দিনের খবর সারা বাংলা

বাস্তুহারা ও পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক পরিবার

লক্ষ্মীপুরে মেঘনার ভাঙন

জুনায়েদ আহম্মেদ, লক্ষ্মীপুর: মেঘনার অব্যাহত ভাঙনে লক্ষ্মীপুরে বাস্তুহারা ও পানিবন্দি হয়ে পড়ছে এ অঞ্চলের লক্ষাধিক পরিবার। পানিবন্দি হয়ে পড়ায় পানিবাহিত রোগ নিয়েও শঙ্কিত স্থানীয়রা। আর মেঘনা নদীর ৩৭ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণে প্রকল্পের কাজের ধীরগতির কারণে বাস্তুহারার সংখ্যাও দিন দিন বেড়েই চলেছে। জেলার রামগতি থেকে রায়পুর পর্যন্ত মেঘনার অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হচ্ছে এ অঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর জমি। প্রতিনিয়ত মানুষ হারাচ্ছে তাদের ঘরবাড়ি। গত কয়েক দিন টানা বর্ষণে অনেক জায়গায় আবার ভাঙন দেখা দিয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) লক্ষ্মীপুরের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, মেঘনায় সবচেয়ে বেশি ভাঙনকবলিত এলাকা হিসেবে লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে তীর সংরক্ষণে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় তিন ধাপে ৩৭ কিলোমিটার নদীর তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজে প্রায় এক হাজার ৩৫০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
প্রথম ধাপে ২০১৪ সালে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় মেঘনা নদীর ভাঙন প্রতিরোধে ১৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রামগতি মাছঘাট ও আলেকজান্ডার উপজেলায় সাড়ে চার কিলোমিটার এবং কমলনগরের মাতাব্বর নগর এলাকায় এক কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়।
দ্বিতীয় ধাপে রামগতি উপজেলার রামদয়াল এলাকায় সাত দশমিক ৬০ কিলোমিটার ও কমলনগর উপজেলার সাহেবের হাট থেকে মতিরহাট এলাকায় আট দশমিক ২২৪ কিলোমিটার এবং তৃতীয় ধাপে রামগতির আলেকজান্ডার থেকে কমলনগর উপজেলার চরফলকন এলাকা পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার এবং কমলনগর উপজেলার চরফলকন থেকে মাতাব্বর নগর এলাকায় সাড়ে ১০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হবে।
তবে ২০১৪ সালে কমলনগরে মেঘনা নদীর তীররক্ষা বাঁধে ৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দে নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি এক কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের কাজ পায়। কিন্তু অর্থ বরাদ্দের দুই বছর পর প্রতিষ্ঠানটি ২০১৬ সালের ২৩ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কাজ শুরু করে। নিম্নমানের বালি ও জিওব্যাগ দিয়ে কাজ শুরু করার অভিযোগে স্থানীয়দের চাপের মুখে নির্মাণকাজ শুরুতেই বন্ধ হয়ে যায়। বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও যথাযথভাবে কাজ করার দাবিতে ওই সময় মানববন্ধন করেন স্থানীয়রা।
নানা বাধার পরও প্রতিষ্ঠানটি কাজ শুরু করলে ২০১৭ সালের জুনের শেষ দিকে নির্মীয়মাণ বাঁধে ধস নামে। এরপর প্রায় বাঁধের কোনো না কোনো অংশ ভাঙনের কবলে পড়ে। সর্বশেষ চলতি বছর মে মাসে তীররক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়।
নদীভাঙন নিয়ে গবেষণারত বেসরকারি সংস্থা সিইজিআইএসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত লক্ষ্মীপুরে মেঘনা নদীর ভাঙনে তিন হাজার ৫৯৫ হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নদীভাঙনে গৃহহীন অনেকেই অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। আবার অনেকে খোলা আকাশের নিচে, বেড়িবাঁধ ও রাস্তার পাশে বা খাসচর ও খাসজমিতে ঠাঁই নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছে।
আর বেসরকারি গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণের প্রতিবেদনে বলা হয়, লক্ষ্মীপুরে আশির দশক থেকে মেঘনা নদীর ভাঙনের তীব্রতা যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও। এ পর্যন্ত জেলায় ভূমিহীনদের প্রায় ৫০ শতাংশই নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। আর এ নদীভাঙনের কারণে এক ব্যক্তির জীবনে গড়ে ২২ বার ঠিকানা বদল করতে হয় বলেও সংস্থাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার পশ্চিম সীমানার উত্তর-দক্ষিণ বরাবর মেঘনা নদী বহমান। ২০০৬ সালে রামগতি উপজেলার উত্তরাঞ্চলের ছয়টি ইউনিয়নের ৩১৪ দশমিক ৮৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত হয় কমলনগর উপজেলা। কমলনগর উপজেলা গঠনের ১৬ বছর আগেই এ অঞ্চলের ১৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য আর ১০ কিলোমিটার প্রস্থের ১৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকা মেঘনায় বিলীন হয়ে যায়। কমলনগরের উত্তর-পশ্চিম সীমানা মতিরহাট থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পশ্চিম সীমানা রামগতি উপজেলার চর আলেকজান্ডার ইউনিয়নের বালুচর গ্রামের জারিরদোনা খাল পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার এলাকা মেঘনা নদী দ্বারা বেষ্টিত। এ উপজেলার একেবারে মাঝখান দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে লক্ষ্মীপুর-রামগতি আঞ্চলিক সড়ক গেছে। ১৯৯০ সালের আগে লক্ষ্মীপুর-রামগতি আঞ্চলিক সড়ক থেকে পশ্চিম দিকে মেঘনা নদীর তীরবর্তী এলাকা চরকাঁকড়া এবং কোরালিয়ার গড় দূরত্ব ছিল ২৯ কিমি। ২০০৬ সাল থেকে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত লক্ষ্মীপুর-রামগতি আঞ্চলিক সড়ক থেকে পশ্চিম দিকে মেঘনা নদীর গড় দূরত্ব এসে দাঁড়ায় তিন কিলোমিটারে। অর্থাৎ ২০০৬ সাল থেকে ১৩ বছরে পূর্ব দিকে মেঘনা সরে এসেছে আরও ১৪ কিলোমিটার। তবে এর মধ্যে কমলনগর উপজেলা সদরের হাজিরহাট বাজার থেকে মেঘনা নদীর দূরত্ব মাত্র দুই কিলোমিটার।
স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, মেঘনার অব্যাহত ভাঙনে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার রঘুনাথপুর, বড়খেরী, গাবতলী, সেবাগ্রাম, আসলিপাড়া, চর আবদুল্লাহ, কাঁঠালিয়া, রামগতি-লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক মহাসড়কসহ আরও বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন হয়ে যায়। ১৯৯০ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের চরকাঁকড়া, কোরালিয়া, লামচি কৃষ্ণপুর, চরবালুয়া, চরকৃষ্ণপুর, চরমানিকপুর, উড়িরচর, পাতারচর, কটরিয়া, চরমাতাব্বর এবং পাতাবুনিয়াসহ ১১টি বড় গ্রাম নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
মেঘনার ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কমলনগর উপজেলা। ২০০৬ সাল থেকে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত মেঘনায় বিলীন হতে শুরু করেছে এ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন। এর মধ্যে চরকালকিনি ইউনিয়নের ছয়টি ওয়ার্ড পূর্ণাঙ্গভাবে বিলীন হয়ে যায় এবং ১, ২ ও ৩নং ওয়ার্ড মেঘনায় বিলীন হওয়ার পথে। সাহেবেরহাট ইউনিয়নের পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ ওয়ার্ড শেষ হয়ে ভাঙনের তাণ্ডব চলছে ৪, ৫, ৭ ও ৮নং ওয়ার্ডে। পাটারিহাট ইউনিয়নের ১ ও ৯নং ওয়ার্ড বিলীন হয়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে ২, ৭ ও ৮নং ওয়ার্ডে। চর ফলকন ইউনিয়নের পুরো ৯নং ওয়ার্ড বিলীন হয়ে ৩, ৭ ও ৮নং ওয়ার্ডে ভাঙন চলছে। নতুন করে চরলরেঞ্চ ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড ও চরমার্টিন ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডে ভাঙন শুরু হয়েছে।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চররমণীমোহন ইউনিয়নের কিছু অংশ ও রায়পুর উপজেলার হাজীমারা, চরকাচিয়া, চরখাসিয়া, জালিয়ারচর, চরইন্দুরিয়া-সহ বেশ কিছু এলাকায় ভাঙনে বাস্তুহারা হয়েছে সহস্রাধিক পরিবার। মেঘনার ভাঙনে গত কয়েক বছরে এ অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষের ঘরবাড়িসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির ও প্রায় চার হাজার ১০০ হেক্টর জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
কমলনগর উপজেলার পাটারিহাট ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল আমিন রাজু জানান, মেঘনার ভাঙনে এ ইউনিয়নের ১ ও ৯নং ওয়ার্ড সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে ২, ৭ ও ৮নং ওয়ার্ডে। দ্রুত বাঁধ নির্মাণ না হলে এ ইউনিয়নের পুরোটাই নদীগর্ভে তলিয়ে যাবে।
একই উপজেলার সাহেবেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবুল খায়ের জানান, নদীভাঙনের কারণে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় চারবার স্থানান্তর করতে হয়েছে। কয়েক বছরে এ ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ড, পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মাধ্যমিক স্কুল, একটি দাখিল ও দুটি আলিম মাদ্রাসা এবং কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড লক্ষ্মীপুরের প্রকৌশলী মো. মুসা জানান, দ্বিতীয় পর্যায়ে তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনা (ডিপিপি) প্রস্তুত করতে ১৫ দশমিক পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় সার্ভে করা হয়েছে। সার্ভে রিপোর্টের পর ডিজাইন ডেটা বা নকশা প্রস্তুত করে প্রাক্কলন তৈরি করে ডিপিপি-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সংশ্লিষ্ট দফতরের অনুমোদন পেলে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সর্বশেষ..



/* ]]> */