করহার কমানো উচিত ছিল। এসব কোম্পানির কর কমলে তারা পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী হতো। পক্ষান্তরে ভালো কোম্পানি বাজারে এলে বিনিয়োগকারীরাও লাভবান হবে, কারণ করহার কমলে কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ প্রদানের সক্ষমতা বাড়ে। আর বিনিয়োগকারীরা সবসময় ভালো কোম্পানির সঙ্গে থাকতে চান।
বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সবার আগে প্রয়োজন ছিল করমুক্ত লভ্যাংশের পরিমাণ বৃদ্ধি করা। এতে তারা উপকৃত হতো। গত বছরও এটা করা হয়নি। বিশ্বের কোথাও এমন দেখা যায় না। পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই বাজেট করার সময় পুঁজিবাজারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, কারণ একটি দেশের অর্থনীতির জন্য পুঁজিবাজারের গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ আমাদের দেশে বরাবরই এর ব্যতিক্রম দেখা যায়।
সার্বিক বাজেটে নতুন কিছু নেই। এটা হয়েছে একটি গতানুগতিক বাজেট।

পোশাক খাতে কর বৃদ্ধি বিনিয়োগ বিঘ্নিত করবে

আব্দুস সালাম মুর্শেদী
সভাপতি, ইএবি

পোশাক সর্বাধিক কর্মসংস্থান করছে। তাছাড়া বিনিয়োগের বড় জায়গা। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান কিংবা জিডিপি সব ক্ষেত্রেই পোশাক খাতের বড় অবদান আছে। অথচ, পোশাক খাতে এখন সংকটকাল অতিক্রম করছে। অ্যাকর্ড, অ্যালায়েন্স থেকে এখনও বের হতে পারিনি আমরা। প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় এখনও পিছিয়ে আছি। তাছাড়া বেতন বৃদ্ধি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও দেশের বাজারে বেড়ে যাচ্ছে। এসব পরিস্থিতির সঙ্গে মানাতে হচ্ছে আমাদের। এর মধ্যেও যদি করপোরেট কর বেড়ে যায়, তাহলে বিনিয়োগের পরিবেশ বিঘিœত হবে। পোশাক খাতের জন্য করপোরেট কর আরও কমিয়ে গ্রিন কারখানার জন্য সাত শতাংশ আর সাধারণ কারখানার জন্য ১০ শতাংশ করা উচিত ছিল বলে আমি মনে করি।
বাজেটে ঘাতটি মেটানো চ্যালেঞ্জের হবে। তাছাড়া বিপুল ব্যয় ধরা হয়েছে উন্নয়ন ও অবকাঠামো খাতে। সে সব ব্যয় মেটাতে হলেও সরকারকে টাকা আয় করতে হবে। কিন্তু টাকা আয় করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমছে না। এসব মিলে মনে হচ্ছে অনেক বড় বাজেট।
এসব চ্যালেঞ্জের সমাধান কিছুতেই শুধু কর বা শুল্কারোপ হতে পারে না। বিনিয়োগ আশানুরূপ হচ্ছে না। বিনিয়োগ বাড়াতে ওষুধ ও চামড়া খাতে কিছু সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এটা ভালো। সার্বিকভাবে বিনিয়োগকেই মূল ফোকাসে রাখতে হবে। কিন্তু তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে বাজেটে বৈপরীত্য সৃষ্টি হয়েছে।
মূল বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলছেন যে তৈরি পোশাক খাতের জন্য সরকারের সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রয়েছে। উৎস করের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। কিন্তু পোশাক খাতের করপোরেট কর ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। এটা মূল বক্তব্যের সঙ্গে মেলে না। তাছাড়া গ্রিন কারখানার ওপর আগে ১০ শতাংশ আয়কর ছিল। সেটা বেড়ে ১২ শতাংশ হয়ে গেল। এটা অপ্রত্যাশিত। এতে গ্রিন কারখানার উদ্যোক্তারা অনুৎসাহিত হবে।

পুঁজিবাজারের জন্য ‘মন্দের ভালো’ বাজেট

শাকিল রিজভী
সাবেক সভাপতি, ডিএসই

প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানিগুলোর করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানোর কথা বলা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ভালো প্রস্তাব। কারণ পুঁজিবাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ কোম্পানি-ই ওই তিন খাতের। সে বিবেচনায় করপোরেট করের হার কমায় কোম্পানিগুলো উপকৃত হবে। বিনিয়োগকারীদের জন্যও ভালো হবে।
তারপরও এবারের বাজেট প্রস্তাবনায় পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। বরং অনেক দিক বিবেচনায় এবারের বাজেট প্রস্তাব পুঁজিবাজারের জন্য মন্দের ভালো। কারণ ব্যাংক-বিমা ও আর্থিক খাতের পাশাপাশি উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত এমন কোম্পানিগুলোর করপোরেট করও কমানোর প্রয়োজন ছিল। ওই কোম্পানিগুলো সরাসরি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। সেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাই বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেত।
এবার অনেকেরই প্রত্যাশা ছিল তালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট ট্যাক্স কমবে। কিন্তু বাজেটে তেমন কোনো প্রস্তাব রাখা হয়নি। বাজারের বাইরের কোম্পানির তুলনায় বাজারে থাকা কোম্পানির কর কম হলে তা পুঁজিবাজারের জন্য আরও ভালো হতো। এতে কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে আসার প্রবণতা বাড়তো।
আমি মনে করি, বাজারকে শক্তিশালী একটি জায়গায় নিতে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। এ জন্য আরও কিছু বিষয় আমলে নেওয়া দরকার। সঞ্চয়পত্র-এফডিআরের সুদের হার কমানোর দিকেও নজর দিতে হবে। ওই সুদের হার না কমলে মানুষ পুঁজিবাজারে আসবে না।