বাড়ুক এফডিআই’র অন্তর্মুখী প্রবাহ

জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আংকটাড) প্রণীত ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট, ২০১৮-এর ভিত্তিতে প্রস্তুত বুধবারের শেয়ার বিজে ছাপা ‘এফডিআই ৭.৮% কমলেও বিদেশে গেছে ৩১৯% বেশি’ শিরোনামের খবরটি অনেক পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে। প্রতিবেদক জানাচ্ছেন, ২০১৭ সালে বিদেশি বিনিয়োগে হোঁচট খেয়েছে বাংলাদেশÑযেখানে পার্শ্ববর্তী মিয়ানমারে গত বছর এটা বেড়েছে আনুমানিক ৪৫ শতাংশ। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী এ দেশটিই এফডিআই প্রবাহের দিক থেকে এলডিসি দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে। যথাক্রমে ৩ দশমিক ৫৯ ও ২ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই নিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে থাকা দেশ হচ্ছে ইথিওপিয়া ও কম্বোডিয়া। এদিকে আলোচ্য প্রতিবেদনটি বলছে, উক্ত সময়ে বিনিয়োগ প্রবাহ সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয় অবস্থানে নেমে গেছে বাংলাদেশ। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এ চিত্র সুখকর নয় মোটেও। দেখা যাচ্ছে, ২০১৬ সালে দেশে এফডিআই বেড়েছিল ৪ শতাংশের মতো। তার আগের বছর প্রথমবারের মতো ২ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করে বিদেশি বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি হয় ৪৪ শতাংশ! এর পূর্ববর্তী বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে অবশ্য প্রায় ৩ শতাংশ কমেছিল এফডিআই। ২০১৭ সালে কিন্তু বৈশ্বিক এফডিআই প্রবাহও ছিল নি¤œমুখী। এখন এ প্রেক্ষাপট আমলে নিলে এবং গত কয়েক বছরে এফডিআই চিত্রের ওঠানামা বিবেচনায় রাখলে বিদ্যমান পরিস্থিতিকে শঙ্কাজনক বলা যায় না। তবু আমাদের দুর্ভাবনার কারণ একাধিক।
প্রথমত, এফডিআই হ্রাসের পাশাপাশি গত বছর বিদেশে বাংলাদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে লক্ষণীয়ভাবে। এ সময় দেশ থেকে আনুমানিক ১৭ কোটি ডলার বিনিয়োগ হয় বিদেশে প্রবৃদ্ধির হিসাবে সংখ্যাটি ৩১৯ শতাংশের কম হবে না। প্রশ্ন হলো, বিদেশে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির এ চিত্র বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি না? উপরন্তু দেশেই যেখানে বিনিয়োগের অভাব এবং তার প্রয়োজন নানা কারণেই উপস্থিত, সেখানে বিদেশে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ বাড়ছে কেন? এ সুযোগে অর্থ পাচারের শঙ্কাটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, আংকটাডের প্রতিবেদন বলছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও টেলিকম হচ্ছে স্থানীয় বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ খাত। এসব খাতের সম্ভাবনা হ্রাস পেয়েছে, এমনটি বলা যায় না। তা সত্ত্বেও উক্ত খাতগুলোয় বিদেশি বিনিয়োগ কমলো কেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার। খেয়াল করা প্রয়োজন, গত বছর যেসব দেশে এফডিআই বেড়েছে সেগুলো মোটামুটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। আর এখানটায় প্রকৃতিগত দিক দিয়েই পিছিয়ে রয়েছি আমরা। ফলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আমাদের ক্ষেত্রে কৃষি যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে সম্ভাবনাময় হচ্ছে ম্যানুফ্যাকচারিং খাত। এ দৈনিকের কাছে দেওয়া এক মন্তব্যে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান মনসুর সেজন্য দায়ী করেছেন অবকাঠামোগত ঘাটতিকে। এর বিরোধিতা করা কঠিন। বস্তুত অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশ যে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় এফডিআই আকর্ষণে পিছিয়ে পড়ছে, সেটা বলাই বাহুল্য। এ অবস্থায় নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তাভাবনা করা চাই। তাদের মাথায় রাখা দরকার, স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের পথে যাত্রার ঘটনাটি বাংলাদেশ অনুসৃত অর্থনৈতিক মডেলে পরিবর্তন আনবে। এদিকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ দেখে মনে হয়, ইদানীং এশিয়া ছেড়ে আফ্রিকার দিকে বেশি ঝুঁকছে এফডিআই। সুতরাং এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ মূলত দুটো  এক. নিজস্ব উৎস থেকে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে তথা অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও বিনিয়োগবান্ধব করে তুলতে হবে এবং দুই. এফডিআই আকর্ষণে প্রতিযোগিতা করতে হবে অন্যদের সঙ্গে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) গঠন করেছে সরকার। সেটি যেন দ্রুত কাক্সিক্ষত সুফল প্রদান করতে পারে, সেদিকে নজর রাখা চাই।