বান্দরবানের পথে পথে

ভ্রমণপিয়াসী মানুষ ঘুরে বেড়াতে চায় নতুন স্থানে। তাই প্রতি বছরের মতো এবার বান্দরবানে যাওয়ার পরিকল্পনা করি। এর আগেও সেখানে গিয়েছি। কিন্তু এবার যাব বান্দরবানের নাফাকুম, অমিয়কুম, সাতভাইকুম ও ভেলাকুম ঝরনা দেখতে। আমাদের দলের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমরা এক জায়গা দুবার ভ্রমণ করি না।

পরিকল্পনা
দলে আমরা ১৪ জন। প্রথমে দিনক্ষণ ঠিক করতে হবে। দলের সবাই ছাত্রজীবন সম্পন্ন করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসটি সরকারি ছুটির দিন হওয়ার ২২ ফেব্রুয়ারি একদিনের ছুটি নিলে ২৩ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি শুক্র ও শনিবারÑমোট চার দিনের ছুটি। দীর্ঘ ছুটির কারণে ১০ দিনে আগে বাসের টিকিট সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখি বান্দরবান যাওয়ার সব টিকিট অগ্রিম বিক্রি হয়ে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে চট্টগ্রামের বাসের টিকিট সংগ্রহ করতে হলো। সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হলোÑরাত ১০টায় কমলাপুর বাস টার্মিনালে আসার। বন্ধু মোহাম্মদ কিবরিয়া পারিবারিক সমস্যার কারণে আমাদের সঙ্গে যেতে পারল না।

ঢাকা থেকে থানচি
আমরা ১৩ জন রাত ১০টায় বাসে করে রওনা দিলাম। আপাতত গন্তব্য চট্টগ্রাম। রাস্তায় জ্যামের কারণে পাঁচ ঘণ্টার পথ ১১ ঘণ্টায় পাড়ি দিতে হলো। সকাল ৯টায় চট্টগ্রামের জিএসসি মোড়ে নামি। আমাদের এক বন্ধু সঙ্গে যোগ দিলেন। এখন আমরা ১৪ জন। সকালের নাশতা সেরে রওনা দিলাম বান্দরবানের বাস কাউন্টারে। বেলা ১১টায় বাস ছাড়ল বান্দরবানের উদ্দেশে। এখানে একটি নতুন অভিজ্ঞতা হলো। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বালুরঘাট সেতু দেখা ও চড়ার। এর আগে আমানত শাহ সেতু পাড়ি দিয়ে কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি গিয়েছি।
বালুরঘাট সেতু কর্ণফুলীর ওপর দিয়ে গেছে। সেতুটি এক লেনবিশিষ্ট। সেতু দিয়ে সড়ক ও রেল উভয়ই চলাচল করে, যা এর আগে দেখিনি। দুপুর দেড়টায় বান্দরবান বাস টার্মিনালে পৌঁছালাম। এখানে দুপুরের খাবার সেরে একটা চান্দের গাড়ি (জিপের স্থানীয় নাম) ভাড়া করলাম ছয় হাজার টাকায়, থানচি বাজার নিয়ে যাবে। বেলা সাড়ে তিনটায় রওনা হলাম গাড়িতে। শুরু হলো আমাদের রোমাঞ্চকর ভ্রমণ। আমরা এর আগে নীলগিরি গিয়েছি এ গাড়িতে চড়ে একই রাস্তায়। কিন্তু এবার সঙ্গে কিছু নতুন বন্ধু যোগ দেওয়ায় বেশি মজার অভিজ্ঞতা ঝুলিতে পুরি।
আমাদের গাড়ি রওনা দিল। গাড়িটি যখন বান্দরবান শহর থেকে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তায় আসে, ঠিক তখনই চোখে পড়ল পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য-দৃশ্য। এক পাশে পাহাড়, অন্য পাশে খাড়া খাদ। একটু অসাবধানতায় ঘটতে পারে যে কোনো দুর্ঘটনা। তখন আমাদের মধ্যে একটা ভীতি কাজ করছিল। গাড়িটি যখন উঁচুতে উঠতে লাগল, তখন দূরের মেঘ মনে হলো আমরা ধরতে যাচ্ছি। তখন সবাই হইহল্লায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কেউ গাড়ির সিট থেকে উঠে লাফাতে শুরু করল, কেউ আবার গলা ছেড়ে গান শুরু করল, কেউবা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে পাহাড়ি সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগল। পাহাড়ের বুকচিরে গাড়ি এগোতে লাগল। এর মাঝে জেলার শৈলপ্রপাত, চিম্বুক পাহাড়, নীলগিরি প্রভৃতি অতিক্রম করে থানচি বাজারে এসে পৌঁছালাম। তখন সন্ধ্যা ৬টা।
প্রথমে বাজারের টুরিস্ট অফিসে গেলাম নাফাকুম যাওয়ার পথ সম্পর্কে ধারণা নিতে। পরে একটি রেস্টহাউজে উঠি। রেস্টহাউজটি ছিল কাঠের তৈরি, অস্থায়ী। রাতের খাবার এখানকার একটি হোটেলে খাই। আমরা থানচি বাজারের ঐতিহ্যবাহী সাঙ্গু নদী দেখার জন্য ওই রাতেই ঘুরতে গেলাম। পানিতে নামার লোভ কেউ সামলাতে পারল না। কিন্তু নদীতে পানি ছিল হাঁটু পরিমাণ। তাই মগ দিয়ে গোসল করতে হয়েছে। পাহাড়ি ঝরনার পানি নদীতে এসে আছড়ে পড়ছে। এই পানি সাঙ্গু নদী দিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিলিত হয়। মজার ব্যাপার হলো, এটাই বাংলাদেশের একমাত্র নদী, যার উৎপত্তি ও শেষ বাংলাদেশেই।

থানচি থেকে নাফাকুম
নাফাকুম পর্যন্ত নৌকা যেতে পারে না। তাই রেমাক্রি যাওয়ার জন্য নৌকা ঠিক করলাম পাঁচ হাজার টাকায়, তিন দিনের জন্য। নৌকাগুলো ছিল ইঞ্জিনচালিত। তিনজন গাইডসহ আমরা ১৫ জন। এক নৌকায় পাঁচজনের বেশি যাওয়া যাবে না। প্রতি নৌকা দুই হাজার টাকা করে।
সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠি। সকালের নাশতা করে চলে যাই টুরিস্ট অফিসে। সেখানে বিদ্যাবিদের কাছে নাম নিবন্ধন করে নৌকায় উঠে পড়লাম। নৌকা ছাড়ল সকাল ৯টায়। থানচি বাজার থেকে স্থানীয় জুতা সংগ্রহ করলাম। কারণ পাহাড় ও ঝরনার পানি-সহনীয় জুতা না হলে এখানকার পরিবেশের সঙ্গে চলতে অসুবিধা হবে। শুরু হলো আরেক রোমাঞ্চকর যাত্রা, স্রোতের প্রতিকূলে নৌকা চলতে শুরু করল। নৌকা চলে এলো বান্দরবানের ঐতিহ্যবাহী রাজাপাথর নামক স্থানে। সাঙ্গু নদী সম্পূর্ণ পাহাড়ি ঢল ও পাথরে পূর্ণ। এর মধ্যে রাজাপাথরটি বড়। রাজাপাথরকে স্থানীয় আদিবাসীরা পূজা করে বিধায় পাথরের ওপর ওঠা কিংবা হাত দেওয়া নিষেধ। বেলা ১১টায় রেমাক্রি এসে পৌঁছালাম। এখানে দেখার অনেক কিছু রয়েছে। কিন্তু সময়স্বল্পতার কারণে দেখতে পারলাম না। এরপর আমাদের উদ্দেশ্য নাফাকুম। হাঁটতে শুরু করলাম রেমাক্রি থেকে নাফাকুম। পাহাড়ের মধ্যে ঝরনার ঝিরি ধরে গাইডকে অনুসরণ করে চলতে লাগলাম। পথে দুবার বিরতি ও হালকা নাশতা করি। অবশেষে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ঝরনার আওয়াজ কানে বাজতে লাগল। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। যত কাছে যাই, ঝরনার আওয়াজ বাড়ে। অবশেষে দুপুর ১টায় আমাদের প্রথম গন্তব্যে পৌঁছাই। নাফাকুমের পাশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এক ব্যক্তির বাড়িতে ব্যাগ রেখে প্রয়োজনীয় জিনিসÑযেমন টাওয়েল, ক্যামেরা প্রভৃতি নিয়ে নাফাকুমের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে চলে এলাম। কারোই আর তর সইছে না। অনেকে ওপর থেকে লাফ দিয়ে ঝরনার পানিতে নিজেদের শীতল করে নিল। কেউ ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কেউ আবার অপরূপ দৃশ্য নীরবে অবলোকন করতে লাগল। এ এক অপরূপ সৌন্দর্যের আধার নাফাকুম শৈলপ্রপাত। দুই ঘণ্টা এখানে কাটিয়ে সবাই ক্লান্ত হয়ে উপজাতিদের বাড়ি ফিরে গেলাম। সেখানে দুুপুরে খাবার তালিকায় ছিল জুমচালের ভাত, ডিম সেদ্ধ, আলুভর্তা আর পাতলা ডাল। খাবারগুলো সবাই ভক্তি না করে খেলেও জীবন বাঁচানোর জন্য খেতে হলো। খেয়ে ২০ মিনিট বিশ্রাম নিলাম। আবার ভ্রমণ শুরু।

থুইচিপাড়া
থুইচিপাড়াটি আদিবাসীদের এলাকা। এখানের পাহাড়ের টিলায় তারা বাস করে। ঝরনার ঝিরি ধরে গাইডকে অনুসরণ করে পথ চলতে শুরু করলাম। তখন আনুমানিক বেলা ৩টা। পথও বেশ দুর্গম। আঁকাবাঁকা পাথরগুলো। প্রাকৃতিক রূপ যেমন বান্দরবানে আছে, ঠিক তেমনি এ রূপের কাছে যাওয়াও ভয়ঙ্কর। সেই আঁকাবাঁকা পাহাড় পাড়ি দিয়ে লোকালয়ে দুবার বিশ্রাম নিয়ে থুইচিপাড়ায় গেলাম। তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। সেখানে রাত কাটালাম নির্জন পাহাড়ি টিলায় বিদ্যুৎবিহীন এক এলাকা। এখানে আবার একই খাবার খেলাম। তবে ডিমের বদলে ছিল পাহাড়ি মুরগি।

দেবতার পাহাড়
সকাল হলো। নাশতা মানে সে একই খাবার। কারণ এখানে কোনো খাবার হোটেল নেই, যা খাবেন তা আদিবাসীদের বললে রান্না করে দেয়। মাচাঘরে রাত কাটাতে হয়। এরপর নতুন এক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী গাইডের হাতে তুলে দিল আমাদের। সে পাহাড় থেকে সবার জন্য ছোট ছোট বাঁশ কেটে লাঠির ব্যবস্থা করল। পাহাড়ে ওঠার জন্য যা খুব দরকার। ছোট কিছু পাহাড় পাড়ি দিয়ে এলাম দেবতার পাহাড়ে, যার উচ্চতা ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট। এ পাহাড় থেকে নামতেই তিন ঝরনা ভেলাকুম, অমিয়কুম ও সাতভাইকুম। পাহাড়টি এতই খাড়া যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তাল ঠিক রেখে নিচে নামা খুব কষ্টকর। প্রায় এক ঘণ্টা সাহসী অভিযান শেষে সবাই অক্ষত অবস্থায় নিচে নামতে সমর্থ হলাম। পাহাড়টির কিছু জায়গায় বুদ্ধি খাটিয়ে গাছের সাহায্যে সাবধানতার সঙ্গে নামতে হয়েছে। বিশ্রাম নিয়ে ভেলাকুমের উদ্দেশে রওনা দিলাম। ভেলাকুমের বৈশিষ্ট্য হলো ভেলা। ভেলায় করে কুম ও ঝরনায় যেতে হয়। ভেলার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। ওখানে ভেলা মাত্র একটি। ভেলায় করে কিছুদূর যাওয়ার পর নামিয়ে দিল। ১০ থেকে ১৫ মিনিট পাথরের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে দেখতে পেলাম ভেলাকুম ঝরনা। এরকম দুর্গম ঝরনা এর আগে দেখিনি। ওই ঝরনায় যেতে কয়েকবার দুর্ঘটনায় পড়তে গিয়েছিলাম। ঝরনাটির চার পাশে উঁচু পাহাড়, গভীর বন। তাই জোঁকের উৎপাত বেশি ছিল। বেশি সময় অতিবাহিত না করে চলে গেলাম অমিয়কুম ঝরনায়। ভেলাকুম থেকে মাত্র ১০ মিনিটের পথ। ভেলাকুমের ঝরনার পানিই এ ঝরনা দিয়ে নিচের দিকে ধাবিত হয়। অনিয়কুম থেকে সর্বশেষ সাতভাইকুম পাঁচ মিনিটের পথ। কিন্তু সাতভাইকুমের কাছে যেতে পারলাম না; কারণ পথ ভীষণ অমসৃণ। তাই দূর থেকে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখে ফিরে এলাম। এই তিন ঝরনার মধ্যে অমিয়কুম কম ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তাই সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম ভিজব। পরে যে যার মতো প্রকৃতির রূপ উপভোগ করতে লাগল। কেউ পাথরের ওপর বসে গভীর ধ্যানে মগ্ন, কেউ সেলফি তোলায় ব্যস্ত, কেউবা ঝরনার পানিতে ভিজতে লাগল। সবাই মনের মতো করে জায়গাটা উপভোগ করতে লাগল।
এবার আমাদের ফেরার পালা। ফেরার পথে রাবার বাগান, পাহাড়ি গরু দেখতে পেলাম। অনিয়কুম থেকে বিকাল ৪টায় রওনা দিয়ে সন্ধ্যার অনেক আগে থুইচিপাড়ায় এলাম। হাত-মুখ ধুয়ে বিশ্রাম নিলাম। রাতে গানবাজনা, হৈহুল্লোড় তো ছিলই। এখানে দিনে যেমন রোদের তাপ আর রাতে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা।

থুইচিপাড়া থেকে ঢাকা
বান্দরবান ভ্রমণ শেষের পথে। থুইচিপাড়া থেকে সকাল ৬টায় ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলাম। এখন আমাদের চোখ সাঙ্গু নদীর দিকে। কখন সাঙ্গু নদী ও হাঁটাপথ শেষ হবে! বেলা ১টা ৩০ মিনিটে থানচি বাজারে এলাম। বাজার থেকে গাড়িতে করে বান্দরবানের উদ্দেশে রওনা দিলাম। গাড়িতে কারও মধ্যে আনন্দ দেখলাম না। কারণ পাহাড়ি অভিযানে সবাই ক্লান্ত ছিল। সন্ধ্যা ৬টায় বান্দরবান বাস টার্মিনালে এলাম। আমাদের রাত ১০টার গাড়ি ঠিক করা ছিল। তাই বান্দরবান ফিরে যে যার মতো বার্মিজ মার্কেটে কেনাকাটা করে নিলাম। রাত ১০টা ২০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলাম। ফিরতে ফিরতে চিরচেনা জ্যামে আটকা পড়লাম কুমিল্লার দাউদকান্দি সেতুর কাছে এসে। সকাল ৯টায় ঢাকায় এসে পৌঁছালাম। এভাবেই বান্দরবান অভিযান শেষ হলো। কিন্তু এবারের মতো অভিযান এর আগে কখনও হয়নি। সব মিলিয়ে ভ্রমণটা ছিল বেশ রোমাঞ্চকর।

মো. সাজ্জাদ হোসেন, ব্যাংক কর্মকর্তা