বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুল চাষে স্বাবলম্বী শত কৃষক

জোটে যদি মোটে একটি পয়সা
খাদ্য কিনিয়ো ক্ষুধার লাগি
দুটি যদি জোটে অর্ধেকে তার
ফুল কিনে নিয়ো, হে অনুরাগী!
বাজারে বিকায় ফল তনুডল
সে শুধু মিটায় দেহের ক্ষুধা,
হৃদয়-প্রাণের ক্ষুধা নাশে ফুল
দুনিয়ার মাঝে সেই তো সুধা!

ফুল নিয়ে বিশ্বের সব দেশে কত শত উপমা, কত সহস্র কবিতা যে রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের সেই দুটি চরণ ‘হৃদয়-প্রাণের ক্ষুধা নাশে ফুল/দুনিয়ার মাঝে সেই তো সুধা’ আজও চিরসবুজ। আসলেই মনের ক্ষুধা নাশের পাশাপাশি প্রাণের ক্ষুধাও মেটায় ফুল। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, বগুড়ার ফুলচাষিদের কথা। বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী বগুড়ার ফুলচাষি।
ফুলচাষির দূরদর্শিতার কারণে আমদানিনির্ভরতা কমে আসায় সহজে ও তুলনামূলক সস্তায় ফুল কিনতে পারছে জেলার মানুষ। বগুড়া সদর, সোনাতলা, শিবগঞ্জ ও শেরপুর উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা এ ফুল স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। বগুড়া কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে বগুড়ায় ফুলের চাষ দ্বিগুণ বেড়েছে। অল্প সময়ে, কম খরচে লাভজনক হওয়ায় কৃষক ফুল চাষের প্রতি ঝুঁকছে। তাদের সাফল্যে আগ্রহী হয়েছে শত যুবক। তারাও স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুল চাষ করে।
বগুড়ার বাঘোপাড়া থেকে মহাস্থান বাজার পর্যন্ত পুরো এলাকাকে বলা হয় নার্সারি পল্লি। এ পল্লির প্রায় সব বাড়ির উঠান, আঙিনা ও ক্ষেত-খামারে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অনেক নার্সারি। যতদূর চোখ যায়, শুধু দেখা যায় শত শত সবুজ চারা গাছের সারি। এখানকার বাবুল হাসান, মনিরুল ইসলাম, ওহিদুল তালুকদারের মতো এক সময়ের বেকার যুবকরা নিঃস্ব অবস্থা থেকে নার্সারি ব্যবসা করে বর্তমানে স্বাবলম্বী।
বগুড়া সদরের গোকুলের ‘সৌখিন নার্সারি’র স্বত্বাধিকারী ও ফুল চাষি মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে ফুল চাষ করছি। চলতি মৌসুমে তিন বিঘার বেশি জমিতে ফুলের আবাদ করেছি। এ জমিতে অন্য ফসল আবাদ করলে উৎপাদন খরচ ওঠানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, মৌসুমে ফসলের দাম পড়ে যায়। তাই ফুল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছি। তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে ফুল চাষ করলে ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকার ফুল বিক্রি করা যায়। আর বগুড়ায় ফুলের চাহিদা বেশি থাকায় বাজারজাত করতে তেমন বেগ পেতে হয় না। গত বছর তিনি প্রায় ১০ বিঘা জমিতে ফুল চাষ করেছিলেন। এতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকার ফুল বিক্রি করতে পেরেছিলেন। ফুল চাষ করে তিনি ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার পান। চলতি মৌসুমে কম জমিতে ফুল চাষ করা সম্পর্কে তিনি বলেন, জমিতে ফুলের আবাদ করার খরচ তুলনামূলক বেশি। ফুল চাষে ব্যাংক ঋণ পাওয়া খুবই কঠিন। ব্যাংক ঋণ পেলে আরও বেশি জমিতে তিনি ফুলের আবাদ করবেন।
সদরের বাঘোপাড়া এলাকার ফুলচাষি মো. বাদশা মিয়া বলেন, পাঁচ বছর ধরে ফুলের আবাদ করছি। চলতি মৌসুমে দুই বিঘা জমিতে ফুলের আবাদ করেছি। ফুলের আবাদ করতে প্রায় পাঁচ মাস লাগে। এ সময়ের মধ্যে এক বিঘা জমিতে ফুল চাষ করলে প্রায় এক লাখ টাকা লাভ করা যায়। তবে ফুলের পরিচর্যা করতে মজুর না পাওয়ায় ব্যাপকভাবে ফুল চাষ করতে পারছেন না অনেক চাষি। গোকুল এলাকার ফুলচাষি আবদুল হান্নান জানান, চার বছর ধরে ফুল চাষ করছি। এক বিঘা জমিতে ফসলের আবাদ করলে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা ঘরে তোলাও কষ্টকর। তবে ফুল চাষ করলে সব খরচ বাদ দিয়ে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা মুনাফা থাকে।
বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানিয়েছে, জেলায় প্রায় ১৩ প্রকারের ফুলের চাষ হয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, জারবেরা, বাগানবিলাস, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, কসমস, দোলনচাঁপা, নয়নতারা, মোরগঝুটি, কলাবতী, জবা প্রভৃতি। প্রায় পাঁচ বছর আগে বগুড়ার ফুল ব্যবসায়ীরা আশেপাশের জেলা থেকে ফুল নিয়ে আসতেন। সেদিন এখন অতীত। বর্তমানে এখানে উৎপাদিত ফুল দিয়েই স্থানীয় চাহিদা পূরণ হচ্ছে এবং বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ী তাদের ফুল কিনছেন। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সহযোগিতায় আশেপাশের চার জেলার মধ্যে বগুড়ায় ফুলের আবাদ বেশি বেড়েছে। ২০১২ সালে বগুড়ায় ফুলের আবাদ হয়েছিল সাড়ে চার হেক্টর জমিতে। আট বছরের ব্যবধানে বর্তমানে ফুলের আবাদ হচ্ছে প্রায় ৩০ হেক্টরে।
বগুড়া সদর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বগুড়া সদর, সোনাতলা, শিবগঞ্জ ও শেরপুর উপজেলায় ৩২০টি নার্সারি রয়েছে। এসব নার্সারিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতের দেশি-বিদেশি ফুল চাষ করা হয়। বগুড়ায় ফুলচাষিদের সংখ্যা বাড়ছে। ফুল চাষ বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান করে দিচ্ছে, তাই আমরা ফুল চাষে আগ্রহীদের জন্য কৃষি সহায়তার ব্যবস্থা করব।

পারভীন লুনা, বগুড়া