দিনের খবর সারা বাংলা

বান্দরবানে পানিবন্দি ৩০ হাজার মানুষ

চার দিনেও চালু হয়নি সড়ক যোগাযোগ

এমএ শাহরিয়ার, বান্দরবান: অবিরাম বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানে সাতটি উপজেলায় ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যার পানিতে প্রধান সড়কসহ অভ্যন্তরীণ বেশিরভাগ সড়ক প্লাবিত হওয়ায় চতুর্থ দিনেও চালু হয়নি সারা দেশের সঙ্গে বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ। এছাড়া পাহাড় ধসে পড়ায় ও সড়কে পানি ওঠায় জেলার রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাও বন্ধ রয়েছে। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি এখনও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে বৃষ্টির পরিমাণ কমে যাওয়ায় প্লাবিত এলাকাগুলো থেকে পানি নামতে শুরু করেছে।
প্রশাসন সূত্র জানায়, গত শনিবার থেকে অবিরাম বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের সাতটি উপজেলায় বন্যা দেখা দেয়। সদর, রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ৩৩টি ইউনিয়ন এবং দুটি পৌরসভায় ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাইক্লোন সেন্টারে ১২৬টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এগুলোতে অবস্থান নিয়েছে হাজার হাজার বন্যাদুর্গত পরিবার। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে দুর্গতদের মাঝে স্থানীয় প্রশাসন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে খিচুড়ি ও খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। তবে প্লাবিত এলাকাগুলোতে এখন পর্যন্ত ত্রাণ বিতরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন বন্যা আক্রান্তরা।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে হঠাৎ করে মধ্যরাত পর্যন্ত হু-হু করে বন্যার পানি বাড়তে থাকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেম্বারপাড়া, ক্যাচিংঘাটা, বালাঘাটা, কালাঘাটা, নতুনপাড়া, ফায়ার সার্ভিস এলাকা, হাফেজঘোনা, সেনানিবাস এলাকা, বাসস্ট্যান্ডসহ আশপাশের এলাকাগুলোর শত শত ঘরবাড়ি বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়। এছাড়া রুমা, থানচি, বলিবাজার, লামা, আলীকদম, রোয়াংছড়ি ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা বাজার এলাকা প্লাবিত হয়। বৃহস্পতিবার রাত দেড়টা পর্যন্ত বন্যার পানি বাড়তে থাকে প্লাবিত এলাকাগুলোয়।
বন্যায় দুর্ভোগের শিকার মোহাম্মদ কাশেম, রেহেনা আকতার ও মোহাম্মদ হানিফ অভিযোগ করে বলেন, বন্যায় ঘরবাড়ি সব পানিতে তলিয়ে গেছে তিন দিন হচ্ছে। রান্না করার কোনো সুযোগ নেই, খাবার পানিও নেই। কিন্তু প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে কোনো ত্রাণ দেওয়া হয়নি। শুধু আশ্রয় কেন্দ্রের বাসিন্দারের খিচুড়ি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদের কোনো খবর নেওয়া হচ্ছে না।
সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোহাম্মদ আলমগীর জানান, বন্যায় দুর্গতদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে অবস্থান নেওয়া দুর্গতদের খিচুড়ি, পানি ও শুকনো খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। পৌরসভা ও উপজেলা প্রশাসন যৌথভাবে দুর্গতদের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।
শৈলসভা পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি আবদুল কুদ্দুছ জানান, বন্যায় বান্দরবান-কেরানীহাট প্রধান সড়কের বাজালিয়া, দস্তিরদাহাট ও বরদুয়ারাÑতিনটি পয়েন্ট প্লাবিত হয়েছে। ফলে সারা দেশের সঙ্গে বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ চার দিনেও চালু হয়নি। এছাড়া রুমা, থানচি, রোয়াংছড়িসহ অভ্যন্তরীণ সব রুট প্লাবিত হওয়ায় ও পাহাড়ধসে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে গত বৃহস্পতিবার থেকে।
বাজারের ব্যবসায়ী নূর মোহাম্মদ ও মোহাম্মদ ঝুনু জানান, চার দিন ধরে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় বান্দরবানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ সবজির সংকট দেখা দিয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বান্দরবানের মৃত্তিকা ও পানি সংরক্ষণ কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহাবুবুল ইসলাম জানান, বৃষ্টিপাত অনেক কমে গেছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টি কমে যাওয়ায় প্লাবিত অঞ্চলগুলো থেকে নেমে যাচ্ছে বন্যার পানি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ ফুট পানি কমেছে। তবে শুক্রবার রাতে ভারী বৃষ্টিপাত হলে বন্যার পানি আবারও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া সপ্তাহজুড়ে অবিরাম বৃষ্টি হওয়ায় পাহাড় ধসের শঙ্কা খুবই বেড়ে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোর বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক দাউদুল ইসলাম জানান, বন্যাদুর্গতদের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণ মজুত রয়েছে প্রশাসনে। সাতটি উপজেলায় ১২৬টি আশ্রয় কেন্দ্রে অনেক মানুষ অবস্থান করছে। দুর্গতদের মাঝে খিচুড়ি ও শুকনো খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। পাহাড়ধসের আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো থেকে লোকজনদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে।

সর্বশেষ..