দুরে কোথাও ফিচার

বান্দরবানের টানে

কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা অনেক দিন ধরেই। সিদ্ধান্ত, সময় আর স্থানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রস্তুত হলো

১২ জনের একটি টিম। সবুজের চাদরে মোড়া বান্দরবানের বেশ ক’টি দর্শনীয় স্থান ঘুরে এসে লিখেছেন

মাঝহারুল ইসলাম সবুজ

অনেক দিন ধরেই পরিকল্পনা হচ্ছিল, যাবো। অবশেষে জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ঘুরে এলাম সবুজের চাদরে মোড়া বান্দরবান।

যেভাবে শুরু: সিলেট থেকে ট্রেনে রওনা হলাম চট্টগ্রামের উদ্দেশে ৬ অক্টোবর। সেখান থেকে বান্দরবান হয়ে রুমা বাজার। চান্দের গাড়িতে করে রুমা যাওয়ার পথ ভীষণ আঁকাবাঁকা ও খানাখন্দে ভরা। বাঁকগুলোতে মনে হয় আয়না বসানো। রাস্তার দুপাশ চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। শুধু পাহাড় আর পাহাড়। সবুজের কার্পেটে মোড়ানো আকাশচুম্বী পাহাড়ের গা ঘেঁষে ছুটে চলা মেঘগুলো দেখে অনেকটা তুলার মতোই মনে হয়। এ যেন অন্য জগৎ!

আমরা পাক্কা ১২ জনের টিম (গাইডসহ)। রুমা বাজারে হোটেল হিলটনে হলো আমাদের আস্তানা। তাজা লইট্যা মাছ ভুনা আর মুরগির মাংসের সঙ্গে ধনিয়া পাতার সালাদ দিয়ে হলো রাতের ভুরিভোজ।

বগা লেক: ঘড়ির কাঁটায় তখন ৮টা ৩০ মিনিট। রওনা হলাম বগা লেকের উদ্দেশে। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে প্রত্যেকের হাতে একটি করে পলিথিন। রুমা থানায় এন্ট্রির পর গেলাম ‘এগারো মাইল’ ক্রস করতে। উঠলাম চান্দের গাড়িতে।

প্রায় ১৭ কিলোমিটার খাড়া রাস্তা, পাহাড়ি ঢাল বেয়ে উপরে উঠতে হয়। কীভাবে যে আমাদের গাড়ি গন্তব্যে পৌঁছে দিলো বুঝতে পারিনি! বোধহয় প্রাণটা হাতে নিয়েই রেখেছিলাম।

এবার শুরু হলো দুর্গম পাহাড়ি পথে হাঁটা। কাঁধে ব্যাগ, পরনে শর্টস আর টিশার্ট, গ্লুকোজ ও স্যালাইন মেশানো পানির বোতল আর বুকভরা প্রত্যয় নিয়ে চলতে থাকলো ট্রেকিং। শুরুতেই খাড়া রাস্তা চলে গেছে ছোট্ট এক পাহাড়ি জনপদে। সেখান থেকে বাঁশ কেনা হলো। পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটতে এগুলো খুব কাজে দেয়।

পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সরু পিচ্ছিল পথ, আশপাশে শুধু সবুজের সমারোহ। ছোট ছোট পাহাড়ি ঝরনারও দেখা পাওয়া যায়। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে একসময় আমরা এসে পড়ি ছোট্ট এক জনপদে।

একটু বিশ্রাম, আবার নেমে গেলাম পাহাড়ে পথে। চারপাশের মোহনীয় রূপ যেন মন ছুঁয়ে যাচ্ছিল। চোখে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে ডাকছিল প্রকৃতির ডানাকাটা রূপের দিকে। এতো রূপের বাহার, ক্লান্তি এসেও হার মেনে ফিরে যাচ্ছে বারবার আমাদের কাছ থেকে। পাহাড়ের উচ্চতা আর মেঘের মিলন, আলিঙ্গন আবার ছেড়ে যাওয়া দেখে দেখেই হাঁটা চলতে থাকে। কমলা বাজার পৌঁছে আবার একটু বিশ্রাম।

সময় এখন দুপুর ১টা ৪০ মিনিট। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার পাহাড়ি ঢাল, জোঁক, কাঁদামাটির রাস্তা অতিক্রম করে পৌঁছে গেলাম বগা লেক।

ওহ! কী যে শান্তি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রূপ জৌলুস, পাহাড়ের মাঝখানে লেক, সবুজ পানি, পানিতে পাহাড় আর মেঘের প্রতিচ্ছবি এক অন্যরকম মুগ্ধতা ছুঁয়ে যায় সবাইকে।

সুন্দর বুঝি একেই বলে! সৃষ্টিকর্তার অপরূপ সৃষ্টি।

লেকে নামা নিষেধ। তাই পাড়ে বসেই গোসল সেরে নিলাম আমরা। প্রকৃতির বন্ধুত্বসুলভ আচরণের বদৌলতে আমরা বৃষ্টিঝরা বগা লেকের ফ্লেভারও পেয়ে গেলাম। প্রচণ্ড বৃষ্টি ঝরেছিল সেদিন।

কেওক্রাডং চূড়ায়

ঘড়িতে সময় তখন আড়াইটা। লক্ষ্য এবার কেওক্রাডং। পথে যেতে যেতে অনেক ঝরনার দেখা পেলাম। কোনটায় কোমরে হাত দিয়ে এক চুমুক, আবার কোনটায় হাঁটা না থামিয়ে পলক ফেলে দেখে নেওয়া চলছিল। আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিয়ে যখন আমরা দার্জিলিং পাড়ায়, তখন আর দিগন্তে সূর্যের আলোর রেশটুকুও অবশিষ্ট নেই।

ব্যাগ থেকে বের করলাম টর্চলাইট। আবার হাঁটা শুরু। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জোঁকের উৎপাতও।

ঝুপঝাপ রাত নেমে গেছে চোখের সামনে পাহাড়গুলোতে। আকাশ ছিল তারাভরা, রুপালি চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে, ঝিঁঝিঁ পোকারা থেমে নেইÑএর মধ্য দিয়েই আমরা হেঁটে চলেছি এখনও গন্তব্যের দিকে।

অবশেষে পৌঁছলাম কেওক্রাডংয়ের চূড়ায়। ঘড়িতে সময় তখন সাড়ে সাতটা। একটা কটেজে উঠলাম আমরা।

৯ অক্টোবর ভোর। বিছানা ছেড়ে প্রত্যেকে বের হয়ে গেলাম হাঁটতে। কেওক্রাডং হেলিপ্যাডে গিয়ে যা দেখলাম, চোখ ছানাবড়া অবস্থা! আসলে শব্দে এ সৌন্দর্য তুলে আনা এক কথায় অসম্ভব! সূর্য উঠছে দূর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে, ঝিরঝিরি কোমল মৃদুমন্দ হাওয়া, মেঘেদের ছুটে চলা আমাদের হেঁটে আসার ক্লান্তিকে নিমিষেই দূর করে দিলো। চোখের দৃষ্টি যত দূর যায়, কেবল পাহাড় আর পাহাড়। মনের কোণে একটা আফসোস খচ্খচ্ করে, ইশ! এখানটায় ছোট্ট একটা বাসা বানিয়ে যদি থাকা যেত! পরে চিংড়ি ঝরনা এবং পুনরায় বগা লেক হয়ে হোটেলে ফিরে এলাম আমরা।

রিঝুক ঝরনা ও নীলাচল

১০ অক্টোবর। নাশতা সেরে বের হয়ে পড়লাম আমরা। নৌকায় রওনা দিলাম রিঝুক ঝরনা। এক কথায় অসম্ভব সুন্দর! ফেরার তাগাদা থেকে রুমা বাজারে এসে নৌকায় রওনা হলাম বান্দরবান শহরের উদ্দেশে।

নৌকা সাঙ্গু নদীর বুক চিরে নিয়ে চললো আমাদের। বান্দরবান পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর হয়ে গেলো। এবার যাবো নীলাচলে। নীলাচলে পৌঁছে দেখি প্রচণ্ড ভিড়। বিকাল গড়িয়ে সন্ধে হয়ে এলো। নীলাচলে সূর্যাস্ত দেখে ধরলাম সিলেটের পথ।

হ্যাপি ট্রাভেলিং।

 

 

 

সর্বশেষ..



/* ]]> */