বায়ুদূষণই জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবেশগত হুমকি

চেলসি গোড: বায়ুদূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি, এটা সবারই খুব ভালো করে জানা আছে। কিন্তু সম্প্রতি পরিবেশগত কার্যক্ষমতা-বিষয়ক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণ মানবশরীরের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবেশগত হুমকি।

বায়ুদূষণ মানুষের জন্য একটি নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, বায়ুদূষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা কারণে প্রতি বছর ৭০ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতি বছর সাত হাজার পাঁচশ থেকে ৫২ হাজার মানুষের এ কারণে মৃত্যু হচ্ছে। আর এ মৃত্যুর মূল কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো থেকে বায়ুতে মিশে যাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর অসংখ্য ক্ষুদ্র কণা। বাস্তবিক অর্থে, ২০১৮ সালের পরিবেশগত কার্যক্ষমতা সূচক বা এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (ইপিআই) অনুসারেও জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবেশগত হুমকি হলো বায়ুদূষণ।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সঙ্গে যৌথভাবে ইয়েল ও কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকরা এ প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। এ প্রতিবেদনে ১০টি বিষয়ের অন্তর্গত ২৪টি কার্যক্ষমতা নির্দেশকের (পারফরম্যান্স ইনডিকেটর) ওপর ভিত্তি করে ১৮০টি দেশের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবেশগত স্বাস্থ্য ও বাস্তুতন্ত্রের গঠন ও কাঠামো কতটা শক্তিশালী, তা বিবেচনা করা হয়েছে। তালিকায় সবার শীর্ষে থাকা দেশগুলো অধিকাংশই ইউরোপের। এর মধ্যে শীর্ষ দেশ সুইজারল্যান্ড। এরপর পর্যায়ক্রমে রয়েছে ফ্রান্স, ডেনমার্ক, মাল্টা ও সুইডেন। আর তালিকার সর্বনি¤েœ থাকা দেশটির নাম ভারত। এর পরের দেশটিই হলো বাংলাদেশ। এছাড়া তালিকার নিচের দিকে থাকা অন্য দেশগুলোর মধ্যে পর্যায়ক্রমে রয়েছে বুরুন্ডি, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব দ্য কঙ্গো ও নেপাল।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিল্পোন্নত দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ তালিকার ২৭তম স্থানে অবস্থান করছে। প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও বায়ুর মানের দিক থেকে দেশটি বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে বনভূমি উজাড় করা ও ক্ষতিকর গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের দিক থেকে দেশটির অবস্থান মোটেও সন্তোষজনক পর্যায়ে নেই।

পরিবেশগত কার্যক্ষমতা সূচক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে, মানবস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর ও বড় হুমকিগুলোর মধ্যে বায়ুদূষণ শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে। মানুষের মধ্যে ভীতি ছড়ানোর জন্য এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়নি। এর ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনা করে উপযুক্ত নীতি নির্ধারণ ও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যই এ বিষয়গুলো সামনে নিয়ে আসা হয়েছে।

ইয়েলে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল ল অ্যান্ড পলিসির পরিচালক ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিলহাউজ প্রফেসর ড্যানিয়েল সি এস্টি বলেছেন, নতুন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেষ্টায় রয়েছে আজকের বিশ্বসমাজ। তাই নীতিনির্ধারকদের এটাও বুঝতে হবে, জ্বালানি ও পরিবেশগত হুমকিতে কারা নেতৃত্ব দিচ্ছে আর কারা এ এখনও পিছিয়ে আছে।

বিষয়টি নিয়ে তিনি আরও বলেছেন, ২০১৮ সালের এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (ইপিআই) থেকে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোকে উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য দুটি বিষয়ের ওপর লক্ষ রাখা খুবই জরুরি। তা হলো, অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে হবে যাতে পরিবেশগত অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ তৈরি সম্ভব হয়। পাশপাশি নগরায়ণ ও শিল্পায়নের মতো বিষয়গুলো খুব সতর্কতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করতে হবে, কারণ নগরায়ণ ও শিল্পায়ন এ ধরনের দূষণ সৃষ্টির জন্য বহুলাংশে দায়ী, যা মানবস্বাস্থ্য ও বাস্তুতন্ত্র উভয়ের জন্যই বড় ধরনের হুমকি।

২০১৮ সালের এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (ইপিআই) আমাদের একটা বিষয় সম্পর্কে মোটামুটিভাবে স্বচ্ছ ধারণা দেয়। আর তা হলোÑদূষণ ও টেকসই পরিবেশগত বিষয়ের দিক থেকে বিশ্বের কোন দেশগুলো এখন কোথায় অবস্থান করছে। এছাড়া এ প্রতিবেদন এটাও প্রকাশ করেছে যে, বিশ্বের দেশগুলো আলাদাভাবে ও বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোন প্রবণতার মধ্যে রয়েছে। এ তালিকায় যে দেশগুলো নিচের সারির দিকে অবস্থান করছে, তাদের সাসটেইন্যাবিলিটি ইস্যুতে বিভিন্ন বিষয়ে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর মধ্যে বায়ুদূষণের বিষয়টি সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থার মধ্যে রয়েছে।

বড় আকারের এসব গবেষণা ও প্রতিবেদন বেশ কিছু বিষয়ের ওপর আলোকপাত করে। এছাড়া নীতিমালাকে প্রভাবিত করা এবং পরিবেশকে টেকসই করার প্রচেষ্টায় কী কী প্রয়োজন ও ঘাটতি রয়েছে, তা মূল্যায়নের কাজটিও করেছে এই প্রতিবেদন। এতে কোন কোন ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রচেষ্টার সুফল পাওয়া গেছে, তাও দেখানো হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ সম্প্রতি আরেক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ১৯৯০ সাল থেকে ২০১২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে বেশ উন্নতি হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে, এর কারণে এ সময়ের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত এক লাখ ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু প্রতিরোধ করা গেছে।

সর্বশেষ এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (ইপিআই) অনুযায়ী, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বায়ুদূষণের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। তাহলে পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রচেষ্টায় তা সহায়ক হতে পারে।

বায়ুদূষণের বিষয়টি মানবমস্তিষ্কের প্রাথমিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশ্বের জনসংখ্যা খুব দ্রুত বাড়ছে। পৃথিবী উন্নত হচ্ছে ও নতুন নতুন নির্মাণকাজ হচ্ছে। এ অবস্থায় বায়ুদূষণ মানবশরীরে বিভিন্ন ধরনের পীড়াদায়ক ও ভয়ানক স্বাস্থ্যহানির কারণ হতে পারে। তাই যদি দ্রুত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তাহলে বায়ুদূষণ আরও খারাপ ফল বয়ে নিয়ে আসতে পারে। হয়তো অন্য প্রতিবেদনগুলোর মতো এ প্রতিবেদনটিও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোকে এ ভয়াবহ বাস্তবতা থেকে তাদের নাগরিকদের রক্ষা করার উপায় বাতলে দেবে।

 

বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম

ভাষান্তর তৌহিদুর রহমান