বাবরসহ ১৯ আসামির মৃত্যুদণ্ড, তারেকের যাবজ্জীবন

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে নৃশংস গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মামলার অপর ১১ আসামিকেও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন দুই মামলায় এ রায় ঘোষণা করেন।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় আইভী রহমানসহ ২৪ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন আরও অনেক নেতাকর্মী। প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ওই ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা করা হয়। তারেক রহমানসহ মোট ৪৯ জনকে এ মামলার আসামি করা হয়।
মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৯ আসামি হলেনÑলুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, ডিজিএফআই’র সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএসআই’র তৎকালীন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ হানিফ, শেখ আবদুস সালাম, মাওলানা তাজউদ্দিন, মো. আবদুল মাজেদ ভাট ওরফে ইউসুফ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মদ ওরফে জিএম, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মহিব্বুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডাক্তার জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহমেদ তামিম, মাইন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মাইন ওরফে খাজা ওরফে আবু জানদাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ, রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ ওরফে খালিদ সাইফুল্লাহ ওরফে শামিম ওরফে রাশেদ এবং মো. উজ্জ্বল ওরফে রতন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের এক লাখ টাকা করে জরিমানাও করেছেন আদালত।
যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত ১৯ আসামি হলেনÑতারেক রহমান, কুমিল্লার সাবেক সংসদ সদস্য শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন কায়কোবাদ, শাহাদাত উল্লাহ জুয়েল, মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আবু ওমর আবু হোমায়রা ওরফে পীর সাহেব, মাওলানা সাব্বির আহমেদ ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির, আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক কমিশনার আরিফুল ইসলাম আরিফ, আবু বকর সিদ্দিক ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, আনিসুল মোর্সালীন, মুহিবুল মুক্তাকীন, খলিলুর রহমান খলিল, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে বদর, মো. ইকবাল, মাওলানা লিটন ওরফে জোবায়ের ওরফে দেলোয়ার, হারিছ চৌধুরী, বাবু ওরফে রাতুল বাবু, শফিকুর রহমান ও মুফতি আবদুল হাই। এ আসামিদের সবাইকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
এছাড়া বাকি ১১ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশের সাবেক মহাপরিচালক (আইজিপি) খোদা বক্স চৌধুরী, সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অব.) রুহুল আমিন, এএসপি (অব.) আবদুর রশিদ ও এএসপি (অব.) মুন্সি আতিকুর রহমানকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা ও অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে বেগম খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, আইজিপি আশরাফুল হুদা, আইজিপি শহুদুল হক, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান ও ডিএমপির উপকমিশনার (দক্ষিণ) খান সাঈদ হাসানকে দুই বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাদের ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রা উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে মঞ্চ তৈরি করা হয়। সেখানে বক্তব্য দিচ্ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে পরপর দুটি বিস্ফোরণ ঘটে। পরে আরও কয়েকটি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটে। এতে সেখানে অসংখ্য মানুষের রক্তাক্ত নিথর দেহ পড়ে থাকার পাশাপাশি আহতদের আর্তনাদে ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ওই হামলায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা আইভী রহমানসহ সব মিলিয়ে ২৪ জন নিহত হন। আহত হন শত শত নেতাকর্মী। নিহতদের মধ্যে ঘটনাস্থলেই মারা যান ১৬ জন। আইভী রহমান ৫৮ ঘণ্টা পর ২৪ আগস্ট মারা যান। আর দেড় বছর পর মৃত্যু হয় ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের। নিহতদের মধ্যে আরও ছিলেন শেখ হাসিনার দেহরক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রহমান, হাসিনা মমতাজ, রিজিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), রতন শিকদার, মোহাম্মদ হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ প্রমুখ। এছাড়া একজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পরদিন মতিঝিল থানায় একটি মামলা করেন পুলিশের তৎকালীন এসআই শরীফ ফারুক আহমেদ। চার বছর পর ২০০৮ সালের ১১ জুন হত্যার অভিযোগ এবং বিস্ফোরক আইনে আলাদা দুটি অভিযোগপত্র দেন সিআইডির জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির। হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ ২২ জনকে এতে আসামি করা হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মামলাটির অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন। সিআইডির বিশেষ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ অধিকতর তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ৩ জুলাই আরও ৩০ আসামিকে যুক্ত করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেন।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে এ মামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে অধিকতর তদন্তে উঠে আসে। হামলার বিষয়ে নোয়াখালীর জজ মিয়ার ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি’ দেওয়ার বিষয়টি নাটক ছিল বলে জানানো হয়। নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে জজ মিয়া নামে এক যুবককে গ্রেফতারের পর তার কাছ থেকে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করা হয়।