বিকাশের অর্থ লেনদেনে গোলকধাঁধা

জাকারিয়া পলাশ: রাজধানীর মিরপুর থেকে পাঁচ হাজার টাকা বিকাশ করেছিলেন ফাইজার রহমান নামে এক ব্যক্তি। রংপুরে তার গ্রামের বাড়িতে স্বজনদের জরুরি প্রয়োজনে টাকা পাঠাতে চেয়েছিলেন তিনি। প্রেরকের মুঠোফোন থেকে ওই টাকা কেটে যায়। ট্রানজেকশন নিশ্চিত করে মেসেজও আসে। কিন্তু প্রাপকের বিকাশ অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হয়নি। ওই ব্যক্তি তিন দিন প্রেরক ও প্রাপকের দায়িত্ব পালনকারী এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করেও টাকার হদিস পাননি।

এভাবেই গায়েব হয়ে যাচ্ছে বিকাশ গ্রাহকদের পাঠানো টাকা। এছাড়া টাকা লেনদেন হলেও কনফার্মেশন মেসেজ না আসা, হঠাৎ করে অ্যাকাউন্টের টাকা লেনদেন বন্ধ হয়ে যাওয়াসহ নানা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এসব সমস্যা নিয়ে বিকাশের কাস্টমার কেয়ারে প্রতিদিন ভিড় করছেন শত শত ব্যক্তি। অনেকে বিকাশে অর্থ লেনদেন করতে গিয়ে গোলকধাঁধার মধ্যে পড়ছেন। এ অবস্থায় মোবাইল ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ এ কোম্পানিটির গ্রাহক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে।

সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির মহাখালী কাস্টমার কেয়ারে গিয়ে দেখা যায়, অনেকেই এমন অভিযোগ নিয়ে এসেছেন। ভুক্তভোগী গ্রাহক ফাইজার রহমান জানান, কয়েক দিন ঘুরেও এজেন্টের কাছ থেকে টাকা ট্রান্সফার করাতে না পেরে তিনি মহাখালী কাস্টমার কেয়ারে যান। সেখানে দিনভর অপেক্ষা করে কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি। পরে বিকাশ থেকে তাকে জানানো হয় যে প্রেরকের অ্যাকাউন্ট থেকে ওই টাকা ট্রান্সফার হয়নি। কিন্তু প্রেরক দাবি করছেন এ টাকা ট্রান্সফার হয়েছে। এ নিয়ে বিকাশ কর্তৃপক্ষ দায় নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন ওই গ্রাহক।

যদিও প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা মনে করেন বিপুল গ্রাহকের মধ্যে অভিযোগের সংখ্যা নগণ্য। এ প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল কাদিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার কারণে বিস্তারিত আলাপ করতে পারেননি। পরে কোম্পানির করপোরেট কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম শেয়ার বিজকে জানান, ‘এ ধরনের দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকতে পারে। কিন্তু বিকাশের যান্ত্রিক ব্যবস্থায় এমন সমস্যার সুযোগ নেই। বিকাশের মাধ্যমে প্রতিদিন ৪৫ লাখ লেনদেন হয়, যা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হয়। তাতে এমন অভিযোগ ওঠেনি। গ্রাহকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকাশের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে। বিকাশের মাধ্যমে যেসব প্রতারণার অভিযোগ আসে, সেগুলোও হচ্ছে মিথ্যা বলে বা বিভিন্ন ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার অভিযোগ। কিছু অসাধু চক্রের সদস্য এমনটা করে থাকে। কিন্তু বিকাশের প্রযুক্তি ও সিস্টেম ব্যবহার করে কেউ এমনটি করেনি। এ বিষয়ে গ্রাহকদের সব সময় সতর্ক থাকতে বলা হচ্ছে।’

এদিকে বিভিন্ন কাস্টমার কেয়ারে ঘুরে গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে এমন অভিযোগের সত্যতা জানা গেছে। এ বিষয়ে ব্যাংক খাতের গবেষণায় সম্পৃক্ত পেশাজীবী ও বিকাশের গ্রাহক আল মামুন খান জানান, মিরপুর-২ এলাকা থেকে সম্প্রতি ১০ হাজার টাকা সাতক্ষীরায় পাঠিয়েছেন। এ ট্রানজেকশনের মেসেজ এলেও প্রাপকের অ্যাকাউন্টে টাকাগুলো পৌঁছেনি। এর কোনো সদুত্তর পাচ্ছি না এজেন্টের কাছ থেকে। এজেন্টও বলছেন তার কিছু করার নেই। মার্কেটিং বা প্রচারণার ক্ষেত্রে বিকাশের যতটা অগ্রগতি, গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়ে তেমন ব্যবস্থা নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অধীনে এনে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থার এসব সমস্যাকে গভীর নজরদারির পরামর্শ দেন তিনি।

এদিকে বাংলামোটরের কাস্টমার কেয়ারে গিয়ে দেখা যায়, গ্রাহকদের অনেকেই অভিযোগ করছেন টাকা ট্রান্সফার হচ্ছে না। শফিকুর রহমান নামের এক গ্রাহক এমন অভিযোগ করার পর কাস্টমার কেয়ার থেকে বলা হয়, তার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দিয়ে একাধিক অ্যাকাউন্ট করা হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে বিকাশ কর্তৃপক্ষ এখন একই এনআইডি থেকে একটিমাত্র অ্যাকাউন্ট চালু রাখছে। ফলে প্রতিদিন অনেক ডুপ্লিকেট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। গত এক বছর ধরে এ উদ্যোগ চলছে, কিন্তু গ্রাহকদের অনেকেই এ বিষয়ে জানেন না। ফলে টাকাসহ অনেকের অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গ্রাহকের অনেকে অভিযোগ করছেন, বিকাশে লেনদেন হলেও কনফার্মেশন মেসেজ পাচ্ছেন না। ফলে বিভ্রান্ত হচ্ছেন গ্রাহকদের কেউ কেউ। কাস্টমার কেয়ার কর্তৃপক্ষ অবশ্য এ সমস্যার জন্য মোবাইল নেটওয়ার্ককে দায়ী করছেন। তারা এজন্য মোবাইল অপারেটরকে বিকাশের নাম গোপন রেখে মেসেজ না পাওয়ার অভিযোগ করার পরামর্শও দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ২০১১ সালে প্রথমবারের মতো দেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ। বিপুল প্রচারণার মাধ্যমে প্রায় চার কোটি গ্রাহকের কাছে পৌঁছায় প্রতিষ্ঠানটি। এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক লেনদেনে (ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্সিং) অগ্রগতি হয়। রকেট, ইউক্যাশ, শিওর ক্যাশসহ বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু হয়। গবেষণার তথ্যমতে, দেশের সার্বিক মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মধ্যে ৬২ শতাংশই বিকাশের দখলে। তবে গ্রাহকসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিকাশের মাধ্যমে নানা রকম প্রতারণা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ রয়েছে।