বাণিজ্য থেকে বিপণন কৌশলে বৈশাখী উৎসব  

  করপোরেট জগৎ

 

 

জাকারিয়া পলাশ : বাঙালির ব্যবসা-বাণিজ্যে বৈশাখ এক ঐতিহ্যবাহী উপলক্ষ। নববর্ষে গ্রামগঞ্জের দোকানিরা ক্রেতাদের নিমন্ত্রণ করতেন হালখাতায়। বাকির হিসাব চুকিয়ে দিয়ে মিষ্টিমুখ করে নতুন বছরে নতুন হিসাবের খাতা খুলে শুরু করতেন ব্যবসা। কিন্তু অর্থনীতির সেই পুরোনো ব্যবস্থা এখন আর চলছে না। সেসব ঐতিহ্য হারিয়ে বৈশাখী উৎসব এখন করপোরেট জগতের নতুন বিপণন কৌশলে রূপ নিয়েছে।

বাঙালির সার্বজনীন উৎসব হওয়ায় একে টার্গেট করে নানা আয়োজন করছে অভিজাত বিপণিবিতানগুলো। সে সঙ্গে ব্যাংক, বিমা, বহুজাতিক কোম্পানিও তাদের পণ্য ও সেবায় সংযোজন করেছে বৈশাখী বর্ণচ্ছটা। ঈদের মতোই উপহার, উপঢৌকন দেওয়া-নেওয়া হচ্ছে। তাতেও লাখছে বৈশাখী ছোঁয়া। মিষ্টি, মিঠাই, মুড়ি, মুড়কি, খই-চিঁড়ার মতো ফুটপাতের খাদ্যপণ্যগুলোও আধুনিক ও রঙিন মোড়কে আবদ্ধ হয়ে বিচরণ করছে অভিজাত অট্টালিকায়।

করপোরেট জগতে বিস্তৃত হওয়া এ বৈশাখী আমেজকে দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বলে মনে করছেন অনেকেই। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘অর্থনীতির মূল বিষয় হলো চাহিদা ও জোগান। বৈশাখী উৎসবের কারণে বিপুল পরিমাণ দেশি পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এসব পণ্যের জোগানও বাড়ছে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে কর্মসংস্থান। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো ঈদ কিংবা পূজার সময় বিদেশি পণ্য কেনার প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকে। কিন্তু বৈশাখ এলে দেশি পণ্যই প্রয়োজন হয় মানুষের উৎসবে। এসব পণ্যের বাজার বিস্তৃত হওয়ার কারণে অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মসংস্থান বাড়ছে। এটা অর্থনীতির জন্য ভালো।’

এ অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, করপোরেট জগতে বৈশাখের যে আমেজ এসেছে তাতে করে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সঙ্গে বড় শিল্পের সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। করপোরেট জগতেও মিষ্টি, মিঠাই, মুড়ি-মুড়কির মতো পণ্যগুলো বিক্রি হচ্ছে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি বিকাশের সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া একেবারেই বাঙালি ঘরানার পিঠা-পুলির পণ্যসামগ্রীর বিস্তৃতি হচ্ছে এ উৎসবে, যা বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য কার্যকর।

দেখা গেছে, বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানি বৈশাখকে কেন্দ্র করে গ্রাহক, ডিলার ও ব্যবসায়িক সহযোগীদের কাছে উপহার, উপঢৌকন পাঠাচ্ছে। বৈশাখী মেলা, কনসার্ট ও টিভি অনুষ্ঠান স্পন্সর করছে বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তা। এসব অনুষ্ঠানকে উপলক্ষ করে বাড়ছে তাদের পণ্যের বিপণন ও বিক্রি। বহুজাতিক কোম্পানির পাশাপাশি দেশি ব্র্যান্ডগুলোও যুক্ত হয়েছে বিজ্ঞাপনমুখী বিপণন প্রতিযোগিতায়। এদিকে সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অনেক কর্মীও বৈশাখ উপলক্ষে পেয়েছেন বোনাস। এতে কেনাকাটা ও বিনোদন ব্যয়ের সুযোগ হয়েছে নাগরিকদের। এ সুযোগে অভিজাত বিপণিবিতানগুলো তাদের পণ্যগুলোতে বিশেষ ছাড় ঘোষণা করেছে বৈশাখ উপলক্ষে।

বৈশাখের উৎসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন পণ্যেও অনেকে ছাড় ঘোষণা করেছেন। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের গ্রাহক ও সহযোগীদের বিপুল উপহার, বিদেশ ভ্রমণের সুযোগও দিচ্ছে বৈশাখ উপলক্ষে। বৈশাখী উৎসবকে বিপণনের এমন সুযোগ হিসেবে বড় কোম্পানিগুলো গ্রহণ করতে পারলেও মাঝারি ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো তা পারছে না। ফলে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বলে অভিমত দিয়েছেন অনেকে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রঙ উৎপাদক সমিতির সভাপতি এবং পেইলাক কেমিক্যাল কোংয়ের স্বত্বাধিকারী শফিক উল্লাহ খান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘রঙ খাতে অনেক বিদেশি কোম্পানি আছে বাজারে। এসব কোম্পানি বৈশাখ উপলক্ষে ডিলার ও গ্রাহকদের অনেককে নিয়ে নানা ধরনের আগ্রাসী মার্কেটিং করছে। তারা ডিলারদের নতুন প্যাকেজ অফার করছে, বিদেশে ট্যুরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এত সুবিধা আমরা দিতে পারিনি। আমরা হালখাতার চর্চা হারিয়ে ফেলেছি। কারণ, এখন হালখাতা করলে টাকা আদায় হয় না। আমরা কোনো রকম কারখানা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় আছি।’

একটি দেশি কোম্পানির বিপণন কর্মী মনিরুজ্জামান জানান, বৈশাখ উপলক্ষে আগে আমরা কোম্পানির বিভিন্ন ডিলারকে উপহার দিতাম। কোম্পানি থেকে গ্রাহকদের জন্য মিষ্টিও পাঠানো হতো। বকেয়া টাকার চেক পেলে তার দ্বিগুণ পরিমাণ পণ্য আবার বাকি দিয়ে দিতাম। কিন্তু এখন বড় বড় কোম্পানি ছাড়া এমন মার্কেটিং কেউ করছে না।