বিদেশি মুদ্রা ও ইকুইটি

মিজানুর রহমান শেলী: যেভাবে আমাদের দেশের বাণিজ্য পরিবেশ দিন দিন খারাপের দিকে ছুটছে, তাতে করে সময় যত যাবে আমাদের ডলারের দুর্বলতা বাড়তেই থাকবে। এমনকি তা এক সময়ে চূড়ান্ত মাত্রায় রূপ নেবে। আমি কার্যত কায়-মন ও বাক্যে সত্যিকার বাণিজ্যকেই ভালোবাসি এবং আশা করি। সত্যিকার বাণিজ্য ব্যবস্থা যত বাড়তে থাকবে আমাদের জন্যই তা মঙ্গলজনক হবে। এমনকি এটা জোর গলাই বলা চলে কেবল আমাদের জন্যই তা মঙ্গলজনক হবে তা নয়, বরং তা সমগ্র পৃথিবীর বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্যই সুখকর হবে। ঈশ্বরের কসম খেয়ে আমাদের ২০০৬ সালের বাণিজ্যের কথা বলতে পারি। সে দিনগুলোয় আমাদের প্রায় এক দশমিক ৪৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ছিল। অথচ এটা অস্বীকার করার কোনো জোঁ নেই, যুক্তরাষ্ট্রেরই গত বছর ৭৬ ট্রিলিয়ন ডলারের ছদ্মবেশী গোপন বাণিজ্য ছিল। এ কারণে রফতানিতে আমরা কোনো পণ্য বা সেবা বিনিময় করতে পারিনি। এই পর্যায়ে এসে আমরা অন্তত যুক্তি খণ্ডানোর একটি সুযোগ পেতে পারি। এই বছর পরিস্থিতি এমন যে, আমরা তখন ৭৬ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য বা সেবা আমদানি করেছি। এটা আমাদের জিডিপির ছয় শতাংশ। কিন্তু আমরা কোনো কিছুই রফতানি করিনি। এই পরিস্থিতিকে সমালোচকের কাঁধে তুলে দিতে চাই এবং দেখতে চাই তারা কীভাবে এর যুক্তি খøান করে বা এই পর্যায়ে সমালোচকরা আসলে কী বলে সমালোচনা করবেন? ব্যাপারটি নিয়ে আমার সন্দেহ হয়।
যাহোক, এই আমদানি-রফতানির ঢের ব্যবধানে ক্রয়ের সঙ্গে বিক্রয়ের কোনো মিথস্ক্রিয়া ঘটেনি। তবুও এই খরিদকরণে যুক্তরাষ্ট্র বা আইওইউএস বাইরের বিশ্বের কাছে তার নিজের সম্পদের মালিকানা হস্তান্তর করতে প্রয়োজনকেই গুরুত্ব দিয়েছে এবং হস্তান্তর করেছে। অবস্থা দেখে বোঝা যায়, ইউএস নিজে একটি ধনী পরিবার কিন্তু কোনো আত্ম-সংযম বোধ নেই। অসংযত উপায়ে তারা তাদের কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। ইউএস নিজের ধনিক পরিচয় রাখতে গিয়ে অপচয়কারীর পরিচয় রাখবে, এটা কোনোভাবেই আশা করা চলে না। যাহোক, এই উদ্ভূত পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ আনাটা আমাদের নিজেদের জন্যই জরুরি ছিল। তাই আমরা একটি আশু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি এবং আমরা আমাদের মালিকানা অংশের কিছুটা ছিদ্র বন্ধ করলাম। এটা করতে গিয়ে আমরা যা কিছু উৎপাদন করি তার চেয়ে ভোগের পরিমাণ বাড়িয়েছি। এটাকে অনেকেই অপ্রয়োজনে ভোগ বলে সমালোচনা করতে পারে। কিন্তু এটাই প্রয়োজন ছিল। বাস্তবতার মাত্রা বহু মাত্রিক। একেকজন একেক দিক থেকে সেটা দেখতে পায়।
যাহোক, ইউএসের রকম অনেক কিছুই করার থাকে। এমনকি এই সক্ষমতা ভবিষ্যতেও থাকবে। তারা ইচ্ছে করলে নিজেরাই নিজেদের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে আপন পরিচয় রাখতে। আবার ইচ্ছে করলেই উদ্ভূত সমস্যা থেকে নিজেদের রক্ষা করতেও যে কোনো উপায় অবলম্বন করে সমাধানে আসতে পারে। তাদের এই সক্ষমতার সবচেয়ে বড় নিয়ামক হলো তাদের বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদ আর সমৃদ্ধির ভাণ্ডার। আবার কেবল ধনী রাষ্ট্র হিসেবেই তাদের এই সক্ষমতাকে আমরা বিবেচনা করতে পারি না বরং তারা নিজেদের তথা নিজেদের নাগরিক স্বার্থকে রক্ষা করতে কোনোভাবেই কৃপণতা করিনি অতীতে; এখনও ভবিষ্যতেও তার নজির রাখতে কুণ্ঠাবোধ করবে না। আমরা দেখেছি আমেরিকা অতীতের দিনগুলোয় অনেক বেশি দায়িত্বশীল আচরণ করেছে। সেই সক্ষমতা ও অভ্যাস যুক্তরাষ্ট্রের এখনও রয়েছে, যা নতুন করে প্রমাণ করার কিছু নেই। তাই নিকট অতীত সময় থেকেই পৃথিবীর ধনী ধনী রাষ্ট্র আমাদের বন্ড, রিয়েল এস্টেট, স্টক ও ব্যবসা গ্রহণে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়ে এসেছে। এখনও তাদের আগ্রহ ফুরিয়ে যায়নি। ভবিষ্যতেও তারা এ সুযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করবে। আর এই পরিস্থিতিতে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার মতো গুদামভর্তি অফুরন্ত সবকিছু আমাদের দেশের রয়েছে।
তবে এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও তার প্রতিক্রিয়া ফেলে দেওয়ার নয়, অবশ্যই তা কোনো না কোনো পরিণতি বহন করে। আমরা দেখতে পেয়েছি আমাদের দেশের বিনিয়োগী আয় অ্যাকাউন্ট ২০০৬ সালে মন্দাভাবের দিকে নুয়ে পড়েছিল। আমি গত বছর (২০০৫-এর আগে) বলেছিলাম আমাদের ‘মাত্রাতিরিক্ত পান উৎসবের করুণ পরিণতি আসছে’। অর্থাৎ আমার এই ভবিষ্যৎ বাণী সত্য প্রমাণিত হয়েছে। যাহোক এর পরের দিনগুলোর দিকে যদি তাকাই, তবে দেখতে পাই, ২০১৫ সাল নাগাদ প্রতি বছরেই এই বিনিয়োগী আয় অ্যাকাউন্ট একটি ইতিবাচক দশায় অবস্থান করছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, বর্তমান সময়ে বিদেশিরা ইউএসএতে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে এবং এই বিনিয়োগ থেকে যে বিশাল লভ্যাংশ ঘরে তোলে তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। কেননা আমরা আমাদের দেশের বাইরে বিনিয়োগ করে তার সমপরিমাণ আয় করতে পারি না। অনেক পিছিয়ে থাকি। কার্যত তারা আমাদের থেকে অনেক বেশি দূর এগিয়ে থাকে। এর ফলে আমরা আমাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে শুরু করেছি এবং আমরা আমাদের ক্রেডিট কার্ডের দিকে ফিরে গিয়েছি। এই পরিণতি নিশ্চয় ছোট নয়। অন্যদিকে সবার মতোই যারা বন্ধকি জিনিস গ্রহণ করে থাকে, যুক্তরাষ্ট্র ঠিক তেমনি তাদের অভিজ্ঞতায় ‘রিভার্স কম্পাউন্ডিং’ অর্জন করছে: কেননা আমরা নিয়ত চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের ঘানি টেনে যাচ্ছি। সুদের ওপর সুদ নিয়ত পরিশোধ করে চলেছি।
হ্যাঁ, যদিও আমার এই আলোচনায় অনেক কিছুই খুব খারাপ বলে মনে হচ্ছে, মন্দ দশাই উঠে আসছে; তবুও এটাই সত্যি যে, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে যে পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে আগামী দশ বা বিশ বছর তার চেয়ে ভালো অবস্থানে বা সুখকর পরিস্থিতির মাঝে দিন কাটাবে। আমি এ বিষয়টি এখানে একটু গুরুত্বের সঙ্গেই উল্লেখ করলাম। এটা নিঃসেন্দহে গুরুত্বপূর্ণÑবাহুল্য কথা নয়। আবার এ কথাও সত্য যে, পার-ক্যাপিটা সম্পদ বেড়েই চলবে। কিন্তু আমাদের দেশের নাগরিকরা প্রতি বছরই তাদের উৎপাদিত পণ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশের বাইরে রফতানি করতে চাপ অনুভব করতে থাকবে। তখন বাধ্য হয়েই তারা উৎপাদিত পণ্য বিদেশে পাঠাবে। কেননা, আমাদের দেশের রয়েছে একটি বড় মাত্রার ঋণের বোঝা। এই ঋণের অবস্থান থেকে অন্যকে সেবা দেওয়ার জন্যই আমাদের তা করতে হবে। ফলে এটা সত্যিই খুব কঠিন হয়ে যাবে যে, আমরা আমাদের সন্তানদের স্বার্থে দিনের একটি অংশ বেছে নেব, যখন অতিরিক্ত পরিশ্রম করে এই অতিরিক্ত ভোক্তা প্রয়োজন মেটাতে হবে। এটা আসলে খুব অসন্তোষজনক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। আমি কিছু কিছু বিষয়কে কেন্দ্র করে বিশ্বাস করি যে, এই সারা বছরের অতিরিক্ত শ্রম আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক ও ভোটারদের খুব স্পর্শ কাতরতা সৃষ্টি করবে। এটা তাদের কাছে খুব গুরুতর ও চরম অসহনীয় বলে মনে হবে। ফলে এর প্রভাব পড়বে রাজনৈতিক ময়দানে। সেখানে এই ইস্যুগুলো রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। তবে এ পরিস্থিতিটি বাজারে কী পরিবেশ তৈরি করবে, বাজারে কোন ধরনের প্রভাব পড়বে সে ব্যাপারে আসলে তেমন কিছুই ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব হবে না। তবুও আমরা হতাশ হওয়ার জাতি নয়। আমরা আশা রাখি, খুব কোমল হাতেই এ পরিস্থিতিগুলো শিথিল হয়ে আসবে। এমনকি একটি সুবাতাস বইবে।

এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহ্যাম।
অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ।