বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো খুলে দিতে পারে সম্ভাবনার দুয়ার

কাজী সালমা সুলতানা: আলজেরিয়ার সাংবাদিক ফেথি লেমেহানেট ঘুরে গেলেন বাংলাদেশ। তিনি আলজেরিয়ার একটি টিভি চ্যানেলে কাজ করেন। গত ২৯ জুন থেকে ৬ জুলাই বাংলাদেশ সফর করেন তিনি। ফেথি লেমেহানেট জানান, আলজেরিয়ায় নিয়োজিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এ দেশ সফরের বিষয়ে তাকে আগ্রহী করে তোলেন। রাষ্ট্রদূত তাকে বাংলাদেশ সফরের পাশাপাশি আলজেরিয়া কোন কোন পণ্য বাংলাদেশ থেকে নিতে পারে, সে বিষয়ে ‘সাংবাদিকের দৃষ্টিতে’ খোঁজ নেওয়ার জন্য বলেন। সাংবাদিক ফেথি লেমেহানেটের সঙ্গে রাষ্ট্রদূত মো. আবদুল হাইয়ের পরিচয় হলে তিনি বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ দেখান। বাংলাদেশ সফরকালে তিনি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, স্কয়ার ফার্মা, নির্মীয়মান পদ্মা সেতু, শিল্পকলা একাডেমি ও আশুলিয়ায় একটি পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন স্থান পবিদর্শন করেন। তিনি দৈনিক শেয়ার বিজ পরিদর্শনে আসেন এবং বাংলাদেশ সফর সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। বাংলাদেশের ওষুধ ও পোশাকশিল্প নিয়ে তিনি বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের সঙ্গে আলজেরিয়ার বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কথাও বলেন তিনি।
বাংলাদেশের সঙ্গে আলজেরিয়ার সরাসরি বাণিজ্যিক কোনো সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশে আলজেরিয়ারও দূতাবাস নেই। স্বাধীনতার পরপরই আলজেরিয়া বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্সে (ওআইসি) বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে আলজেরিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসির সম্মেলনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিতে আলজেরিয়ার তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান কর্নেল হুয়ারি বুমেদিন বিশেষ বিমানে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন সে দেশের রেভুল্যুশনারি কাউন্সিলের প্রধান। ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। এর আগে ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আলজেরিয়া সফল করেন।
উল্লিখিত ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহে বাংলাদেশ-আলজেরিয়ার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। যে কোনো কারণেই হোক, তা কিন্তু হয়ে ওঠেনি। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দূতাবাস খোলা প্রধান করণীয় নয়। দূতাবাস নেইÑএমন দেশের সঙ্গেও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। ইউক্রেনে বাংলাদেশের দূতাবাস নেই; কিন্তু সেদেশের সঙ্গেও আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। এমনকি দূতাবাস না থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে গম রফতানির বিষয়ে দু’দেশের সরকারের মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে।
আলজেরিয়ার সাংবাদিক ফেথি লেমেহানেট শেয়ার বিজ পরিদর্শনকালে বাংলাদেশ থেকে তার দেশে রফতানি হতে পারেÑএমন কিছু সম্ভাবনাময় খাতের কথা বলেন। রফতানি বাণিজ্যে বাংলাদেশ গত অর্থবছরে বেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এ অগ্রগতির পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে তৈরি পোশাক খাত। অন্যান্য রফতানি পণ্যের ক্ষেত্রে অগ্রগতি ছিল ঋণাত্মক। বিশেষ করে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানিতে বাংলাদেশ গত অর্থবছরে বেশ খানিকটা পিছিয়ে পড়ে। অপরদিকে তৈরি পোশাকের পরই বাংলাদেশের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত হচ্ছে ওষুধশিল্প। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের ১৪২ দেশে ওষুধ রফতানি করে ৩১ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন টাকা আয় করে। সাংবাদিক লেমেহানেট বলেছেন, বাংলাদেশ আলজেরিয়ায় ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করতে পারে। এছাড়াও তিনি তৈরি পোশাকের বিষয়েও আগ্রহের কথা জানান।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে বাংলাদেশের ২০ সদস্যের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল আলজেরিয়া সফর করে। ওই সফরকালে দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করার জন্য দু’দেশই আগ্রহ প্রকাশ করে। বাংলাদেশ থেকে রফতানির জন্য একটি পণ্যতালিকাও সে সময় প্রণয়ন করা হয়। এর মধ্যে ওষুধ, মেলামাইন সামগ্রী, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ছিল অন্যতম।
সাংবাদিক লেমেহানেটের মতো অনেক বিদেশি সাংবাদিকই বাংলাদেশ সফর করেছেন। বাংলাদেশের সাংবাদিকরাও বিদেশ সফর করেছেন। সফরকালে তিনি তার দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। কিন্তু এ কথা সত্য যে, এভাবে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশকে তুলে ধরাই আমাদের দূতাবাসগুলোর কাজ। অধিকাংশ দূতাবাসে ইকোনমিক কাউন্সেলর বা ট্রেড কাউন্সেলর রয়েছেন। তারা হয়তো দায়িত্বও পালন করছেন তাদের সীমার মধ্যে থেকে। তবে দেশকে বিদেশের কাছে তুলে ধরতে হলে কিছুটা সীমা অতিক্রম করতেই পারেন। আলজেরিয়ার মতো বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বা সংশ্লিষ্ট শাখা তৎপর হলে রফতানি বাণিজ্যে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় দুয়ার খুলে যাবে এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হবে।

গণমাধ্যমকর্মী