সুশিক্ষা

বিদায়ে মলিন মুখ

অন্যান্য দিনের চেয়ে সেদিন একটু আগেই ক্যাম্পাসে আসে শামীমা নাসরিন রুপা ও ইসমাইল হোসেন রাহুল। তখনও ক্যাম্পাসে কোলাহল শুরু হয়নি। করিডোরের একপাশে চুপচাপ বসে আছে তারা। হঠাৎ কল্লোলকে লক্ষ করে ডেকে উঠল রুপা। ক্যাম্পাসের মূল ফটক দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করছিল কল্লোল। বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে তাদের কাছে আসে কল্লোল। ‘ভালো লাগছিল না তাই আগেই চলে এলাম’ কেমন যেন একটা ভাঙাগলায় কথাটা বলতে বলতে করিডোরে সবার সঙ্গে বসে পড়ে কল্লোল। কিছুক্ষণ পরই সবাই আবার নীরব। দীর্ঘক্ষণ কেটে যায় এভাবে। পরে রাহুল মৃদুস্বরে বলে, শেষ ক্লাসের কষ্ট আর প্রথম ক্লাসের আনন্দের মধ্যে অন্যরকম একটা মিল আছে, তাই না? কথাগুলো ছুঁয়ে যায় তিন বন্ধুকে। মলিন হয়ে ওঠে সবার মুখ।
এই তিন বন্ধু ও সহপাঠীরা ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের (ইউডা) এমবিএ (এইচআরএম) ৪৮ ব্যাচের শিক্ষার্থী। ১১ মে ছিল তাদের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শেষ ক্লাস। শেষ ক্লাসের পর শিক্ষা সমাপনী উৎসবে মেতে উঠবে তারা সবাই। এর মধ্য দিয়ে শেষ হবে তাদের দীর্ঘ শিক্ষাজীবন।
উৎসবের দিন সকাল থেকেই ক্যাম্পাসের চারপাশে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। বিদায়ী শিক্ষার্থীদের এ শিক্ষা সমাপনী উৎসব শুরু হয় শেষ ক্লাসের মধ্য দিয়ে। পরে বিদায় অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বিদায় বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সবাই ক্যাম্পাসজীবনের স্মৃতিচারণ করে। এরপর শেষ স্মৃতিটুকু ফ্রেমে বন্দি করার জন্য সবাই মেতে ওঠে সেলফি উৎসবে।
আবেগে আপ্লুত বিদায়ী শিক্ষার্থী মো. আসাদুজ্জামান অতীতের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমাদের ক্যাম্পাস জীবনের প্রথম দিনে আমি অনেককে চিনতাম না। ধীরে ধীরে শুরু হয় খুনসুটি, আড্ডা, হৈচৈ। বন্ধুত্ব হয় সবার সঙ্গে। চোখের সামনে আজও ভেসে ওঠে সেই রঙিন দিনগুলো। দেখতে দেখতে এতগুলো দিন যে কীভাবে কেটে গেল, বুঝতেই পারলাম না।
কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে মমিন জানায়, হয়তো তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে ভার্চুয়াল সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সবার সঙ্গে যোগাযোগ থাকবে, কিন্তু একসঙ্গে সেই আড্ডা, সেই গান, একটু দুষ্টামি কিংবা অতি সামান্য বিষয় নিয়ে ঝগড়া আর হবে না। সবাইকে খুব মিস করব। ক্যাম্পাসজীবনের পরও বন্ধুত্ব হয়, কিন্তু সহপাঠীদের সঙ্গে এ বন্ধুত্বের আবেদনটা চিরকালই একটু অন্য রকমভাবে রয়ে যায় মনের মাঝে।
সুবহা সাদিক মার্জি তার আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় এভাবেÑবুকভরা স্বপ্ন আর চোখজুড়ে আলোর উদ্দীপনা নিয়ে প্রাণপ্রিয় এ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার যাত্রা শুরু করেছিলাম আমরা। আজ তার শেষপ্রান্তে এসে আমরা প্রতি মুহূর্তে টের পাচ্ছি বন্ধু হিসেবে আমরা সবাই পরস্পরের কাছে কতটা আন্তরিক ছিলাম, কতটা গভীর ছিল আমাদের ভালোবাসা। এ উৎসবের মধ্য দিয়ে শিক্ষাজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটলেও অটুট থাকবে আমাদের বন্ধুত্ব।
শিক্ষাজীবন শেষে অনেকে কর্মজীবনের বাস্তবতায় প্রবেশ করলেও আমাদের বন্ধুত্ব, প্রিয় ক্যাম্পাস, প্রিয় মুখগুলো অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ভালোবাসার গল্পে সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে থাকবে। মেনে নিতে কষ্ট হলেও সবাইকে শিক্ষাজীবন শেষ করে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যেতে হবে, এটাই সত্য। তবে এ বিদায় চিরস্থায়ী নয়, কেননা ক্যাম্পাসের সঙ্গে ভালোবাসার যে সম্পর্ক, তা কখনও অস্বীকার করার নয়। সর্বোপরি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ইউডা তাদের সবার বিশ্ববিদ্যালয় পরিচয় বহন করবে।

তাজবিদুল ইসলাম চৌধুরী

সর্বশেষ..