বিচার-বিশ্লেষণ করেই নেওয়া হোক মার্জারের উদ্যোগ

গতকালের শেয়ার বিজে ছাপা ‘শরিয়াহভিত্তিক চার ব্যাংক এক ছাদের নিচে আসছে কি?’ শিরোনামের খবরটি নানা দিক থেকেই কৌতূহলোদ্দীপক। আমাদের প্রতিবেদক জানাচ্ছেন, সম্প্রতি চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্প গ্রুপ এস আলম কর্তৃক সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড (এসআইবিএল), আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের সিংহভাগ শেয়ার কিনে নেওয়ার ঘটনায় এ চার ব্যাংক একীভূতকরণের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের মতো আরেকটি শক্তিশালী শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের সম্ভাবনা দেখছেন খাতসংশ্লিষ্ট অনেকে। এ দৈনিকের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদও মন্তব্য করেছেন, ‘যেহেতু শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মালিক প্রায় একই শিল্প গ্রুপ, সেহেতু এক ছাদের নিচে ব্যাংকগুলো এলে কোনো ক্ষতি দেখছি না।’ এ প্রসঙ্গে শেয়ার বিজের কাছে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তা পরিচালকরা। এ অবস্থায় আমরা কেবল অনুমান করতে পারি, বিষয়টিতে এখনও নেওয়া হয়নি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত; আর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তেমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনাও কম। তবে কবে নাগাদ আলোচ্য একীভূতকরণ বা মার্জারটি সম্পন্ন হতে পারে, সে জল্পনা-কল্পনায় কালক্ষেপণ না করে আমরা বরং আলোচনা এগিয়ে নিতে পারি খোদ মার্জারের অনুমানটি ঘিরে।

বাংলাদেশের আর্থিক খাত ভালো বোঝেন এমন প্রায় সব বিশেষজ্ঞই স্বাগত জানিয়েছেন উদ্যোগটিকে। তাদের মনোভাব হচ্ছে, আলোচ্য মার্জারটি ইতিবাচক। এর পেছনের যুক্তিগুলোও তাদের কাছে স্পষ্ট বলে প্রতীয়মান। যেমন, বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে এতগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংক ধারণ করার ক্ষমতা তৈরি হয়নি এখনও। অথচ ক’বছর আগে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ না শুনে অনধিক ১০টি ব্যাংককে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেয় সরকার। তার ফল শুভ কী অশুভ কম কথায় সেটা বর্ণনা করা কঠিন। লক্ষণীয়, নতুন ব্যাংকগুলোর মধ্যে ভালো পারফরম্যান্স দেখানো প্রতিষ্ঠান যেমন রয়েছে, তেমনি আগে থেকে কর্মরত বেশ কয়েকটির অবস্থা অবনতিশীল। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণত দুটো পথ খোলা থাকে নীতিনির্ধারকদের সামনে এক. (যদি আচমকা কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব না নয়, সে ক্ষেত্রে) বাজে পারফরম্যান্স দেখানো ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানকে ধীরে ধীরে বসিয়ে দেওয়া; অথবা দুই. একাধিক ব্যাংককে একীভূতকরণ। সৌভাগ্যের ব্যাপার বলতে হয়, প্রথমোক্ত পথে হাঁটতে হচ্ছে না আমাদের। হলে সেটি বেদনাদায়ক হতো নানা দিক থেকেই। ওই ধরনের পরিবর্তন সর্বদাই কষ্টকর। সে ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মসংস্থান বিনষ্টের ঝুঁকিও তৈরি হয় বৈকি। অস্থিরতা সৃষ্টি হয় এমনকি অন্যদের মধ্যে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আলোচ্য চার ব্যাংক একীভূত হলে সেটি ব্যাংক খাতের বিদ্যমান শ্রমবাজারে কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলবে না। এ বিবেচনা থেকেও মার্জারের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। তবে এখানে ছোট্ট একটি কারিগরি জটিলতা রয়েছে বলে প্রতীয়মান। আলোচ্য চার ব্যাংকের মধ্যে একটি পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্ত নয় বলেই খবরে প্রকাশ। তাহলে তিনটিকে একীভূত করে বাকিটিকে অ্যাকুইজিশনের (অধিগ্রহণ) মাধ্যমে একই ছাদের নিচে আনা যায়। অবশ্য আমরা বলছি না এমন সিদ্ধান্ত এখনই নেওয়া জরুরি। আর্থিক খাতের শুভাকাক্সক্ষীরা নিশ্চয়ই চাইবেন, যথেষ্ট বিচার-বিশ্লেষণ না করে যেন সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করা না হয়। তা কেবল এজন্য নয় যে, আর্থিক খাতের সুস্বাস্থ্য নিয়ে আমরা খুব চিন্তিত; সেটা বরং এজন্য যে, এ দেশে ব্যাংকের মতো অর্থনৈতিক সত্তার একীভূতকরণের ঘটনা নেই বললেই চলে। ফলে আমরা চাইব, আলোচ্য মার্জারের বিষয়টি বিস্তারিত ও সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করুক অর্থ মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। তাতে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে বলেই আমাদের মনে হয়।