বিদেশি পণ্যের অবাধ প্রবেশ শিল্প বিকাশে অন্তরায়

কাজী সালমা সুলতানা: কয়েকদিন আগে কেনাকাটা করতে গেলাম মৌচাক মার্কেট। এক দোকানি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে হাঁকডাক ছাড়ছেন আসেন, আসেন আমার দোকানে এখানে সব জিনিস বিদেশি। দেখে মনটা খারাপ হলো। মনে মনে রাগও হলো। এ কেমন কথা, দেশটা আমাদের অথচ দোকানের সব পণ্য বিদেশি। এক ফাঁকে দোকানদারকে কথাটা বলেও ফেললাম। উত্তরে দোকানদার বলল, কী করব আপা, দেশি জিনিস কিনতে চায় না কেউ। ক্রেতারা যা চায়, সেটাই তো রাখতে হবে। নইলে তো আমার ব্যবসা লাটে উঠবে। দোকান বন্ধ করে দিতে হবে।
বছর দুই আগে কলকাতায় গিয়েছিলাম এক আত্মীয়ের চিকিৎসা করাতে। সেখানে থাকাকালে নানা মানুষের সঙ্গে কথা হয়েছে। কথা বলে বুঝতে পারলাম কতটা গভীর তাদের স্বদেশ প্রীতি। একদিন এক হোমিওপ্যাথিক দোকানে জার্মানির তৈরি একটা ওষুধ কিনতে গেলাম। দোকানি বললেন, সারা দেশ ঘুরেও এ ওষুধ পাবেন না। একই ওষুধের আমাদের দেশীয়টা আছে। কী বৈপরীত্য! আমাদের দেশে ক্রেতারা দেশি পণ্য কিনতে চায় না, আর কলকাতায় বিদেশি পণ্য দোকানেই রাখে না।
আমাদের দেশের অনেকেই আছেন, যারা দেশি পণ্য কেনেন না। বিদেশে গিয়ে তারাই আবার বাংলাদেশ থেকে রফতানি হওয়া পণ্য কেনেন। ভারত, পাকিস্তান ও চীনের অন্যতম বাজারে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। দোকানে পাকিস্তানি লন কাপড়ের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে বাঙালি নারীরা। ভারত ও চীনের পণ্যে বাংলাদেশের বাজার সয়লাব। তৈজসপত্র থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় এমন কোনো পণ্য নেই, যা এদেশের বাজারে পাওয়া যায় না। একই পণ্য উন্নতমানের হলেও বাংলাদেশ লেখা দেখলেই ভ্রৃ কুঁচকে ওঠে। অনেকেই না বুঝেই নাক সিঁটকান। অথচ বাংলাদেশ এখন অনেক উন্নতমানের পণ্য উৎপাদন করছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ ক্রেতা বিদেশি পণ্যের প্রতি ভিন্ন ভালোবাসা অনুভব করেন। মুক্তবাজার অর্থনীতি আমাদের স্বদেশপ্রীতিকে ভূলুণ্ঠিত করেছে।
প্রকৃতপক্ষে কখনোই আমাদের স্বদেশপ্রীতি ছিল না। একসময় আমরা ছিলাম পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের অংশ। সেখানে আমরা ছিলাম তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক। তাই দেশ নিয়ে গর্ব করার মতো চেতনা আমাদের গড়ে ওঠেনি। তারপর যুদ্ধ করে দেশটা স্বাধীন করা হলো। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর পাঁচ লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে কেনা হলো এদেশ। মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবোধের বিকাশ ঘটতে শুরু করল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিষয়গুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রক্রিয়াও শুরু হলো। কিন্তু তার পরিপূর্ণ পাওয়ার সুযোগ হলো না। স্বাধীনতার মহান নায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর উদ্ভট রাজনীতি শুরু হলো দেশে। রাজনীতি ও অর্থনীতিÑএকটি অন্যটির পরিপূরক। তাই অর্থনীতিও পাল্টে গেল। রাজনীতিতে শুরু হলো পাকিস্তানকরণ আর অর্থনীতিতে দ্বৈতনীতি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর মুক্তিযুদ্ধকালের শত্রুদেশ পাকিস্তান স্বীকৃতি দেয় বাংলাদেশকে। একই বছর চীনও স্বীকৃতি দেয়।
জাতীয় রাজনীতির এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন আসে। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষার নিরীখে দেশে নিয়ন্ত্রিত বাজার অর্থনীতি চালু ছিল। স্বাধীনতার পর শিল্প-কলকারখানা ও বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হয়। দেশীয় পণ্য ব্যবহারের প্রতি জনগণকে আকৃষ্ট করতে সরকারি উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সাল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রীয়ভাবে আর নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি রাখা হয়নি। তার পরিবর্তে চালু করা হয় মুক্তবাজার অর্থনীতি। বিদেশি পণ্যের বাজারে পরিণত হওয়া শুরু করে বাংলাদেশ। জাতীয় পুঁজিপতির পরিবর্তে জš§ নেয় মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি। মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে এ দেশের বাজারে প্রবেশ করে পাকিস্তানি পণ্য। জাতীয় শিল্পের বিকাশের পথ বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ হয়ে ওঠে বিদেশি পণ্যের বাজারে।
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, ভারতের আজকের শিল্প বিকাশে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন জওহরলাল নেহরু। একটি ঘটনা থেকে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে। সে সময়ে ভারতের শিল্প-কারখানা স্থাপনের সরকারি সহযোগিতা চলছে। পণ্যের গুণগতমানে ভারত তখনও উৎকর্ষতা অর্জন করতে পারেনি। এ সময়ে আমলারা একটা নথি চালু করলেন, দাঁড়ি কামানোর ব্লেড আমদানি-সংক্রান্ত। নথিটি জওহরলাল নেহরুর কাছে গেল। তিনি দেখতে পেলেন, সচিব সাহেব লিখেছেন, ঞবহ ঢ়বৎপবহঃ নষধফব সধু রসঢ়ড়ৎঃ ভৎড়স ধনৎড়ধফ. জওহরলাল নেহরু বুঝতে পারলেন যে, এই টেন পার্সেন্ট ব্লেড ব্যবহার করবেন আমলা বাবুরা। তাদের দেশীয় ব্লেড দিয়ে শেভ করতে কষ্ট হচ্ছে। তিনি নথিতে লিখলেন, ঞবহ ঢ়বৎপবহঃ ঢ়বড়ঢ়ষব সধু ৎবসধরহ ঁহংযধাবফ. খুব বড় ঘটনা নয়, কিন্তু এ থেকে স্বদেশপ্রীতি ও জাতীয় শিল্পের বিকাশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সব কলকারখানা, বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করেন। দেশীয় শিল্পের বিকাশে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এসব শিল্প-কারখানা পরিচালনার জন্য একটি বিশেষ প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলারও উদ্যোগ নেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সে জনবলকে সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়। তারা আর শিল্প-কারখানার জন্য পৃথক কোনো প্রশিক্ষিত জনবল হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পায়নি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জিয়াউর রহমান মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু করেন। তারপর আমাদের বাজার এমনই মুক্ত হয়েছে যে, পুঁজির বিকাশ না ঘটে ফটকা পুঁজির দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পায়। আমদানিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে ওঠে। এই আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ঠেলায় এদেশের শিল্প ও প্রযুক্তিসংক্রান্ত সব বাজার চীনের দখলে। আর কাপড়ের বাজার ভারত ও পাকিস্তানের দখলে। কাপড়ের জন্য বিখ্যাত বাংলাদেশ এখন পরনির্ভরশীল এক দেশে পরিণত হয়েছে। দেশীয় কাপড় কল মার খাচ্ছে বিদেশি কাপড়ের কাছে।
সুদূর অতীত থেকেই এদেশের কাপড়ের খ্যাতি ছিল বিশ্বজুড়ে। ইংরেজ কালেক্টর জেমস টেলরের লেখা থেকে জানা যায়। ঊনবিংশ শতকে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ঢাকার বিখ্যাত মসলিন কাপড় প্রথম শতক থেকেই ইউরোপে বিশেষ সুখ্যাতি লাভ করে। তাছাড়া অভিজাত রোমান নারীরা ওই কাপড় পরতে খুব পছন্দ করতেন। আমাদের দেশে উৎপাদিত তাঁতের শাড়ি সত্যি তুলনাহীন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার পল্লী প্রকৃতি প্রতিভাষণে ‘বাঙালির কাপড়ের কারখানা ও হাতের তাঁত’ নিয়ে বলেছেন, ‘আমাকে যদি কিনতে হয় তবে আমি নিশ্চয়ই মুম্বাইয়ের বিলিতি যন্ত্রের কাপড় ছেড়ে ঢাকার দেশি তাঁতের কাপড় অসংকোচে এবং গৌরবের সঙ্গেই কিনব। সেই কাপড়ের সুতোয় বাংলাদেশের বহু যুগের প্রেম এবং আপন কৃতিত্ব গাথা হয়ে আছে।’
শাড়ির কথা বলতে গেলে মিলের শাড়ি, মসলিন, জামদানি ও পাবনার তাঁতের শাড়ি এবং ঢাকাই বিটি, কাতান, বেনারসি, সিল্ক ও টাঙ্গাইল শাড়ির কথা বলতেই হয়। শিশু-কিশোরদের তৈরি পোশাক এবং থান কাপড়ও দেশে তৈরি হচ্ছে। বস্ত্রশিল্পে বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। তার সঙ্গে রয়েছে রফতানিমুখী তৈরি পোশাক। বর্তমানে বাংলাদেশে রফতানিমুখী পোশাকশিল্পের সংখ্যা চার হাজারেরও বেশি। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। বাংলাদেশ এখন টেকসই ডেনিম কাপড় তৈরি করছে। ইউরোপ ও আমেরিকার প্রতিটি তৈরি পোশাকের দোকানে পাওয়া যায় বাংলাদেশের পোশাক। ট্যাগে লেখা ‘মেড ইন বাংলাদেশ’। সেটা নিয়ে গর্বের শেষ নেই আমাদের। সেখান থেকে বাংলাদেশের অনেক নাগরিক উচ্চমূল্যে ওই পোশাক কিনছেন। অথচ দেশে থাকতে নিজের বাজার থেকে তা কেনেন না। এটাই হলো আমাদের মানসিক পরনির্ভরশীলতা।
আমাদের কাপড়ের এত সুনাম থাকার পরও আমদানিকৃত কাপড়ে বাংলাদেশের বাজার সয়লাব। আমদানি করা কাপড়গুলোর দামও সহনীয়। সব শ্রেণির ক্রেতার সাধ্যের মধ্যেই দাম থেকে যায়। বাজারে বিদেশি কাপড়ে সয়লাব হওয়ার পেছনে এটিও বড় কারণ। দেশীয় শিল্পের বিকাশে আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে আমাদের কাপড়কে প্রতিযোগিতায় নিয়ে আসতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ কৌশল গ্রহণ করে থাকে। শুধু কাপড়ের ক্ষেত্রে নয়, সব পণ্যের ক্ষেত্রেই একই কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে। আমাদের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, খাদ্য, পানীয়-তামাক, কাঠ ও কাঠজাত পণ্য, প্লাস্টিক পণ্য, গ্লাস, স্টিল ও সাধারণ বৈদ্যুতিক যন্ত্র এবং পরিবহন যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ প্রভৃতি ক্ষেত্রে একই কৌশল গ্রহণ করে উৎকর্ষ সাধনের উদ্যোগ নিতে হবে। ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য মিলিয়ে ১২৩ কোটি ৪০ হাজার ডলার রফতানি আয় করেছে।
বাংলাদেশকে মুক্তবাজার অর্থনীতির স্বর্গ হিসেবে অভিহিত করেছে প্রভাবশালী মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস। মুক্তবাজার অর্থনীতির সুবাতাসে কিন্তু বাংলাদেশ ভারতে ওষুধ রফতানি করতে পারে না। সেখানে এমন সব জটিল নিয়ম করে রাখা হয়েছে, আপনাকে নীতিগতভাবে বাধা দেওয়া হয় না, কিন্তু প্রক্রিয়াগত জটিলতা পার হয়ে বাংলাদেশের পক্ষে ওষুধ রফতানি করা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ বাংলাদেশ উন্নতমানের ওষুধ উৎপাদন করছে। মুক্তবাজার অর্থনীতি কাউকে বাধ্য করে না নিজ দেশের পণ্য ব্যবহার করতে। তাই বলে রাষ্ট্রীয়ভাবে শিল্প বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দিতে হবে, তাও সঠিক নয়।
মুক্তবাজার অর্থনীতির অজুহাতে আমাদের আমদানি বাণিজ্য বেড়ে যাচ্ছে। রফতানি বাণিজ্যে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ছয় মাসে এ ঘাটতি ৮৬৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের হালনাগাদ তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশ মোট দুই হাজার ৬৩১ কোটি ৪০ লাখ ডলার ব্যয় করেছে। এই সময়ে বিভিন্ন দেশে পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশের আয় হয়েছে এক হাজার ৭৬৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এ হিসাবে সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৬২ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৯১ দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি।
এ অবস্থা দেশের অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়। সুখকর নয় একটি স্থিতিশীল সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়ে তোলার জন্য। মুৎসুদ্দি অর্থনীতি জাতীয় সমৃদ্ধির জন্য মোটেও সহায়ক নয়। তাই দেশীয় পণ্যের বিকাশে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সহায়ক আইনবিধি।

গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]