বিকাশের বিজ্ঞাপন প্রতারণা

জাকারিয়া পলাশ: মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি লেনদেনে ‘অ্যাপ’ চালু করেছে বিকাশ। নতুন এ অ্যাপের দিকে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে মরিয়া এখন বিকাশ। এজন্য কেনাকাটায় বড় অফার দিয়ে প্রলুব্ধ করছে বিকাশ। বলা হচ্ছে বিকাশ অ্যাপে শপিংয়ের বিল পরিশোধ করলেই মিলবে ২০ শতাংশ ক্যাশব্যাক। এ প্রলোভনে আকৃষ্ট হয়ে বিপুল অঙ্কের কেনাকাটা করে প্রতারিত হচ্ছেন গ্রাহকরা। পরে দেখা যাচ্ছে শর্তের জালে আটকে আছে ওইসব অফার।
চালাকির আশ্রয় নিয়ে এভাবে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করার বিষয়টি অনৈতিক বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। অবশ্য বিকাশ কর্তৃপক্ষ দাবি করছে গ্রাহকদের কোনো ধরনের প্রতারণার সুযোগ নেই এখানে।
জানা গেছে, ব্যাংক কর্মকর্তা রিয়াজুল হক সম্প্রতি কেনাকাটা করেছেন রাজধানীর একটি শপিং মল থেকে। বিকাশ অ্যাপে পেমেন্ট করেও তিনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০ শতাংশ ক্যাশব্যাক পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘এক হাজার ৮০০ টাকার একটা শার্ট কিনলাম। পেমেন্ট করলাম বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে। ২০ শতাংশ ক্যাশ ব্যাকের কথা বলা আছে। ৩৬০ টাকা ক্যাশ ব্যাক পাওয়ার কথা। অথচ ১৪ টাকা ৮০ পয়সা ফেরত এসেছে।’
এ বিষয়ে শোরুমের ম্যানেজার ওই গ্রাহককে বলেছেন, মাঝেমধ্যে এ রকম হচ্ছে। ওই গ্রাহক আরও লিখেছেন, ‘প্রায় তিন ঘণ্টা হতে চলল, বিকাশ থেকে কোনো সংশোধনী মেসেজ আসেনি। যদি এগুলো ইচ্ছা করে করা হয়, তবে সেটা তো এক ধরনের প্রতারণা। এই ধরনের প্রতারিত হওয়ার সংখ্যা তাহলে কত?’
শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে ওই গ্রাহকের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আমি নিয়মিতই ক্যাশ ব্যাক অফার পেতে বিকাশ অ্যাপে কেনাকাটা করি। কিন্তু এই অ্যাপের কোনো সীমা কোনো বিজ্ঞাপনে দেওয়া নেই। বিক্রয়কর্মী আমাকে জানিয়েছেন এক দিনে এক হাজার ৯০০ টাকার ক্যাশ ব্যাক পাওয়া যাবে। কিন্তু আমি তো তার চেয়ে কম কেনাকাটা করেছি সেদিন।’
এ বিষয়ে বিকাশের পক্ষ থেকে বলা হয়, গ্রাহকদের বিস্তারিত জানানোর জন্য সব ধরনের তথ্য দেওয়া আছে। দোকানে দোকানে লিফলেট রাখা আছে। তাছাড়া বিজ্ঞাপনের সঙ্গে তারকাচিহ্ন দিয়ে ছোট আকারে ‘শর্ত প্রযোজ্য’ লেখা আছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিকাশের করপোরেট কমিউনিকেশনস প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, ‘অ্যাপের মাধ্যমে কেনাকাটাকে আমরা বেশি উৎসাহিত করছি। এজন্য সাধারণ বিকাশ অ্যাকাউন্টের চেয়ে অ্যাপের কেনাকাটায় বেশি অফার দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ বিকাশ অ্যাকাউন্টে কেনাকাটার পেমেন্ট করলে একজন গ্রাহক ঈদের আগে সর্বোচ্চ ৮৫০ টাকা ক্যাশব্যাক পাবেন। আর অ্যাপের মাধ্যমে পেমেন্টে সর্বোচ্চ এক হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত ক্যাশ ব্যাক পাবেন গ্রাহক। মোট মূল্যের ২০ শতাংশ করে ক্যাশ ব্যাক আসবে। এক হাজার ৮০০ টাকার সীমা অতিক্রম করলে তিনি আর পাবেন না। বিজ্ঞাপনে সব কথা বিস্তারিত লেখা সম্ভব না হওয়ায় এগুলো আলাদাভাবে শর্তের মধ্যে রাখা হয়েছে।’
এদিকে অ্যাপ চালুর পর থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে বলে জানিয়ে বিকাশের এ কর্মকর্তা আরও বলেন, এ পর্যন্ত ২০ লাখ গ্রাহক অ্যাপটি ডাউনলোড করেছেন। এর মধ্যে প্রযুক্তিগত কোনো জটিলতার কোনো ঘটনা আমাদের সামনে আসেনি। তাছাড়া এটি তুলনামূলকভাবে সহজ একটি অ্যাপ। এর মাধ্যমে পেমেন্ট করতে নাম্বার টাইপ না করে শুধু কিউ-আর কোড (বারকোডের মতো) স্ক্যান করলেই চলে। এছাড়া ক্যাশ আউট, মানি রিকোয়েস্টসহ বিকাশের সাধারণ সেবাগুলো নেওয়া যাবে। গ্রাহকদের ক্যাশবিহীন ও নিরাপদ লেনদেনে উৎসাহিত করার জন্যই এ প্রযুক্তি চালু করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিভিন্ন শোরুমের বিক্রেতারা জানিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন তথ্য। রাজধানীর বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স ঘুরে দেখা গেছে বিভিন্ন বড় বড় ব্র্যান্ডের শো-রুমেই রয়েছে বিকাশে পেমেন্টের ব্যবস্থা। সেখানকার বিক্রেতারা কেউ কেউ বলেছেন এক দিনে সর্বাধিক ৩০০ টাকা ক্যাশ ব্যাক আসে। আবার কেউ বলেছেন, এক দিনে সর্বাধিক এক হাজার ৯০০ টাকা ক্যাশ ব্যাক পাবেন গ্রাহক। তবে অধিকাংশ বিক্রেতাই শুধু সাধারণ অফারটি জানিয়ে বলছেন, পেমেন্ট করলেই ২০ শতাংশ ক্যাশব্যাক পাবেন।
এলিফ্যান্ট রোড ও বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন বিপণিবিতানে গিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় সব গ্রাহকই জানেন যে বিকাশ অ্যাপে কেনাকাটায় ২০ শতাংশ ক্যাশব্যাক দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এক হাজার ৮০০ টাকার ক্যাশব্যাকের সীমার শর্তটি কারোরই জানা নেই।
এদিকে শর্তগুলো অস্পষ্ট রেখে প্রলুব্ধকর বিজ্ঞাপন দেওয়ার বিষয়টি অনৈতিক বলে উল্লেখ করেছেন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান। শেয়ার বিজকে তিনি বলেন, ‘শর্ত প্রযোজ্য’ উল্লেখ করে কৌশলে তথ্য গোপন করা করপোরেটদের একটা কৌশল। এটা সারা দুনিয়াতে চলছে। এখন এর বিরুদ্ধে কিছু করারও নেই। গ্রাহকদের শর্তগুলো জেনেই কেনাকাটা করা উচিত। তাছাড়া যারা ওই ২০ শতাংশের লোভে কেনাকাটা করেন তারা ক্ষেত্রবিশেষে এটা পাবেন না, এটাই শর্তে বলা হয়। তবে যারা সত্যিকার দামে পণ্য কেনেন তাদের ২০ শতাংশ টাকা ফেরত পাওয়ারও আশা থাকে না। তাদের প্রতারিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
উল্লেখ্য, দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বিকাশ। ২০১১ সালে প্রথমবারের মতো দেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ। প্রতিষ্ঠানটি মোবাইল ব্যাংকিং খাতের প্রায় ৬২ শতাংশেরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করে। এর আগে শুধু মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে চলত এ সেবা।
সম্প্রতি ইন্টারনেট অ্যাপসের মাধ্যমে সেবার বিস্তৃতি ঘটিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিকাশের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যাপকভাবে প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে গেলেও এ সেবার আড়ালে নানাভাবে অনিয়মের সুযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন চক্র বিকাশের মাধ্যমে অর্থপাচারসহ নানারকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া যায়। এ নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থা সিআইডি অনুসন্ধান চালাচ্ছে বলেও জানা যায়। এসবের মধ্যেই ফের অ্যাপের দিকে ব্যাপকভাবে প্রলুব্ধকর অফার নিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করছে বিকাশ।